Subscribe Us

হে পথিক ভবিষ্যৎ বলে কিছু নাই ,আসোল ভবিষ্যৎ হলো পরোকাল।।

পানাহার বিষয়ক দ্বীনী প্রশ্নোত্তর

 https://rasikulindia.blogspot.comগ্রন্থঃ দ্বীনী প্রশ্নোত্তর | অধ্যায় তালিকা, আবদুল হামীদ ফাইযী
বিড়ি সিগারেট হারাম হওয়ার স্পষ্ট দলীল শরীয়তে আছে কি? না থাকলে তা হারাম হয় কিভাবে?
শরীয়তের বিধানের সকল কিছুর স্পষ্ট দলীল নেই। আর না থাকলে কোন জিনিস যে হালাল, তা নয়। শরীয়তের স্পষ্ট উক্তিসমুহ থেকে ফকীহগন এমন কিছু নীতি নির্ণয় করেন, যার দ্বারা বলা যায় কোনটা হালাল, আর কোনটা হারাম। যে সকল নীতির মাধ্যমে বিড়ি-সিগারেটকে হারাম করা হয়, তার কিছু নিম্নরুপঃ-

  • (ক) এতে রয়েছে অনর্থক অর্থ অপচয়। আর ইসলামে অপচয় হারাম।
  • (খ) এতে রয়েছে স্বাস্থ্যগত ক্ষতি। আর যা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর, ইসলামে তা হারাম।
  • (গ) বেশি পরিমাণ পান করলে, তাতে  জ্ঞানশূন্যতা আসতে পারে। আর যাতে নেশা, মাদকতা ও জ্ঞানশূন্যতা আসে, ইসলামে তা হারাম।
  • (ঘ) এতে দুর্গন্ধ আছে। এর দুর্গন্ধে অধূমপায়ীরা কষ্ট পায়। সুতরাং তা পবিত্র জিনিস নয়। আর ইসলাম পবিত্র জিনিস খাওয়াকে হালাল এবং অপবিত্র জিনিস খাওয়াকে হারাম ঘোষণা করেছে।
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
অমুসলিমদের জবেহকৃত পশুর গোশত খাওয়া বৈধ কি?
অমুসলিমদের জবেহকৃত পশুর গোশত খাওয়া বৈধ নয়। তবে তাদের মধ্যে আহলে কিতাব (ইয়াহুদি-খ্রিস্টান) দের জবেহকৃত পশুর গোশত খাওয়া হালাল, যদি জানা যায় যে, তারা আল্লাহর নাম নিয়ে ছুরি দ্বারা যথানিয়মে জবেহ করে। পক্ষান্তরে যদি জানা যায় যে, তারা জবেহর সময় আল্লাহর নাম নেয় না, অথবা কারেন্টের শক দিয়ে হত্যা করে, অথবা গুলি মেরে হত্যা করে, অথবা গরম পানিতে ডুবিয়ে হত্যা করে, যাতে গোশতের ভিতরে রক্ত জমা থেকে তার ওজন বেশি হয় এবং দেখতেও লোভনীয় ভাল গোশত হয়, তাহলে ওই গোশত খাওয়া হালাল নয়। (ইবনে জিবরীন )
প্রকাশ থাকে যে, ‘মুসলিম’ নামধারী কোন নাস্তিক, কাফের বা মুশরিকের জবেহ করা পশু হালাল নয়। মাজার, কবূরী এবং মতান্তরে কোন বেনামাজির হাতে জবেহ করা পশুর গোশত হালাল নয়। বৈধ নয় কোন ছোট শিশু, নেশাগ্রস্ত বা পাগলা ব্যক্তির জবেহ।
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
কোন গোশতের ব্যাপারে ‘ঠিকমত জবেহ করা হয়েছে কি না’ - এই সন্দেহ হলে বাড়িওয়ালা অথবা হোটেল মালিককে জিজ্ঞাসা করা কি জরুরী? নাকি জিজ্ঞাসা না করেও খাওয়া যায়?
যদি প্রবল ধারনায় জানা যায় যে, জবেহকারী ঠিকমত জবেহ করেছে, তাহলে জিজ্ঞাসা করা বিধেয় নয়। যেহেতু মহানবী (সঃ) ইয়াহুদিদের জবেহ করা ছাগলের গোশত খেয়েছেন এবং জিজ্ঞাসাও করেননি যে, তা ঠিকভাবে জবেহ করা হয়েছে কি না? (বুখারি ২৬১৭, ২০৬৯, ২৫০৮, মুসলিম ২১৯০ নং)
একদা একদল লোক নবী (সঃ) কে জিজ্ঞেসা করল, ‘এক নও মুসলিম সম্প্রদায় আমাদের নিকট গোশত নিয়ে আসে। আমরা জানি না যে, তার জবেহকালে আল্লাহর নাম উচ্চারণ করা হয়েছে কি না।’ তিনি বললেন, “তোমরা আল্লাহর নাম নিয়ে তা ভক্ষণ কর।” (বুখারি ২০৫৭, ৫৫০৭ নং)
উক্ত হাদিসে নবী (সঃ) তাদেরকে জিজ্ঞাসা করে সন্দেহ দূরীভূত করতে নির্দেশ দেননি। এমন নির্দেশ হলে নিশ্চয় মানুষ বড় সমস্যায় পতিত হতো।  (ইবনে উসাইমিন)
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
দাঁড়িয়ে পানাহার করা কি হারাম?
দাঁড়িয়ে পানাহার করা হারাম। যেহেতু আল্লাহর রাসুল (সাঃ) বলেছেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। কেউ ভুলে গিয়ে পান করে থাকলে সে যেন তা বমি করে ফেলে।” (মুসলিম ২০২৬  )
আনাস (রাঃ) বলেন, ‘নবী (সাঃ) নিষেধ করেছেন যে, কোন লোক যেন দাঁড়িয়ে পান না করে।’ আনাস (রাঃ) কে দাঁড়িয়ে খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এটা তো আরও খারাপ ও আরও নোংরা।’ (মুসলিম ২০২৪ নং)
হাদিসে দাঁড়িয়ে পান করার ব্যাপারে নবী (সাঃ) ধমক দিয়েছেন এবং তিনি বলেছেন, “(তুমি দাঁড়িয়ে পান করলে) তোমার সাথে শয়তান পান করেছে।”
অবশ্য দাঁড়িয়ে পান বৈধ হওয়ার ব্যাপারেও হাদিস বর্ণিত হয়েছে। (বুখারি ১৬৩৭, ৫৬১৫, মুসলিম ২০২৭, ইবনে মাজাহ ৩৩০১ নং প্রমুখ) সুতরাং বসার জায়গা না থাকলে অথবা অন্য কোন অসুবিধায় বা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পানাহার করা হারাম নয়। (আলবানি, সিঃ সহিহাহ ১৭৫ নং)
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
চামচ দিয়ে খাওয়া কি সুন্নত বিরোধী?
মহানবী (সঃ) তিনটি আঙ্গুল যোগে খেতেন। কিন্তু চামচ লাগিয়ে খাওয়া অবৈধ নয়। যেহেতু তা শরই ব্যাপার নয়, বরং তা পার্থিব ব্যবহারিক ব্যাপার। যেমন আধুনিক মাধ্যম বাস-ট্রেন, সাইকেল-গাড়ি ইত্যাদি ব্যবহার করা আবৈধ নয়। (আলবানী )
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
মাছ মারা গিয়ে পানির উপর ভেসে থাকলে তা খাওয়া বৈধ কি না?
মহানবী (সঃ) বলেছেন, “সমুদ্রের পানি পবিত্র এবং তার মৃত হালাল।” (আহমাদ, সুনান আরবাআহ প্রমুখ, সিলসিলাহ সহিহাহ ৪৮০ নং) এই হাদিস থেকে এই কথা বুঝা যায় যে, মাছ মারা গিয়ে পানির উপর ভেসে উঠলেও তা হালাল। পক্ষান্তরে মাছ মরে গিয়ে পানির উপর ভেসে উঠলে তা খাওয়া নিষেধ হওয়ার ব্যাপারে হাদিস সহিহ নয়। (সিলসিলাহ সহিহাহ ১/৮৬৪) বরং পাঁইটে ভাসা আম্বর মাছ সাহাবাদের খাওয়ার ব্যাপারে ঘটনা হাদিসে প্রসিদ্ধ। আর তারা নিরুপায় ছিলেন বলেই নয়, যেহেতু মহানবী (সঃ) ও সেই মাছের কিছু অংশ খেয়েছিলেন।
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
খাওয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ এর উপর ‘রাহমানির রাহীম’ যোগ করা বিধয়ে কি?
অনেকে বলছেন, যোগ করে ‘বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম’ বলা উত্তম। কিন্তু মহানবী (সঃ) এর সুন্নতই সবচেয়ে উত্তম। তিনি কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ বলারই নির্দেশ নিয়েছেন। তিনি বলেছেন, “তোমাদের কেউ যখন আহার করবে, সে যেন শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলে। যদি শুরুতে তা ভুলে যায়, তাহলে সে যেন ‘বিসমিল্লাহি  আওয়াল্লাহু অ আখেরাহ।” (তিরমিজি ১৮৫৭ নং) (আলবানী)
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
ঘোড়ার গোশত খাওয়া বৈধ কি?
সহিহ হাদিসের মতে ঘোড়ার গোশত হালাল। হানাফি মাজহাবের বড় ইমামগণও হালাল বলছেন। আবু জাফর ত্বাহাবি হালাল হওয়ার কথাই প্রাধান্য দিয়েছেন। যেহেতু হারাম হওয়ার দলিলে হাদিস সহিহ নয়। (আলবানী)
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
পরিবেশন করার সময় বুজুর্গকে আগে দিতে হবে, নাকি ডান দিক থেকে শুরু করতে হবে?
ডান দিক থেকেই শুরু করতে হবে। অবশ্য বুজুর্গ বা যে চেয়ে খেতে চাইবে তাকে আগে দিতে হবে। (আলবানী, সিসিঃ ১৭৭১ নং)
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
কোন কাফের দাওয়াত দিলে খাওয়া বৈধ কি?
কোন কাফেরের দাওয়াতে হালাল খাদ্য খাওয়া অবৈধ না। আল্লাহর ওয়াস্তে তার মনকে ইসলামের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য খাওয়া যায়। আমাদের আদর্শ নবী কাফেরদের দাওয়াতে তাদের তৈরি হালাল খাদ্য খেয়েছেন। অবশ্য তাদের পূজা (তদনুরূপ মাজারিদের উরস) উপলক্ষে প্রস্তুতকৃত খাদ্য, মূর্তি বা মাজারে উৎসর্গকৃত খাদ্য, ঠাকুরের প্রসাদ, মাজারের তবরুক ইত্যাদি খাওয়া বৈধ নয়। যেহেতু তাতে শিরকে মৌন সম্মতি ও সমর্থন প্রকাশ পায়।
(মাজাল্লাতুল বুহূসিল ইসলামিয়্য্যাহ ২৬/১০৯,২৮/৮২, ৮৪)

 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর
  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
কাফেরদের প্রস্তুতকৃত খাদ্য খাওয়া বৈধও কি?
কাফেরদের প্রস্তুতকৃত খাদ্য ও পানীয় খাওয়া আবৈধ নয়। যেমন তাদের প্রস্তুত, সেলাই ও ধৌত করা কাপড় ব্যবহার করা বৈধ। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ  ১/২০০)
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
কোন কাফেরকে ইসলামে নিষিদ্ধ খাবার খেতে দেয়া বৈধ কি?
সহকর্মী বা কার্যক্ষেত্রে কোন অমুসলিমকে এমন জিনিস উপহার বা পানাহার করতে দেয়া বৈধ নয়, যা তাদের ধর্মে বৈধ হলেও ইসলামে অবৈধ। যেমন কোন কাজ করার সময় লেবার কে মদ বা বিড়ি সিগারেট পেশ করাও অবৈধ। (ফাতাওয়া ইসলামিয়্যাহ  ১/১১০)
 দ্বীনী প্রশ্নোত্তর  পানাহার  আবদুল হামীদ ফাইযী
এক ব্যাক্তি গাড়ি কিনবে। সে এক গাড়ির ডিলারের কাছে গেল। কিন্তু তার কাছে সেই গাড়ি নেই, যা সে কিনবে। যোগাযোগের মাধ্যমে অন্য ডিলারের কাছ থেকে তাকে গাড়ি নিয়ে দিল নগদ ১ লক্ষ টাকা দামে। তারপর সে তার নিকট থেকে কিস্তি চুক্তিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিল। কিস্তি দিয়ে অতিরিক্ত ওই ২০ হাজার টাকা খাওয়া কি ওই ডিলারের জন্য হালাল?
ওই ২০ হাজার টাকা হালাল নয়। কারণ তা সুদ। যেহেতু তা এক লক্ষ ধার দিয়ে এক লক্ষ ২০ হাজার টাকা নেওয়ার মতোই। পক্ষান্তরে ওই ডিলার যদি ওই গাড়ি কিনে নিজের শো রুমে রেখে ওই ক্রেতাকে কিস্তিতে ওই দামেই বিক্রি করত, তাহলে সুদ হতো না। (ইবনে উসাইমিন)
 https://rasikulindia.blogspot.com ইসলামী জীবন-ধারা বই থেকে পানাহারের আদব:-   আবদুল হামীদ ফাইযী

 https://rasikulindia.blogspot.comপানাহারের আদব বিষয়ে কিছু কথা ------

 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

পানাহারের আদব বিষয়ে কিছু কথা

মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অতি প্রয়োজনীয় বস্ত্ত হল খাদ্য ও পানীয়। জীবন ধারণের জন্য এ খাদ্য হালাল হওয়া অতিব জরুরী। প্রিয় নবী (সাঃ) বলেছেন,

إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لاَ يَقْبَلُ إِلاَّ طَيِّبًا

‘‘অবশ্যই আল্লাহ পবিত্র এবং তিনি পবিত্র (মালই) কবুল করে থাকেন। আল্লাহ মু’মিনদেরকে সেই আদেশ করেছেন, যে আদেশ করেছিলেন নবী-রসূলগণকে। তাই তো তিনি নবী-রসূলগণরে উদ্দেশ্যে বলেন,

يَا أَيُّهَا الرُّسُلُ كُلُوا مِنَ الطَّيِّبَاتِ وَاعْمَلُوا صَالِحًا إِنِّي بِمَا تَعْمَلُونَ عَلِيمٌ

অর্থাৎ, হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্ত্তসমূহ থেকে আহার কর এবং সৎকাজ কর। তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত।[1] আর তিনি (মু’মিনদের উদ্দেশ্যে) বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ

 অর্থাৎ, হে মু’মিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে সকল রুজী দান করেছি তা থেকে পবিত্র বস্ত্ত আহার কর---।[2] অতঃপর তিনি সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করলেন, যে লম্বা সফর করলেন, দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে যার বিক্ষিপ্ত, অবিন্যস্ত এবং সমস্ত শরীর ধূলিমলিন বেশে নিজ হাত দু’টিকে আকাশের দিকে লম্বা করে তুলে দু‘আ করে, ‘হে আমার প্রতিপালক! হে আমার প্রভু!’ কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পানীয় হারাম, তার পরিধেয়  পোশাক হারাম এবং হারাম দ্বারাই তার পুষ্টিবিধান হয়েছে। অতএব তার দু‘আ কিভাবে কবুল হতে পারে?[3]
আল্লাহর রসূল (সাঃ) একদা কা’ব বিন উজরার উদ্দেশ্যে বললেন, ‘‘হে কা’ব বিন উজরাহ! সে মাংস কোন দিন জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না, যার পুষ্টিসাধন হারাম খাদ্য দ্বারা করা হয়েছে।’’[4]
রসূলুল্লাহ (সাঃ) আরো বলেন-

يَا كَعْبَ بْنَ عُجْرَةَ، إِنَّهُ لاَ يَرْبُو لَحْمٌ نَبَتَ مِنْ سُحْتٍ إِلاَّ كَانَتِ النَّارُ أَوْلَى بِهِ

‘‘হে কা’ব বিন উজরাহ! যে মাংস হারাম খাদ্য দ্বারা প্রতিপালিত হবে, তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত।’’[5]
পানাহারের বিভিন্ন আদব রয়েছে ইসলামে। যে সকল আদব পালন করলে মানুষের চরিত্র ও সুম্বাস্থ্য গড়ে ওঠে। সেই আদবের কিছু পরবর্তী অংশে।
[1]. সূরা মু’মিনূন-২৩: ৫১
[2]. সূরা বাক্বারাহ-২:১৭২

[3]. মুসলিম হা/১০১৫, তিরমিযী আল মাদানী প্রকাশনী হা/২৯৮৯, মিশকাত হাদীস একাডেমী হা/২৭৬০

[4]. দারেমী আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/২৭৭৬, মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/১৪৪৮১, সহীহ, ইমাম মুসলিমের শর্তে সনদ শক্তিশালী। 

[5]. সহীহ তিরমিযী আল মাদানী প্রকাশনী হা/৬১৪,
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১। সোনা-চাঁদির পাত্রে খাওয়া বৈধ নয়

যেহেতু এ হল অহংকারী কাফেরদের পাত্র। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, ‘‘তোমরা সোনা-রূপার পাত্রে পানাহার করো না। কারণ, তা দুনিয়াতে কাফেরদের জন্য এবং আখেরাতে তোমাদের জন্য।’’[1]
তিনি আরো বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি (সোনা)-চাঁদির পাত্রে পান-(আহার) করে, আসলে সে ব্যক্তি নিজ উদরে জাহান্নামের আগুন ঢক্ঢক্ করে পান-(আহার) করে।’’[2]
[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৬৩৩, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৬৭

[2]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৬৩৪, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৬৫
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২। অমুসলিমদের পাত্রে (তাদের দোকান ও হোটেলে) খাওয়া নিষেধ

তবে তাদের পাত্র (দোকান বা হোটেল) ছাড়া যদি মুসলিমদের কোন পাত্র (দোকান বা হোটেল) না পাওয়া যায়, তাহলে নিরুপায় অবস্থায় তাদের সেই পাত্র (ধোয়ার পর তাদের দোকান বা হোটেলে) খাওয়ার অনুমতি রয়েছে।[1]
[1]. বুখারী, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/১৯৩০
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

৩। ঠেস বা হেলান দিয়ে খাওয়া অপছন্দনীয় কাজ

মহানবী (সাঃ) বলেন, ‘‘আমি হেলান দিয়ে খাই না।’’[1] তিনি হেলান দিয়ে খেতে নিষেধও করেছেন। তিনি (সাঃ) বলেন- لَا تَأْكُلْ مُتَّكِئًا ‘‘হেলান দিয়ে খেয়ো না’’।[2] যেভাবে খেলে হেলান দিয়ে খাওয়া হয়, সেইভাবে খাওয়া মকরূহ। দেওয়াল বা চেয়ারের সাথে পিঠের অথবা মাটির সাথে বাম হাতের হেলান দিয়ে খাওয়া অপছন্দনীয়। যেহেতু অনুরূপ বসা বিনয়ীদের লক্ষণ নয় এবং হেলান দিয়ে খেলে বেশী খাওয়া হয়। আর বেশী খাওয়া ইসলামে বাঞ্ছনীয় নয়। উবুড় হয়ে শুয়ে খাওয়া নিষেধ। রসূল (সাঃ) বলেন

وَأَنْ يَأْكُلَ الرَّجُلُ وَهُوَ مُنْبَطِحٌ عَلَى بَطْنِهِ

‘‘ কোন ব্যক্তি যেন উবুর হয়ে পেটের উপর ভর করে না খায়’’।[3] সুতরাং খেতে বসার সঠিক ও সুন্নাতী বৈঠক হল নিম্নরূপঃ
 (ক) দুই হাঁটু ও পায়ের পাতার উপর (নামায পড়ার মত) বসা। অনুরূপ খেতে বসে মহানবী (সাঃ) বলেছিলেন,

إِنَّ اللَّهَ جَعَلَنِي عَبْدًا كَرِيمًا وَلَمْ يَجْعَلْنِي جَبَّارًا عَنِيدًا

‘‘আল্লাহ আমাকে সম্মানিত বান্দা বানিয়েছেন এবং অহংকারী ও উদ্ধত বানাননি।’’[4]
(খ) উভয় পায়ের রলাকে খাড়া রেখে উভয় পাছার উপর বসা। মহানবী (সাঃ) এরূপ বসে খেজুর খেয়েছেন।[5]
ডান পা-কে খাড়া রেখে বাম পায়ের উপর বসে খাওয়া চলে।[6] অবশ্য এরূপ বসে খাওয়া সুন্নাত হওয়ার ব্যাপারে বর্ণিত হাদীস সহীহ নয়।
সতর্কতার বিষয় যে, দুই পা-কে গুটিয়ে আড়াআড়িভাবে রেখে হাঁটু ভাঁজ করে (বাবু হয়ে) বসে খাওয়াকেও অনেকে হেলান দিয়ে খাওয়ার মধ্যে গণ্য করেছেন।[7] অবশ্য অসুবিধার কারণে অথবা কাপড় খারাপ হওয়ার ভয়ে সেভাবে বসে খাওয়া হারামও নয়।
[1]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ১৮২৭৯, বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৩৯৯

[2]. সিলসিলাহ সহীহাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩১২২

[3]. আবূ দাঊদ হা/৩৭৭৪, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩৩৭০, সিলসিলাহ সহীহাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/২৩৯৪, সহীহ।

[4]. আবূ দাঊদ হা/৩৭৭৩, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩২৬৩, সহীহ।

[5]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৪৪ প্রমুখ

[6]. ফতহুল বারী ৯/৪৫২

[7]. শারহুন নাওয়াবী ১৩/২২৭
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

৪। খাবার সময় খাবার প্রস্ত্তত হয়ে গেলে এবং সলাতের সময় এসে উপস্থিত হলে আগে খাবার খাবেন, তারপর সলাতে যাবেন। যাতে সলাতের একাগ্রতা নষ্ট না হয়।

মহানবী  (সাঃ)  বলেন, ‘‘নামাযের ইকামত হলে এবং রাতের খানা উপস্থিত হলে, আগে খানা খেয়ে নাও।’’[1]
ইবনে উমার (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেন-

إِذَا كَانَ أَحَدُكُمْ عَلَى الطَّعَامِ فَلاَ يَعْجَلَنَّ حَتَّى يَقْضِىَ حَاجَتَهُ مِنْهُ وَإِن أُقِيمَتِ الصَّلاَةُ

‘যখন কেউ খেতে বসবে তখন খাওয়া শেষ না করা পর্যন্ত সে যেন তাড়াহুড়া না করে; যদিও নামাযের ইকামত হয়ে যায় তবুও।’[2]
[1]. আহমাদ, বুখারী, মুসলিম, সহীহুল জা’মে হা/৩৭৪

[2]. সুনানুল বাইহাক্বী আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৫২৪২
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

৫। খাবার শুরু করার আগে ও পরে উভয় হাতকে ধুয়ে নিন

অবশ্য এ কেবল আপনার সুস্বাস্থ্যের জন্য। নচেৎ খাবার আগে হাত ধোয়ার ব্যাপারে কোন সহীহ হাদীস নেই।[1]
অবশ্য খাবার পর হাত ধোয়ার ব্যাপারটাও প্রকৃতিগত রুচির ব্যাপার। তবুও ইসলামে এর নির্দেশ এসেছে। খোদ মহানবী (সাঃ) খাবার পরে কুলি করেছেন এবং হাত ধুয়েছেন।[2]
তিনি (সাঃ) বলেছেন, ‘‘যে ব্যক্তি হাতে গোশতের গন্ধ ও চর্বি না ধুয়ে তা নিয়েই ঘুমায়, অতঃপর কোন বিপদ ঘটে, তাহলে সে যেন নিজেকে ছাড়া আর কাউকে দোষারোপ না করে।’’[3] এখানে কোন বিপদ বলতে, হাত না ধুয়ে শোওয়ার ফলে চর্বির গন্ধে আরশোলা, ইঁদুর বা অন্য কোন প্রাণী হাত বা আঙ্গুল কাটতে বা কামড়াতে পারে। তাছাড়া এতে কোন রোগ বা শয়তানী স্পর্শ হওয়ারও কারণ থাকতে পারে।
পক্ষান্তরে যদি আপনি নাপাক অবস্থায় গোসল করার আগে খাবার খেতে চান, তাহলে আপনার জন্য ওযূ মুস্তাহাব। আল্লাহর নবী (সাঃ) নাপাক অবস্থায় কিছু খেতে অথবা ঘুমাতে চাইলে আগে ওযূ করে নিতেন।[4] অবশ্য কেবল হাত ধুয়ে খাওয়াও চলবে। মা আয়েশা (রাঃ) বলেন, আল্লাহর রসূল (সাঃ) নাপাকে থেকে যখন ঘুমাবার ইচ্ছা করতেন, তখন ওযূ করে নিতেন এবং যখন কিছু খাওয়ার ইচ্ছা করতেন, তখন দুই হাত ধুয়ে নিতেন।[5]
[1]. আল-আদাবুশ শারইয়্যাহ ৩/২১৪
[2]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২৭৪৮৬, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৪৯৩

[3]. আহমাদ ৭৫১৫, আবূ দাঊদ হা/৩৮৫২, তিরমিযী হা/১৮৬০, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩২৯৭, দারেমী আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২০৬৩

[4]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ২৮৬, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/৩০৫, প্রমুখ

[5]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২৪৩৫৩, নাসাঈ হা/ ২৫৬
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

৬। খাবার শুরু করার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলুন এবং শেষ করার পর আল্লাহর প্রশংসা করুন

এই আদব পালনে খাবার ঠিকমত দেহে কাজ করা এবং তার অপকারিতা দূর করার ব্যাপারে বড় প্রভাব রয়েছে। ইমাম আহমাদ বলেন, খাবারে ৪টি জিনিস জমা হলে সে খাবার পরিপূর্ণ হয়; খাবার আগে ‘বিসমিল্লাহ’ বলা, শেষে আল্লাহর প্রশংসা করা, (একাধিক লোকের) অনেক হাত পড়া এবং তা হালাল হওয়া।[1]
আল্লাহর নাম নিয়ে খেতে শুরু করলে শয়তানের প্রভাব ও শরীক হওয়া থেকে বাঁচা যায়। আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, ‘‘অবশ্যই শয়তান (মুসলিমের) খাবার খেতে সক্ষম হয়; যদি খাওয়ার শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ না বলা হয়।---’’[2]
তিনি আরো বলেন, ‘‘তোমাদের কেউ যখন নিজ বাড়ি প্রবেশ করার সময় এবং খাবার সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলে, তখন শয়তান (তার সঙ্গীদেরকে) বলে, ‘তোমাদের জন্য রাত্রিযাপনের স্থানও নেই এবং রাতের খাবারও নেই।’ যখন সে বাড়ি প্রবেশ করার সময় আল্লাহর নাম নেয় এবং রাতে খাবার সময় না নেয়, তাহলে শয়তান বলে, ‘তোমরা রাতের খাবার পেলে, কিন্তু রাত্রিযাপনের জায়গা নেই।’ আর যখন সে খাবার সময়েও আল্লাহর নাম না নেয়, তখন শয়তান বলে, ‘তোমরা রাত্রিযাপনের জায়গাও পেলে এবং খাবারও পেলে।’’[3]
উল্লেখ্য যে, খাবার শুরুতে কেবল ‘বিসমিল্লাহ’ই বলবেন। তার সঙ্গে ‘আর-রাহমানির রাহীম’ যোগ করবেন না। যেহেতু তার কোন দলীল নেই।
 পক্ষান্তরে শুরুতে ‘বিসমিল্লাহ’ বলতে ভুলে গেলে আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, ‘‘যখন তোমাদের কেউ কোন খাবার খাবে, তখন সে যেন ‘বিসমিল্লাহ’ বলে। প্রথমে কেউ তা বলতে ভুলে গেলে সে যেন (মনে পড়লে বা) শেষে বলে,

بِسْمِ اللَّهِ أَوَّلَهُ وَآخِرَهُ

‘বিসমিল্লাহি আওয়ালাহু অআ-খিরাহ।’’
অর্থ: আল্লাহর নামে খাওয়ার শুরু ও শেষ করছি।[4]
খাবার সময় আরো মান্য আদব এই যে, খাবার পর ‘আল-হামদু লিল্লাহ’ বা নির্দিষ্ট দু‘আ পড়তে হয়। যেমনঃ (ক)

اَللّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْهِ وَأَطْعِمْنَا خَيْراً مِّنْهُ

উচ্চারণঃ  আল্লা-হুম্মা  বা-রিক লানা ফীহি অআত্বইমনা খাইরাম মিন্হ।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাদের জন্য এতে বরকত দাও এবং এর চেয়ে উত্তম আহার দান কর।[5]  (খ) খাবার দুধ হলে বলুন,

اَللّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِيْهِ وَزِدْنَا مِنْهُ

উচ্চারণঃ আল্লা-হুম্মা বা-রিক-লানা ফীহি অযিদনা মিন্হ।
অর্থঃ হে আল্লাহ! আমাদের জন্য এতে বরকত দান কর এবং আমাদেরকে এর প্রাচুর্য দাও।[6]
(গ) এই দু‘আটি পাঠ করলে পূর্বেকার গোনাহ মাফ হয়ে যায়।[7]

اَلْحَمْدُ للهِ الَّذِيْ أَطْعَمَنِيْ هذَا وَرَزَقَنِيْهِ مِنْ غَيْرِ حَوْلٍ مِّنِّيْ وَلاَ قُوَّةً

উচ্চারণঃ  আলহামদু লিল্লা-হিল্লাযী আত্ব্আমানী হা-যা অরাযাক্বানীহি মিন গাইরি হাওলিম মিন্নী  অলা ক্বুউওয়াহ।
অর্থঃ সেই আল্লাহর যাবতীয় প্রশংসা যিনি আমাকে এ খাওয়ালেন এবং জীবিকা দান করলেন, আমার কোন চেষ্টা ও সামর্থ্য ছাড়াই।[8]
অন্যান্য আরো দু‘আর বই-এ দেখুন। তবে সতর্কতার বিষয় যে, খাওয়ার পর আল্লাহর প্রশংসা ও শুকরিয়া আদায়ের উদ্দেশ্যে যে দু‘আ পড়বেন, তার অর্থ যেন বুঝেন। নচেৎ আপনার মনে সেই প্রশংসা ও শুক্র স্থান না পেলে মুখে মন্ত্র আওড়িয়ে লাভ কি?
খাবার খেতে খেতে মাঝে মাঝে অথবা প্রত্যেক লোকমা খাওয়ার শেষে ‘আলহামদু লিল্লাহ’ বলার স্পষ্ট দলীল নেই। অবশ্য অনেকে সেই হাদীসকে এর দলীল মনে করেন, যাতে মহানবী (সাঃ) বলেন, ‘‘নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন যে, বান্দা খাবার খেয়ে তার উপর তাঁর প্রশংসা করুক এবং পানীয় পান করে তার উপর তাঁর প্রশংসা করুক।’’[9]
এখানে ‘খাবার ও পানীয়’ বলতে এক সময়ের খাবার বা পানীয়কে বুঝানো হয়েছে। কিন্তু কেউ কেউ বলেছেন, প্রত্যেক লোকমাও বুঝা যেতে পারে।[10] অল্লাহু আ’লাম (আল্লাহ ভাল জানেন)।
[1]. যাদুল মাআদ ৪/২৩২
[2]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০১৭, আবূ দাঊদ হা/৩৭৬৬

[3]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০১৮, আবূ দাঊদ হা/৩৭৬৫

[4]. আবূ দাঊদ হা/৩৭৬৭, তিরমিযী হা/১৮৫৮

[5]. আবূ দাঊদ হা:৩৭৩০, তিরমিযী আল মাদানী প্রকাশনী হা:৩৪৫৫

[6]. আবূ দাঊদ হা:৩৭৩০, তিরমিযী আল মাদানী প্রকাশনী হা:৩৪৫৫

[7]. সহীহ তিরমিযী ৩/১৫৯

[8]. তিরমিযী আল মাদানী প্রকাশনী হা:৩৪৫৮, ইবনে মাজাহ তাওহীদ পাবঃ হা:৩২৮৫

[9]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২৭৩৪, তিরমিযী হা/১৮১৬, নাসাঈ

[10]. তুহফাতুল আহওয়াযী ৫/৪৩৭
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

৭। পানাহার করুন ডান হাতে। দুই হাতে খাবার ধরতে হলেও একটার পর একটা ডান হাতে নিয়েই খান। বাম হাতে খাবেন না

কেননা আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন তার বাম হাত দ্বারা অবশ্যই না খায় এবং পানও না করে। কারণ, শয়তান তার বাম হাত দিয়ে পানাহার করে থাকে।’’
বর্ণনাকারী বলেন, (ইবনে উমার (রাঃ) এর স্বাধীনকৃত দাস তাবেয়ী) নাফে’  (রাঃ) দুটি কথা আরো বেশী বলতেন, ‘‘কেউ যেন বাম হাত দ্বারা কিছু গ্রহণ না করে এবং অনুরূপ তার দ্বারা কিছু প্রদানও না করে।’’[1]
উমার বিন আবী সালামাহ (রাঃ) বলেন, আমি শিশুবেলায় আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর কোলে (বসে খাবার সময়) আমার হাত পাত্রের যেখানে-সেখানে পড়লে তিনি আমাকে বললেন,

« يَا غُلاَمُ سَمِّ اللَّهَ وَكُلْ بِيَمِينِكَ وَكُلْ مِمَّا يَلِيكَ »

‘‘ওহে বৎস! আল্লাহর নাম নাও, তোমার ডান হাত দিয়ে খাও এবং নিজের পাশ্বে থেকে খাও।’’[2]
একদা এক ব্যক্তি আল্লাহর রসূল (সাঃ) এর নিকট বাম হাত দিয়ে কিছু খাচ্ছিল। তিনি তা লক্ষ্য করে তাকে বললেন, ‘‘তুমি ডান হাত দিয়ে খাও।’’ সে বলল, ‘আমি পারি না।’ রসূল (সাঃ) বললেন, ‘‘তুমি যেন না পার। অহংকারই ওকে (আদেশ পালনে বিরত রেখেছে)।’’ সালামাহ বলেন, ‘সুতরাং (এই বদ্দুআর ফলে) সে আর তার হাতকে মুখ পর্যন্ত উঠাতে পারেনি।’[3] কিন্তু যার ডান হাত নেই অথবা ব্যবহার করার ক্ষমতা নেই সে নিরুপায় হয়েই বাম হাত ব্যবহার করবে।
[1]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০২০, তিরমিযী হা/১৮০০, মালেক, আবূ দাউদ ৩৭৭৬

[2]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/৫৩৭৬, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৫৩৮৮৮, মুসনাদে আহমাদ হা/১৬৩৭৫

[3]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০২১
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

৮। খাবার (এক শ্রেণীর হলে) পাত্রের এক ধার থেকে খান, নিজের পার্শ্ব থেকে খান। খাবার পাত্রের মাঝখান হতে খাওয়া উচিত নয়

কারণ,   মহানবী (সাঃ) উমার বিন আবী সালামাহ (রাঃ) কে বলেছিলেন, ‘‘ওহে বৎস! আল্লাহর নাম নাও, তোমার ডান হাত দিয়ে খাও এবং নিজের তরফে একধার থেকে খাও।’’[1]
মহানবী (সাঃ) বলেন, ‘‘তোমাদের কেউ যখন খাবার খায়, তখন সে যেন পাত্রের উপর (মাঝখান) থেকে না খায়। বরং পাত্রের নিচে (একধার) থেকে খায়। কারণ বরকত তার উপর (মাঝখান) অংশে নাযিল হয়।’’[2]
[1]. বুখারী, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০২২

[2]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২৪৩৫, আবূ দাঊদ হা/৩৭৭২, তিরমিযী হা/১৮০৫, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩২৭৭, দারেমী আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২০৪৬
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

৯। সুন্নাত হল তিনটি আঙ্গুল (বৃদ্ধা, তর্জনী ও মধ্যমা) দ্বারা (রুটি, খেজুর প্রভৃতি) খাবার খাওয়া

আল্লাহর রসূল (সাঃ) তিনটে আঙ্গুল দিয়েই খাবার খেতেন।[1]
[1]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২৬৬২৬, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৩২, আবূ দাঊদ হা/৩৮৪৮, দারেমী আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২০৩৩
   ১০। খাবার শেষে আঙ্গুল ও প্লেট চেঁটে খান। তারপর মুছে অথবা ধুয়ে ফেলেন
মহানবী (সাঃ) এরূপই করতেন এবং এরূপ করতে অপরকে আদেশ করতেন। তিনি (সাঃ) বলেন, ‘‘যখন তোমাদের কেউ খাবার খায় তখন সে যেন তার আঙ্গুল চেঁটে বা চাঁটিয়ে না নেওয়ার আগে তা না মুছে (বা না ধোয়)।’’[1]
জাবের বিন আব্দুল্লাহ (রাঃ) বলেন, ‘‘নবী (সাঃ) আঙ্গুল ও প্লেটকে চেঁটে খেতে আদেশ করেছেন এবং বলেছেন,

«إِذَا أَكَلَ أَحَدُكُمْ فَلَا يَمْسَحْ أَصَابِعَهُ حَتَّى يَلْعَقَهَا فَإِنَّهُ لَا يَدْرِي فِي أَيِّ طَعَامِهِ كَانَتِ الْبَرَكَةُ»

‘‘যখন তোমাদের খাবার খাবে আঙ্গুল চেঁটে না খেতে হাত মুছবেনা। কেননা, তোমরা জান না যে, কোন খাবারে বরকত আছে।’’[2]
এক বর্ণনায় আছে যে, শেষের খাবারে বরকত নিহিত আছে।[3]
খাওয়ার শেষে আঙ্গুল চেঁটে খাওয়ার গুরুত্ব বিজ্ঞানও স্বীকার করেছে। কারণ, আঙ্গুলের মাথা হতে এক প্রকার পদার্থ নির্গত হয়, যা খাদ্য হজম হওয়াতে সাহায্য করে। আর এ জন্যই তরকারীতে আঙ্গুল ডোবালে তরকারী খুব তাড়াতাড়ি খারাপ হয়ে যায়।
জ্ঞাতব্য যে, প্লেট চেঁটে খেলে প্লেট দু‘আ বা ইস্তিগফার করে এ ধারণা শুদ্ধ নয়। কারণ এ প্রসঙ্গে বর্ণিত হাদীস সহীহ নয়।[4]
[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৪৫৬, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৩১, প্রমুখ

[2]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ১৩৮০৯, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৩৩, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩২৭০

[3]. আবূ আওয়ানাহ, নাসাঈ, ইবনে হিববান ১৩৪৩, ইরওয়াউল গালীল ৭/৩২

[4]. যয়ীফুল জা’মে হা/৫৪৭৮
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১১। খাদ্যাংশ নিচে পড়ে গেলে তা পরিষ্কার করে খেয়ে ফেলা কর্তব্য

কারণ, তাতেই বরকত নিহিত থাকতে পারে। সুতরাং তা কুড়িয়ে না খেলে বরকত চলে যাবে। মহানবী (সাঃ) বলেন, ‘‘তোমাদের কারো খাবারের লোকমা হাত হতে (পাত্রের বাইরে) পড়ে গেলে (এবং তাতে ময়লা লেগে গেলে) তার ময়লা দূর করে সে যেন তা খেয়ে ফেলে এবং শয়তানের জন্য ছেড়ে না দেয়। খাবার শেষে সে যেন নিজের আঙ্গুলগুলো চেঁটে খায়। কারণ তোমরা জান না যে, তোমাদের কোন্ খাবারে বরকত নিহিত আছে।’’[1]
তদনুরূপ পানীয়তে (পানি, শরবত, জুস বা চায়ে) যদি মাছি পড়ে যায়, তাহলে সেটিকে সরাসরি না তুলে পূর্ণরূপে তাতে ডুবিয়ে, অতঃপর তা তুলে ফেলে পান করা কর্তব্য। যেহেতু মহানবী (সাঃ) বলেন,  ‘‘যখন তোমাদের কারো পানীয় দ্রব্যে মাছি পড়ে যাবে, তখন তাকে সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দেবে। তারপর তাকে বাইরে নিক্ষেপ করবে। কারণ, তার দুটি ডানার মধ্যে একটিতে রোগজীবাণু আছে আর অপরটিতে আছে রোগমুক্তি। (পানীয় বস্ত্ততে পড়ে যাওয়া অবস্থায়) মাছি যে ডানাতে রোগজীবাণু আছে সেটিকে ডুবিয়ে দিয়ে নিজেকে বাঁচাতে চেষ্টা করে। অতএব তা সম্পূর্ণ ডুবিয়ে দেওয়ার পর নিক্ষেপ করা উচিত।’’[2]
[1]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ১৪২১৮, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৩৪

[2]. বুখারী, আবু দাউদ, ইবনে মাজাহ
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১২। খাবার জিনিস গরম থাকলে খেতে শুরু না করে খাবার মত ঠাণ্ডা হলে খেতে শুরু করুন

কারণ বেশী গরম খাবার খেলে জিভ বা মুখে কষ্ট পেতে পারেন, খাবারের আসল স্বাদ জিভে অনুভব করতে পারবেন না, বেশী গরম গিলে ফেললে আপনার পেটেরও কোন ক্ষতি হতে পারে। আর তখন আপনি ঐ খাবারের কোন বরকত পাবেন না।
এ জন্যই মহানবী (সাঃ) বলেন, ‘‘(খাবারের বেশী গরমভাব দূর করে খেলে) তা বরকতে বেশী বড় হয়।’’[1]
আবূ হুরাইরা (রাঃ) বলেন, ‘ভাপ না চলে যাওয়া পর্যন্ত কোন খাবার খাওয়া উচিত নয়।’[2]
[1]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২৬৪১৮, দারেমী আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ২০৪৭, সিলসিলাহ সহীহাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩৯২

[2]. বাইহাক্বী, ইরওয়াউল গালীল ১৯৭৮
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১৩। খাদ্য ও পানীয়তে ফুঁ দিয়ে খাবেন না

গরম খাবার ঠাণ্ডা করার জন্য অথবা পানীয়তে কোন পোকা বা কুটা দূর করার জন্য ফুঁক দিবেন না। আহার্য বা পানপাত্রে নিঃশ্বাস ছাড়বেন না। যেহেতু তাতে খাদ্য ও পানীয়র সাথে আপনার ছাড়া কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস মিলিত হবে। সে দূষিত গ্যাস আপনার শরীর ও স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর প্রমাণিত হতে পারে। যেহেতু মহানবী (সাঃ) বলেন, ‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ যখন কিছু পান করবে, তখন সে যেন পানপাত্রে নিঃশ্বাস না ছাড়ে অথবা ফুঁ না দেয়।’’[1]   তিনি খাদ্য ও পানীয়তে ফুঁ দিতে নিষেধ করেছেন।[2]
[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৬৩০, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২৬৭, আবূ দাঊদ হা/৩৭২৮, তিরমিযী হা/১৮৮৮, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩৪২৯

[2]. আহমাদ, সহীহুল জা’মে হা/৬৯১৩
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১৪। খাবার যেমনই হোক তার কোন দোষ বর্ণনা করতে হয় না

খাদ্যের কোন প্রকার ত্রুটি বর্ণনা না করে তা ভালো লাগলে খান, না লাগলে ছেড়ে দিন। যেহেতু তাতে রাঁধুনীর মন ছোট হয়।
মহানবী (সাঃ) কখনো খাবারের ত্রুটি বর্ণনা করতেন না। কিছু খেতে ইচ্ছা হলে খেতেন, না হলে তা বর্জন করতেন।[1]
[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৪০৯, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৬৪
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১৫। পানি কখনই দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পান করবেন না; বরং বসে বসে পান করবেন

কোন খাবার খাওয়ার সময়ও বসে বসে খাবেন দাঁড়িয়ে খাবেন না।
আল্লাহর নবী (সাঃ) বলেন,

« لاَ يَشْرَبَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمْ قَائِمًا فَمَنْ نَسِىَ فَلْيَسْتَقِئْ »

‘‘তোমাদের মধ্যে কেউ যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। কেউ ভুলে গিয়ে পান করে থাকলে সে যেন তা বমি করে ফেলে।’’[1]
আনাস (রাঃ) বলেন, নবী (সাঃ) নিষেধ করেছেন যে, কোন লোক যেন দাঁড়িয়ে পান না করে। আনাস (রাঃ) কে দাঁড়িয়ে খাওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে উত্তরে তিনি বললেন, ‘এটা তো আরো খারাপ ও আরো নোংরা।’’[2]
কিন্তু বসার জায়গা না থাকলে অথবা অন্য কোন অসুবিধায় বা প্রয়োজনে দাঁড়িয়ে পানাহার করা হারাম নয়। যেহেতু দাঁড়িয়ে পান বৈধ হওয়ার হাদীসও বর্ণিত হয়েছে।[3]
[1]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৫৩৯৮

[2]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০২৪

[3]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ১৬৩৭, ৫৬১৫, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০২৭, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩৩০১ প্রমুখ
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১৬। এক নিঃশ্বাসে পানি পান না করে অন্তত তিন নিঃশ্বাসে পান করবেন

আল্লাহর রসূল (সাঃ) তিন নিঃশ্বাসে পানি পান করতেন এবং বলতেন, ‘‘এতে বেশী তৃপ্তি আসে বা পিপাসা নিবারণ হয়, পিপাসার কষ্ট থেকে অথবা কোন ব্যাধি সৃষ্টির হাত থেকে বেশী পরিমাণে বাঁচা যায় এবং হজম, পরিপাক ও দেহের উপকার বেশী হয়।’’[1]
তবে তার মানে এই নয় যে, এক নিঃশ্বাসে পানি পান করা বৈধ নয়। বরং উদ্দেশ্য হল, এক নিঃশ্বাসে পান করার চাইতে তিন নিঃশ্বাসে পান করা উত্তম এবং তার উপকারিতার কথা হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে।
[1]. বুখারী, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০২৮ প্রমুখ
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১৭। সরাসরি মশক বা কলসীর মুখে মুখ লাগিয়ে পানি পান করবেন না

যেহেতু মহানবী (সাঃ) এভাবে পান করতে নিষেধ করেছেন।[1]
বুঝতেই তো পারছেন, এভাবে পানি পান করলে গোটা মশক বা কলসীর পানি নোংরা হয়ে যাবে, মশক বা কলসীর ভিতরে কোন কুটা বা পোকা থাকলে তা আপনার পেটে চলে যেতে পারে এবং এইভাবে গোটা মশক বা কলসীর পানি এঁটো করলে সংক্রামক ব্যাধির জীবাণু একাধিক মানুষের মাঝে সংক্রমণ করতে পারে।
[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৬২৭, ৫৬২৯, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/১৬০৯ প্রমুখ
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১৮। আপনি যদি অপরকে পানাহার করান, তাহলে আদব ও মুস্তাহাব হল যে, আপনি সবার শেষে খাবেন

আল্লাহর রসূল (সাঃ) এরূপ করেছেন এবং বলেছেন, ‘‘যে লোকদেরকে পানি পান করায়, সে যেন সবার শেষে পান করে।’’[1]
[1]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/৬৮১ প্রমুখ
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

১৯। খেতে খেতে কথা বলা নিষেধ নয়

কথা বলতে পারেন, তবে খেয়াল রাখবেন যাতে গল্প বলতে বলতে আপনার ভাগ অন্যে না মেরে দেয়। আসলে ‘খেতে খেতে কথা বলতে নেই’ এ কথা মায়েরা শিশুদেরকে তাড়াতাড়ি খাওয়াতে উদ্বুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে বলে থাকেন। এটা কোন শরয়ী নির্দেশ নয়।
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২০। জামাআতবদ্ধভাবে এক পাত্রে খাওয়া মুস্তাহাব

খাবার কম থাকলেও তাতে বরকত হবে। মহানবী (সাঃ) বলেন,

طَعَامُ الْوَاحِدِ يَكْفِى الاِثْنَيْنِ وَطَعَامُ الاِثْنَيْنِ يَكْفِى الأَرْبَعَةَ وَطَعَامُ الأَرْبَعَةِ يَكْفِى الثَّمَانِيَةَ

‘‘একজনের খাবার ২ জনের জন্য, ২ জনের খাবার ৪ জনের জন্য এবং ৪ জনের খাবার  ৮ জনের জন্য যথেষ্ট।’’[1]
তিনি বলেন, ‘‘তোমরা এক সাথে খাও এবং পৃথক পৃথক খেয়ো না। যেহেতু জামাআতের সাথে (খাবারে) বরকত আছে।’’[2]
একদা সাহাবাগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রসূল! আমরা খাই, কিন্তু পরিতৃপ্ত হই না। (তার কারণ কি?)’ তিনি বললেন, ‘‘সম্ভবতঃ তোমরা পৃথক পৃথক খাও।’’ তাঁরা বললেন, ‘জী হ্যাঁ।’ তিনি বললেন, ‘‘তাহলে তোমরা খাবারে এক সাথে বস এবং আল্লাহর নাম নাও, তাহলে তোমাদের খাবারে বরকত হবে।’’[3]
তিনি আরো বলেন, ‘‘আল্লাহর নিকট সবচেয়ে পছন্দনীয় খাবার হল সেই খাবার, যার উপর অনেক হাত পড়ে।’’[4]
পক্ষান্তরে একাকী পৃথক পৃথকভাবে খাওয়াও বৈধ। যেমন মহান আল্লাহ বলেন, ‘‘তোমরা একত্রে আহার কর অথবা পৃথক পৃথকভাবে আহার কর তাতে তোমাদের জন্য কোন অপরাধ নেই।’’[5]
[1]. মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৫৪৮৯, সহীহ আত-তিরমিযী আল মাদানী প্রকাশনী হা/১৮২০, ইবনে মাজাহ তাওহীদ পাবঃ হা/৩২৫৪ প্রমুখ।

[2]. ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩২৮৭, সহীহুল জা’মে হা/৪৫০০

[3]. মুসনাদে আহমাদ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/ ১৫৬৪৮, আবূ দাঊদ হা/৩৭৬৪, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩২৮৬, সহীহুল জা’মে হা/১৪২

[4]. সহীহুল জা’মে হা/১৭১

[5]. সূরা নূর-২৪:৬১
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২১। অপর মুসলিমের সাথে খেতে এঁটো খাওয়া দূষণীয় নয়

এতে কোন মুসলিমের অকারণে ঘৃণা হওয়াও উচিত নয়। কারণ, রসূল (সাঃ) সহ সাহাবীগণ একপাত্রেই পানাহার করেছেন। বিশেষ করে স্ত্রীর এঁটো খেতে অরুচি হওয়া উচিত নয় কোন স্বামীর। যেহেতু সকল মানুষের জন্য আদর্শ স্বামী রসূল (সাঃ) নিজ স্ত্রীর (মাসিক অবস্থাতেও) এঁটো খেয়েছেন। বরং মা আয়েশা পানপাত্রের যে জায়গায় মুখ লাগিয়ে পানি পান করতেন, তিনিও সেই জায়গায় মুখ লাগিয়ে পান করতেন। যে হাড় থেকে হযরত আয়েশা গোশত ছাড়িয়ে খেতেন, সেই হাড় নিয়েই ঠিক সেই জায়গাতেই মুখ রেখে আল্লাহর নবী (সাঃ) গোশত ছাড়িয়ে খেতেন।[1]
[1]. আহমাদ, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/৩০০,
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২২। এক পাত্রে একাধিক লোক খেলে খাবার সময় মনের ভিতর হিংসা রাখবেন না

সবার চেয়ে আপনি বেশী খাবেন---এ সংকল্প করবেন না। মনে মনে সবার চেয়ে আপনি কম খাবেন এ নিয়ত, ইচ্ছা ও চেষ্টা যদি না-ই রাখতে পারেন, তাহলে সকলের সমান খাবেন---এ নিয়ত যেন অবশ্যই রাখেন। খাবার সময় ভালো জিনিসটি আগে-ভাগে তুলে খাবেন না। বড় বড় লোকমা ধরবেন না। একটির জায়গায় দুটি এক সাথে কিছু তুলে খাবেন না। স্বাভাবিকতার সীমা লংঘন করে ঘন ঘন গ্রাস তুলবেন না।
যেহেতু রসূল (সাঃ) সঙ্গীর অনুমতি ছাড়া এক সঙ্গে দুটি করে খেজুর খেতে নিষেধ করেছেন।[1]
[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ২৪৫৫, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/২০৪৫, প্রমুখ
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২৩। যদি আপনাকে কেউ খেতে ডাকে

এবং আপনার পেটে ক্ষুধা ও মনে খাবার ইচ্ছা থাকে, তাহলে তা গোপন করে মিথ্যা ওযর পেশ করবেন না।[1]
[1]. আহমাদ, ইবনে মাজাহ, সহীহুল জা’মে হা/৭২৩০
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২৪। আপনার খানা যদি খাদেম প্রস্ত্তত করে, তাহলে সেই খাবারে খাদেমকেও শরীক করুন

যেহেতু সে ঐ খাবারের পিছনে মেহনত করেছে, তার সুগন্ধ তার পেটে গেছে এবং হয়তো বা তার মন ঐ খাবারের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে। এই জন্যই দয়ার রসূল (সাঃ) এর নির্দেশ হল, তাকে বসিয়ে এক সাথে খান। আর তাকে বসানো যদি সম্ভব না হয় বা সে বসতে না চায়, তাহলে সেই খাবার হতে কিছু অংশ তুলে তাকে দিয়ে খান।[1]
[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৪৬০, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা হা/১৬৬৩
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২৫। এমন টেবিল, দস্তরখান বা মজলিসে বসে খাবেন না, যে মজলিসে মদ বা অন্য কোন হারাম জিনিস খাওয়া হয়

সে ভোজ অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করবেন না, যে ভোজ অনুষ্ঠানে কোন নোংরা জিনিস করা বা দেখানো হয়।
প্রিয় নবী (সাঃ)বলেন, ‘‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে সে যেন কখনই সেই ভোজ-মজলিসে না বসে যাতে মদ্য পরিবেশিত হয়।’’[1]
[1]. আহমাদ, তিরমিযী, হাকেম, আদাবুয যিফাফ ১৬৩-১৬৪ পৃঃ. মেহমান নেওয়াযীর আদব দ্রঃ
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২৬। জামাআতে সবারই খাওয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত খাবার হতে হাত না তোলা

উঠে না যাওয়া এবং বসে থেকে খাওয়ার ভান করার ব্যাপারে (ইবনে মাজাহর) হাদীসটি অত্যন্ত দুর্বল।[1] সুতরাং এ আদবকে সুন্নাত জ্ঞান করা ঠিক নয়।
[1]. সিলসিলাহ যয়ীফাহ ২৩৮-২৩৯
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২৭। জুতো পায়ে রেখে খাওয়া অবৈধ নয়

জুতো খুলে খাওয়ার হাদীস সহীহ নয়।[1]
[1]. সিলসিলাহ যয়ীফাহ হা/৯৮০
 ইসলামী জীবন-ধারা  পানাহারের আদব  আবদুল হামীদ ফাইযী

২৮। পেটুকদের মত ভরপেট এত খাওয়া খাবেন না, যাতে নড়তেই না পারেন

বেশী খেলে পেটের রোগ হতে পারে, শরীর ভারী হতে পারে এবং তাতে ইবাদতে আলস্য সৃষ্টি হতে পারে। আর বেশী খেলে আপনার হৃদয়ও কঠোর হতে পারে। তাছাড়া বেশী বেশী খাওয়া আসলে কাফেরদের অভ্যাস। সুতরাং রাসুল (সাঃ) এর নির্দেশমত খান, তাহলে শরীর ও স্বাস্থ্য ভালো থাকবে।
আল্লাহর রসূল (সাঃ) বলেন,

الْكَافِرُ يَأْكُلُ فِى سَبْعَةِ أَمْعَاءٍ وَالْمُؤْمِنُ يَأْكُلُ فِى مِعًى وَاحِدٍ

‘‘মুসলিম একটি মাত্র অন্ত্রে খায়, পক্ষান্তরে কাফের খায় সাত অন্ত্রে।’’[1] তিনি আরো বলেন, ‘‘উদর অপেক্ষা নিকৃষ্টতর কোন পাত্র মানুষ পূর্ণ করে না। আদম সমত্মানের জন্য ততটুকুই খাদ্য যথেষ্ট যতটুকুতে তার পিঠ সোজা করে রাখে। আর যদি এর চেয়ে বেশী খেতেই হয়, তাহলে সে যেন তার পেটের এক তৃতীয়াংশ আহারের জন্য, এক তৃতীয়াংশ পানের জন্য এবং অন্য আর এক তৃতীয়াংশ শ্বাস-প্রশ্বাসের জন্য ব্যবহার করে।’’[2]
পক্ষান্তরে এত কমও খাবেন না, যাতে শরীরই ভেঙ্গে যায়। যেহেতু স্বাস্থ্য দুর্বল হয়ে পড়লে ইবাদতেও দুর্বলতা আসবে। সুতরাং পানাহারের ব্যাপারে মধ্যপন্থা অবলম্বন করুন; ভালো থাকবেন।
[1]. বুখারী তাওহীদ পাবঃ হা/ ৫৩৯৬, মুসলিম আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৫৪৯৩, ইবনে মাজাহ তাওহীদ পাবঃ হা/৩২৫৭

[2]. তিরমিযী হা/২৩৮০, ইবনে মাজাহ আল-মাকতাবাতুশ-শামেলা. হা/৩৩৪৯, ইবনে হিববান, হাকেম ৪/১২১, সহীহুল জা’মে হা/৫৬৭৪
 https://rasikulindia.blogspot.com আপনি চাইলে -Whatapps-Facebook-Twitter-ব্লগ- আপনার বন্ধুদের Email Address সহ অন্য Social Networking-ওয়েবসাইটে শেয়ার করতে পারেন-মানবতার মুক্তির লক্ষ্যে ইসলামের আলো ছড়িয়ে দিন। "কেউ হেদায়েতের দিকে আহবান করলে যতজন তার অনুসরণ করবে প্রত্যেকের সমান সওয়াবের অধিকারী সে হবে, তবে যারা অনুসরণ করেছে তাদের সওয়াবে কোন কমতি হবেনা" [সহীহ্ মুসলিম: ২৬৭৪]-:-admin by rasikul islam নিয়মিত আপডেট পেতে ভিজিটকরুন -এই ওয়েবসাইটে -https://sarolpoth.blogspot.com/(জানা অজানা ইসলামিক জ্ঞান পেতে runing update)<> -https://rasikulindia.blogspot.com (ইসলামিক বিশুদ্ধ শুধু বই পেতে, পড়তে ও ডাউনলোড করতে পারবেন). Main Websaite-  https://rasikulindia.blogspot.comesoislamerpothecholi.in , comming soon my best world websaite

Post a Comment

0 Comments