· প্রথম পরিচ্ছেদ: জাকাতুল ফিতর হিসেবে প্রদেয় দ্রব্যের প্রকার (জিলস)
জাকাতুল ফিতর মূলত ওই অঞ্চলের প্রধান খাদ্যশস্য থেকে আদায় করতে হয়।
১. সর্বসম্মত দ্রব্যসমূহ
(খেজুর, যব,
গম ও কিশমিশ):
ইজমা বা ঐকমত্য অনুযায়ী খেজুর ও যব দ্বারা ফিতরা আদায় করা বৈধ।
- কাজী আইয়াজ
(র.) বলেন: "গম, যব,
খেজুর এবং কিশমিশ দিয়ে ফিতরা আদায় করার বৈধতার বিষয়ে ওলামাদের মাঝে
কোনো বিরোধ নেই। তবে গমের ক্ষেত্রে এমন কিছু ব্যক্তি দ্বিমত করেছেন যাদের মত গ্রহণযোগ্য
নয়। একইভাবে কিশমিশের ক্ষেত্রেও পরবর্তী যুগের কারো কারো দ্বিমত রয়েছে। অথচ এই
বিরোধ তৈরি হওয়ার আগেই ইজমা বা ঐকমত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল।" সূত্র: 'ইকমালুল মুলিম' (৩/৪৮১)।
- ইমাম নববী
(র.) বলেন: "কাজী আইয়াজ উল্লেখ করেছেন যে,
প্রদেয় দ্রব্যের প্রকার নিয়ে মতভেদ থাকলেও আলেমগণ একমত হয়েছেন যে—
গম, কিশমিশ, খেজুর ও যব দ্বারা ফিতরা
দেয়া জায়েজ। গমের ব্যাপারে যাদের ভিন্নমত রয়েছে তারা ধর্তব্য নয়, আর কিশমিশের ভিন্নমতটিও ইজমার পরবর্তী (তাই গ্রহণযোগ্য নয়)।" সূত্র: 'শারহু নববী আলা মুসলিম' (৭/৬০)।
২. ফিতরার পরিমাণ ও প্রকারভেদ:
- ইমাম আল-বাজী
(র.) বলেন: "রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী— 'এক সা’ খেজুর বা এক সা’ যব' মূলত এটিই প্রকাশ করে
যে, এসব দ্রব্য দিয়ে সাদকায়ে ফিতর আদায় করা জায়েজ। যব ও
খেজুর প্রদানের বৈধতায় কোনো দ্বিমত নেই এবং এর পরিমাণ হলো এক 'সা'। আর এক সা’ হলো নবী
(সা.)-এর ব্যবহৃত মুদ-এর মাপে চার মুদ (প্রায় ২.৫ থেকে ৩ কেজি)।" সূত্র: 'আল-মুনতাকা শারহুল মুওয়াত্তা' (২/১৮৬)।
৩. হাদিসে 'ত্বআম' বা খাদ্যের ব্যাখ্যা:
- ইমাম কুরতুবী
(র.) বলেন: "হাদিসের শব্দ— 'এক সা’ খাদ্য (ত্বআম), বা এক সা’ পনির (আক্বিত্ব),
বা এক সা’ যব, বা এক সা’ কিশমিশ'—এখানে 'খাদ্য' (ত্বআম) বলতে
গম বোঝানো হয়েছে। এর প্রমাণ হলো যবকে আলাদাভাবে উল্লেখ করা। আবু দাউদ
(র.)-এর বর্ণনায় 'খাদ্য'-এর স্থলে
সরাসরি 'গম' (হিনত্বাহ) শব্দ এসেছে।
যারা মনে করেন গম দিয়ে ফিতরা হবে না, তাদের বিপক্ষে এটি
বড় দলিল। তাদের এই মতভেদটি অত্যন্ত বিরল (শাজ) এবং সালাফদের ইজমার পরিপন্থী।"
সূত্র: 'আল-মুফহিম' (৩/২২)।
৪. পরিস্থিতির আলোকে
বিভাজন (তাকসিম):
প্রধান খাদ্যের
অগ্রাধিকার:
- আল-জুরকানী (র.) বলেন: "হাদিসে বর্ণিত 'অথবা এক সা’ যব,
অথবা এক সা’ খেজুর'—এখানে 'অথবা' শব্দটি বণ্টনের জন্য এসেছে, কেবল ইচ্ছাধীন নির্বাচনের জন্য নয়। অর্থাৎ যার প্রধান খাদ্য যব সে যব
দেবে, যার প্রধান খাদ্য খেজুর সে খেজুর দেবে। 'আক্বিত্ব' বলতে মাখন মিশ্রিত জমাটবদ্ধ দুধ বা
পনির বোঝায়। নিয়ম হলো— গম, যব, খেজুর,
কিশমিশ এবং পনির—এই পাঁচটি দ্রব্যের মধ্যে যেটি ওই অঞ্চলের মানুষের
প্রধান খাদ্য, তা থেকেই ফিতরা আদায় করতে হবে।"
সূত্র: 'শারহুল জুরকানী আলাল মুওয়াত্তা' (২/২২০)।
সারসংক্ষেপ ও শিক্ষণীয়
বিষয়:
১. প্রধান খাদ্যের গুরুত্ব:
ফিতরা কেবল নির্দিষ্ট কোনো বস্তুর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের মানুষ সচরাচর যা খেয়ে জীবনধারণ করে (যেমন আমাদের দেশে
চাল), তা থেকে দেওয়াও উত্তম।
২. পরিমাণ: ফিতরার আদর্শ মাপ
হলো এক 'সা'। আধুনিক মাপে এটি প্রায় ৩ কেজির কাছাকাছি
(শস্যভেদে সামান্য কম-বেশি)।
৩. ইজমার অনুসরণ: ফিতরার মৌলিক
পণ্যগুলোর (গম, খেজুর, যব) ক্ষেত্রে যে
ঐকমত্য রয়েছে, তা অনুসরণ করাই নিরাপদ ইবাদত।
ইবনে হাজম (র.)-এর উদ্ধৃতি
ও ইবনে উমর (রা.)-এর আমল:
ইবনে হাজম (র.) ইবনে উমর (রা.) থেকে
বর্ণনা করেন যে, তিনি (ইবনে উমর) খেজুর অথবা যব ছাড়া অন্য কিছু
বের করতেন না।
ইবনে হাজম বলেন:
"এই যে ইবনে উমর (রা.), আমরা উল্লেখ করেছি যে তিনি খেজুর বা যব ছাড়া অন্য কিছু বের করতেন না,
এমনকি গমও বের করতেন না। তাকে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান যে,
তিনি এই কাজে তাঁর সাথীদের (রাসূলুল্লাহ সা.-এর সাহাবীগণ) পথ অনুসরণ
করছেন। এরাই সেই সব মানুষ যাদের বিরোধিতা করাটা ভীতিকর (অনুচিত); তাঁরাই হলেন সাহাবী (রাযিয়াল্লাহু আনহুম), যাদের আমল
আমাদের কাছে অত্যন্ত বিশুদ্ধ সূত্রে পৌঁছেছে। আর তাঁরা (সাহাবীগণ) তো এর চেয়ে কম তথ্য
পেলেও তাকে ইজমা (ঐকমত্য) বলে দাবি করতেন!" সূত্র: 'আল-মুহাল্লা' (৪/২৪৯)।
মাযহাবসমূহের সম্মিলিত
অবস্থান:
এটি সাধারণভাবে মালিকি মাযহাবের
অভিমত। মালিকিগণের বিস্তারিত ব্যাখ্যা হলো— প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত নয়টি জিনিস
থেকে ফিতরা দিতে হবে: গম (ক্বামহ), যব
(শাইর), সুলত (এক প্রকার যব), চাল (আরুয),
ভুট্টা (যুরাহ), কাউন/বাজরা (দুখুন), খেজুর (তামর), কিসমিস (যাবিব) এবং পনির (আক্বিত)।
যদি এই নয়টি প্রকারের কোনোটিই পাওয়া
না যায় এবং অন্য কিছু প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তবে সেই প্রধান খাদ্য থেকেই ফিতরা বের করতে হবে।
· সূত্র: হাত্তাব রচিত 'মাওয়াহিবুল জলিল' (৩/২৬১); খারাশি রচিত 'শারহু মুখতাসার খলিল' (২/২২৯); বাজি রচিত 'আল-মুনতাকা' (২/১৮৮); ক্বারাফি রচিত 'আয-যাখিরা' (৩/১৬৭-১৬৯)।
· এটি শাফেয়ি মাযহাবের অভিমত। তবে শাফেয়িগণ এটিকে সংশ্লিষ্ট
এলাকার প্রধান খাদ্যের (গালিবু ক্বুতিল বালাদ) সাথে শর্তযুক্ত করেছেন।
· সূত্র: ইমাম নববী রচিত 'রওজাতুত ত্বালিবিন' (২/৩০৩); হাইতামী রচিত 'তুহফাতুল
মুহ তাজ' (৩/৩২১)।
· এটি ইমাম আহমদের (র.) একটি বর্ণনা এবং অধিকাংশ আলেমের
মাযহাব।
· সূত্র: 'মাজমুউল ফাতাওয়া' (২৫/৬৯); ইবনে কুদামা রচিত 'আল-মুগনি'
(৩/৮৫); ইবনুল কাইয়্যিম রচিত 'ইলামুল মুওয়াক্কিঈন' (৩/১১)।
শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়্যাহ
(র.)-এর পছন্দ ও বিশ্লেষণ:
ইবনে তাইমিয়্যাহ (র.)
বলেন:
"মানুষ যা প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে,
তা ছাড়া অন্য কিছু কি তারা ফিতরা হিসেবে বের করতে পারবে? যেমন— তারা যদি প্রধান খাদ্য হিসেবে চাল বা কাউন ব্যবহার করে, তবে তাদের ওপর কি গম বা যব বের করা আবশ্যক, নাকি চাল,
কাউন বা ভুট্টা দিলেই যথেষ্ট হবে?
এ বিষয়ে প্রসিদ্ধ মতভেদ রয়েছে। ইমাম
আহমদের পক্ষ থেকে দুটি বর্ণনা পাওয়া যায়: একটি হলো—নাস (হাদিসে স্পষ্টভাবে
বর্ণিত খাদ্য) ছাড়া অন্য কিছু বের করা যাবে না;
অন্যটি হলো—সে যা প্রধান খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করে তা-ই বের করবে, যদিও তা হাদিসে উল্লিখিত ওই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত না হয়। আর
এটিই শাফেয়িসহ অধিকাংশ আলেমের মত।
এটিই অধিকতর সঠিক অভিমত। কারণ সদকার মূল লক্ষ্য হলো— দরিদ্রদের সাথে সমতা ও সহমর্মিতা
প্রকাশ করা, যেমনটি আল্লাহ তাআলা (কাফফারা প্রসঙ্গে) বলেছেন:
'তোমরা তোমাদের পরিবারকে যা খাওয়াও তার মধ্যম মানের খাবার'
[সূত্র: সূরা মায়িদাহ:
৮৯]।
নবী করীম (সা.) জাকাতুল ফিতর এক সা' খেজুর অথবা এক সা' যব ফরজ করেছিলেন,
কারণ এটিই তখন মদিনাবাসীদের প্রধান খাদ্য ছিল।
যদি এটি তাদের প্রধান খাদ্য না হয়ে
অন্য কিছু হতো, তবে তিনি তাদের এমন জিনিস বের করার কষ্ট দিতেন
না যা তারা নিজেরা খায় না— যেমনটি আল্লাহ কাফফারার ক্ষেত্রেও নির্দেশ দেননি। আর জাকাতুল
ফিতর তো এক প্রকারের কাফফারার মতোই; কাফফারা যেমন দেহের সাথে
সংশ্লিষ্ট, ফিতরাও তেমনি দেহের সাথে সংশ্লিষ্ট।" সূত্র: 'মাজমুউল ফাতাওয়া' (২৫/৬৮, ৬৯)।
ইবনুল কাইয়্যিম (র.)-এর
বিশ্লেষণ:
ইবনুল কাইয়্যিম (র.)
বলেন:
"চতুর্থ উদাহরণ: নবী করীম (সা.) জাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা' খেজুর, অথবা এক সা' যব, অথবা এক সা' কিসমিস,
অথবা এক সা' পনির (আক্বিত) ফরজ করেছিলেন। এগুলোই
ছিল তখন মদিনাবাসীদের প্রধান খাদ্য।
অতএব, এমন কোনো শহর বা জনপদ যাদের প্রধান খাদ্য এগুলো নয়, তাদের ওপর তাদের নিজস্ব প্রধান খাদ্য থেকেই এক সা' প্রদান
করা আবশ্যক। যেমন যাদের প্রধান খাদ্য ভুট্টা, চাল, ডুমুর বা এজাতীয় অন্য কোনো শস্য। এমনকি যদি তাদের প্রধান খাদ্য শস্য জাতীয়
কিছু না হয়ে অন্য কিছু হয়—যেমন দুধ, মাংস বা মাছ—তবে তারা তাদের
সেই প্রধান খাদ্য থেকেই ফিতরা বের করবে, তা যা-ই হোক না কেন।
এটিই জুমহুর (অধিকাংশ)
আলেমের মত এবং এটিই সঠিক সিদ্ধান্ত যা ছাড়া অন্য
কিছু বলা সংগত নয়; কেননা এর উদ্দেশ্য হলো ঈদের দিনে অভাবীদের প্রয়োজন
মেটানো এবং নিজ অঞ্চলের সাধারণ মানুষ যা খেয়ে থাকে তা দিয়েই তাদের সাথে সহমর্মিতা প্রকাশ
করা।" সূত্র: 'ইলামুল মুওয়াক্কিঈন' (৩/১১)।
বিংশ শতাব্দীর বরেণ্য
আলেমদের ফাতওয়া:
শাইখ ইবনে বায (র.)-এর
অভিমত: ইবনে বায (র.) বলেন:
"জাকাতুল ফিতর হিসেবে চাল বা জনপদের অন্য কোনো প্রধান খাদ্য বের করা জায়েজ। কারণ জাকাত হলো একটি সহমর্মিতা; আর চাল দিয়ে ফিতরা আদায় করা বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ সহমর্মিতার অন্তর্ভুক্ত, কারণ বর্তমানে চালই মানুষের প্রধান ও উৎকৃষ্ট খাদ্য।" সূত্র: 'মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বায' (১৪/২০৭)।
শাইখ ইবনে উসাইমীন (র.)-এর
অভিমত: ইবনে উসাইমীন (র.) বলেন:
"জাকাতুল ফিতরে চাল প্রদান করা জায়েজ হওয়ার
ব্যাপারে কোনো সন্দেহ নেই। বরং আমরা হয়তো বলতে পারি, আমাদের এই
যুগে এটি অন্য কিছুর চেয়ে উত্তম; কারণ বর্তমানে এটিই মানুষের
প্রধান খাদ্য। এর সপক্ষে সহিহ বুখারিতে বর্ণিত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর হাদিসটি দলিল,
যেখানে তিনি বলেছেন: 'আমরা নবী করীম (সা.)-এর যুগে
ঈদুল ফিতরের দিন এক সা' খাদ্য বের করতাম; আর আমাদের খাদ্য ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।' সুতরাং (হাদিসে) এই নির্দিষ্ট প্রকারগুলোর
উল্লেখ উদ্দেশ্য নয়, বরং সেই সময় এগুলোই তাদের সাধারণ খাবার ছিল
বলেই উল্লিখিত হয়েছে।" সূত্র: 'মাজমুউ ফাতাওয়া ওয়া
রাসাইল আল-উসাইমীন' (১৮/২৮৩)।
দলিলসমূহ:
প্রথমত: সুন্নাহ থেকে
দলিল আবু সাঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:
"যতদিন আমাদের মাঝে রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন,
ততদিন আমরা ছোট-বড়, স্বাধীন-ক্রীতদাস প্রত্যেকের
পক্ষ থেকে জাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা' খাদ্য, অথবা এক সা' পনির, অথবা এক সা'
যব, অথবা এক সা' খেজুর,
অথবা এক সা' কিসমিস বের করতাম।" সূত্র: সহিহ বুখারি (১৫০৬), সহিহ মুসলিম (৯৮৫)—শব্দবিন্যাস মুসলিমের।
অন্য এক বর্ণনায় এসেছে:
"আমরা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে ঈদুল ফিতরের
দিন এক সা' খাদ্য বের করতাম। আবু সাঈদ (রা.) বলেন: আমাদের খাবার
ছিল যব, কিসমিস, পনির ও খেজুর।" সূত্র: সহিহ বুখারি (১৫১০)।
শিক্ষণীয় ও সারসংক্ষেপ:
১. উদ্দেশ্য বনাম মাধ্যম:
ইবনুল কাইয়্যিম (র.)-এর বক্তব্য থেকে স্পষ্ট যে, হাদিসে বর্ণিত খাদ্যগুলো কেবল মাধ্যম, মূল উদ্দেশ্য হলো
অভাবীদের ক্ষুধা নিবারণ। তাই যুগ ও স্থান ভেদে প্রধান খাদ্যের পরিবর্তন হলে ফিতরার
উপাদানেও পরিবর্তন আসা যৌক্তিক।
২. চালের ফিতরা: আধুনিক আরব
ও অনারব ফকীহগণের মতে, বর্তমান যুগে চাল দিয়ে ফিতরা দেওয়া অত্যন্ত
উত্তম আমল।
৩. সহজীকরণ: ইসলাম কোনো কঠিন
নিয়ম চাপিয়ে দেয় না; বরং মানুষের ঘরে যা আছে তা থেকেই দান করার সুযোগ
দেয়।
প্রথম পরিচ্ছেদ: জাকাতুল ফিতর হিসেবে যা বের করা হবে (দলিল ও যুক্তিখণ্ড)
জাকাতুল ফিতর কেন প্রধান খাদ্য থেকে প্রদান করা হবে, সে বিষয়ে আলেমগণ অত্যন্ত শক্তিশালী ও যৌক্তিক দলিল পেশ করেছেন:
দলিলাদি ও
যৌক্তিক বিশ্লেষণ:
১. মদিনার প্রচলিত
খাদ্যই ছিল ভিত্তি:
নবী করীম (সা.) জাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা' খেজুর অথবা এক সা' যব ফরজ করেছিলেন; কারণ এটিই তখন মদিনাবাসীদের প্রধান খাদ্য ছিল। সূত্র: 'মাজমুউল ফাতাওয়া' (২৫/৬৮, ৬৯)।
২. অভাবীদের প্রয়োজন
মেটানো ও সহমর্মিতা:
দ্বিতীয়ত: জাকাতুল ফিতরের মূল উদ্দেশ্য হলো ঈদের দিনে অভাবীদের প্রয়োজন মেটানো। আর তাদের প্রতি এই সহমর্মিতা তখনই পূর্ণাঙ্গভাবে প্রকাশ পায়, যখন সদকাটি সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের মানুষের প্রধান খাদ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। সূত্র: 'ইলামুল মুওয়াক্কিঈন' (৩/১১)।
৩. প্রাপকদের
আকাঙ্ক্ষা ও উপযোগিতা:
তৃতীয়ত: যাদের ফিতরা দেওয়া হবে (মিসকিন বা হকদার), তাদের মন ও রুচি সাধারণত নিজ জনপদের প্রধান খাদ্যের দিকেই নিবদ্ধ
থাকে। অপরিচিত বা অপ্রচলিত কোনো খাদ্যের চেয়ে নিজ এলাকায় বহুল ব্যবহৃত খাদ্যের মাধ্যমেই
তাদের বেশি উপকার হয়।
সূত্র: ইবনে হাজার আল-হাইতামী রচিত 'তুহফাতুল মুহ তাজ' এবং 'হাশিয়াতুশ শিরওয়ানী ওয়াল আব্বাদী' (৩/৩২১)।
৪. মানুষের দ্বারে
দ্বারে ঘোরা থেকে মুক্তি:
চতুর্থত: ফিতরার অন্যতম লক্ষ্য হলো দরিদ্রদেরকে (ঈদের দিনে) মানুষের
কাছে চাওয়া বা হাত পাতা থেকে বিমুখ রাখা। তারা মূলত নিজেদের খাবারের জন্যই অন্যের কাছে
প্রার্থনা করে; তাই ফিতরা হিসেবে প্রধান খাদ্য দ্রব্যটিই ধর্তব্য
হওয়া আবশ্যক। সূত্র: আল-কারাফি রচিত 'আয-যাখিরা' (৩/১৬৮)।
৫. উদ্বৃত্ত খাবারের
সাথে সামঞ্জস্যতা:
পঞ্চমত: যেহেতু ফিতরা প্রদানকারীর নিজের খাবারের অতিরিক্ত অংশ থেকে
আদায় করা ওয়াজিব, সেহেতু এটি তার নিজ অঞ্চলের প্রধান খাদ্য থেকেই
হওয়া আবশ্যক। সূত্র: ইমাম নববী রচিত 'আল-মাজমু' (৬/১২৯, ১৩০)।
৬. দাতা ও গ্রহীতার
ভারসাম্য রক্ষা:
ষষ্ঠত: মানুষকে এমন কিছু ফিতরা দিতে বাধ্য করা উচিত নয় যা তাদের
প্রধান খাদ্য নয়। কারণ এতে দাতার জন্য সেই খাদ্য সংগ্রহ করা কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে
(মেশাক্কাত), আবার গ্রহীতার কাছেও সেই অপ্রচলিত খাদ্যের
কোনো প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। সূত্র: 'মাজমুউল ফাতাওয়া' (২৫/৬৮, ৬৯)।
৭. কাফফারার বিধানের
সাথে কিয়াস বা সাদৃশ্য:
সপ্তমত: এটিকে কাফফারার সদকার সাথে কিয়াস (তুলনা) করা হয়েছে। কাফফারার
ক্ষেত্রেও খাদ্যদ্রব্য ওই অঞ্চলের প্রধান খাদ্য থেকেই প্রদান করা হয়। আর জাকাতুল ফিতর
মূলত কাফফারা জাতীয় সদকা; কারণ উভয়ই দেহের (জান) সাথে সংশ্লিষ্ট ইবাদত। সূত্র: 'মাজমুউল ফাতাওয়া' (২৫/৬৮, ৬৯)।
সারসংক্ষেপ ও শিক্ষণীয় বিষয়:
- প্রধান খাদ্যের
প্রাধান্য: হাদিসে খেজুর বা যবের কথা উল্লেখ
থাকলেও ফুকাহাদের বড় অংশের মতে, এর মূল হিকমত বা কারণ হলো 'প্রধান খাদ্য'
হওয়া। তাই আমাদের দেশে যেখানে চাল প্রধান খাদ্য, সেখানে চাল দিয়ে ফিতরা আদায় করা অধিকতর যুক্তিযুক্ত।
- সহমর্মিতা: ইবনে তাইমিয়্যাহ (র.)-এর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, ফিতরা হলো দরিদ্রদের সাথে নিজের খাবার ভাগ করে নেওয়া। নিজে
চাল খেয়ে অন্যকে গম বা যব দেওয়া (যা সে এলাকায় চলে না) ফিতরার মূল চেতনার পরিপন্থী।
- সাহাবীদের
আনুগত্য: ইবনে উমর (রা.)-এর আমল থেকে প্রতীয়মান হয় যে, সুন্নাহর হুবহু অনুসরণের বিষয়ে সাহাবীগণ কতটা সতর্ক ছিলেন।
বিশেষ ব্যাখ্যা ও
শিক্ষণীয় দিক:
·
যৌক্তিক ইসলাম: উপরোক্ত সাতটি
যুক্তি প্রমাণ করে যে,
ইসলামি শরিয়ত কেবল অন্ধ অনুকরণের নাম নয়, বরং এর প্রতিটি বিধানের পেছনে ইনসাফ ও সামাজিক উপযোগিতা
রয়েছে।
·
আর্থ-সামাজিক সমাধান: ফিতরা কেবল
একটি ধর্মীয় আচার নয়,
বরং এটি একটি সুসংগঠিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যা নিশ্চিত করে
যেন ঈদের খুশিতে সমাজের কোনো স্তর ক্ষুধার্ত না থাকে।
· চাল দিয়ে ফিতরা আদায়ের ভিত্তি: আমাদের বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইবনে তাইমিয়্যাহ এবং ইবনুল কাইয়্যিম (র.)-এর এই গবেষণালব্ধ মতটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যেহেতু এ দেশের প্রধান খাদ্য চাল, তাই চাল দিয়ে ফিতরা আদায় করাই সুন্নাহর মূল চেতনার সবচেয়ে নিকটবর্তী।




0 Comments