শুধু হাদিসের অনুবাদ পড়ে কি পণ্ডিত হওয়া যায়? সালাফদের বুঝ বনাম আমাদের অন্ধত্ব
"অজ্ঞতার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো,
অজ্ঞ ব্যক্তি নিজেই জানে না যে সে অজ্ঞ।"
বিসমিল্লাহির
রহমানির রহিম।
আমাদের সমাজে বর্তমানে একটি বড়
সংকট তৈরি হয়েছে। আমরা অনেকেই প্রচলিত ভুল পথ বা গোড়ামি ছেড়ে কুরআন ও সহীহ
হাদিসের পথে আসার দাবি করছি, যা অত্যন্ত আনন্দের।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে,
এই পথের পথিকদের মধ্যেই এখন এক নতুন ধরণের 'ইলমি অহংকার' ও 'উগ্রতা' দেখা দিচ্ছে।
২-৪টি হাদিসের অনুবাদ বা বুকলেট
পড়ে,
বুকের ওপর হাত বাঁধা, জোরে আমীন
বলা কিংবা টাখনুর ওপর কাপড় পরার মতো কিছু বাহ্যিক আমল করেই অনেকে নিজেকে মস্ত বড়
'মুহাদ্দিস' বা পণ্ডিত ভাবা শুরু
করেছেন। ফলে তাদের মধ্য থেকে বিনয় (تواضع) হারিয়ে যাচ্ছে, যুক্তির আস্ফালন
বাড়ছে এবং যুক্তিতে না পারলে কর্কশ ভাষায় মানুষের ওপর ফতোয়া বা হুকুম জারি করার
প্রবণতা তৈরি হচ্ছে।
অথচ তারা জানেন না—একটি হাদিসের
বিপরীতে আর কোনো হাদিস আছে কিনা, হাদিসটির প্রেক্ষাপট
(আসবাবুন নুযুল) কী,
কিংবা উম্মতের শ্রেষ্ঠ সন্তান সালাফে সালেহীনরা (সাহাবী, তাবেয়ী ও তাবে-তাবেয়ীগণ) সেই হাদিসটিকে কীভাবে বুঝেছেন ও
আমল করেছেন।
কিন্তু ভাইসকল, এটা কি আসলেই সালাফদের (সাহাবী, তাবেয়ী
ও তাবে-তাবেয়ীদের) বুঝ ও মানহাজ? হাদিস সহীহ হওয়া এক জিনিস,
আর সেই হাদিসের সঠিক ব্যাখ্যা (Fahm) এবং উসূল
(নীতিমালা) জানা সম্পূর্ণ অন্য জিনিস। একটি হাদিস পেলেই হুট করে হুকুম দেওয়া যায়
না, দেখতে হয় এর বিপরীতে অন্য কোনো হাদিস আছে কি না, হাদিসটি নাসিখ নাকি মানসূখ (রহিত), এবং সালাফরা তা
কীভাবে আমল করেছেন।
আসুন এই বিষয়ে কুরআন, সহীহ হাদিস এবং সালাফদের কিছু অকাট্য দলিল ও রেফারেন্স দেখে
নিই:
১. অল্প বিদ্যা ও অহংকারের
পরিণতি
জ্ঞানের গভীরতা না
থাকলে মানুষ অহংকারী হয়।
ইমাম ইবনুল
মুবারক (রহ.) ইলমের স্তর নিয়ে সালাফদের একটি বিখ্যাত উক্তি বর্ণনা
করেছেন ও ইমাম শাফেয়ী (রহ.) বা সালাফদের একটি বিখ্যাত উক্তি রয়েছে:
"জ্ঞান হলো তিনটি বিঘত (স্তর) সমপরিমাণ। যে প্রথম স্তরে পৌঁছায়, সে অহংকারী হয়ে ওঠে। যে দ্বিতীয় স্তরে
পৌঁছায়, সে বিনয়ী
হয়। আর যে তৃতীয় স্তরে পৌঁছায়, সে বুঝতে পারে যে সে আসলে কিছুই জানে না।"
[রেফারেন্স: আল-মুছান্নাফ, ইবনে আবী শাইবা: খণ্ড ১৩, পৃষ্ঠা ৫০৪; জামী’ বয়ানিল ইলমি ওয়া ফাদলিহি, ইবনু আব্দিল বার]
আবু হানিফা (র.)
থেকে বর্ণিত:
"যে ব্যক্তি উপযুক্ত সময় আসার আগেই ইলমের (জ্ঞানের) মাধ্যমে
নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা করে, সে তার বাকি জীবন লাঞ্ছনার মধ্যে
অতিবাহিত করে।"
আল্লামা বকর বিন আব্দুল্লাহ আবু জাইদ (র.) বলেন:
"যোগ্য হওয়ার আগেই নেতৃত্বের আসনে বসা থেকে সতর্ক থাকো, কারণ এটি ইলম (জ্ঞান) এবং আমল (কাজ)—উভয়ের জন্যই একটি মহামারী। ইলমহীন দেউলিয়া ব্যক্তিরা যা নিয়ে বিনোদন খোঁজে তা থেকে সতর্ক থাকো; তারা মূলত দু-একটি মাসআলা মুখস্থ করে নেয়, তারপর যখন এমন কোনো মজলিসে বসে যেখানে গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকেন, তখন নিজের জ্ঞান জাহির করার জন্য সেই মাসআলাটি নিয়ে বিতর্ক জুড়ে দেয়। এর মধ্যে কত যে কদর্যতা রয়েছে! তার মধ্যে সবচেয়ে ছোট কদর্যতা হলো: মানুষ ঠিকই জেনে যায় যে তার আসল যোগ্যতা কতটুকু।"
২. ইলমের আগে আদব ও আখলাকের
প্রয়োজনীয়তা
যারা কথায় কথায় কর্কশ আচরণ করেন
এবং নিজেদের মধ্যে হিংসা ও দূরত্ব তৈরি করে মসজিদকে আবাদ করার বদলে গ্রুপিং করেন, তাদের জন্য ইমাম আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.)-এর এই উক্তিটি
স্মরণীয়,
তারা হাদিস পড়লেও রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর আখলাক শিখতে পারেনি।
সালাফদের উক্তি: বিখ্যাত মুহাদ্দিস আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ.) বলেন:
"আমরা ত্রিশ বছর আদব (শিষ্টাচার) শিখেছি এবং বিশ বছর ইলম (জ্ঞান) অর্জন করেছি।"
(রেফারেন্স: আল-জামি লি-আখলাকির
রাবি ওয়া আদাবিস সামি,
খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৮০), গায়াতুন নিহায়াহ ফী তাবাকাতিল কুররা, ইবনুল জাজারী: ১/৪৪৬]
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই কিয়ামতের দিন মুমিনের মিজানে
(আমলনামায়) উত্তম চরিত্রের চেয়ে ভারী আর কোনো জিনিস হবে না।" [সুনানে তিরমিযী, হাদিস নং: ২০০২, ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন]
বিলাল বিন সাদ
বলেন: "যখন তুমি কোনো
মানুষকে একগুঁয়ে, হঠকারী এবং বিতর্কপ্রিয় দেখবে, তখন বুঝবে যে তার পুরোপুরি ক্ষতি ও ধ্বংস নেমে এসেছে।"
৩.কর্কশ ভাষা ও উগ্রতা মানুষকে
দ্বীন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়
দ্বীনের দাওয়াত ও নসীহত হতে হবে
নরম ও মার্জিত ভাষায়। কর্কশ ভাষা বা অহংকার মানুষকে মসজিদ ও সমাজ থেকে দূরে ঠেলে
দেয়।
আল-কুরআনের বাণী: আল্লাহ তাআলা রাসুলুল্লাহ ﷺ-কে উদ্দেশ্য করে বলেন: "আল্লাহর দয়ায় আপনি তাদের প্রতি নরম হৃদয়ের হয়েছেন। যদি আপনি কর্কশভাষী ও কঠোরচিত্ত হতেন, তবে তারা আপনার চারপাশ থেকে সরে যেত।"(রেফারেন্স: সূরা আলে-ইমরান, আয়াত: ১৫৯)
৪. হাদিসের
অন্ধ অনুবাদ বিভ্রান্তির কারণ হতে পারে:
বিখ্যাত মুহাদ্দিস ও
তাবেয়ী সুফিয়ান ইবনে উইয়াইনাহ (রহ.) বলেছেন:
"হাদিস (এর বাহ্যিক অনুবাদ ও সঠিক উসূল না জানা) মানুষের জন্য বিভ্রান্তির কারণ
হতে পারে,
কেবল ফুকাহা (ইসলামী আইনবিদ ও সালাফদের বুঝ সম্পন্ন
ব্যক্তি) ছাড়া।"
[রেফারেন্স: আল-জামে' লি-আখলাকির রাবী ওয়া আদাবিস সামে', খতিব আল-বাগদাদী: ১/২১৮]
(অর্থাৎ, ফিকহ বা সালাফদের
বুঝ ছাড়া শুধু হাদিসের শাব্দিক অর্থ ধরে ফতোয়া দিলে মানুষ পথভ্রষ্ট হতে পারে।)
৫. না জেনে বা অর্ধেক জেনে
ফতোয়া দেওয়ার ভয়াবহতা
যেকোনো বিষয়ে সঠিক জ্ঞান ও উসূল
না জেনে হুট করে মন্তব্য করা বা ফতোয়া দেওয়া চরম গুনাহের কাজ।
সহীহ হাদিস: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তিকে জ্ঞান ছাড়া (ভুল) ফতোয়া দেওয়া হয়, তার পাপের দায়িত্ব সেই ফতোয়াদানকারীর ওপরই বর্তাবে।" (রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৩৬৫৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ৫৩; আলবানী হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন)
৬. দ্বীনি বিষয়ে অনর্থক
তর্ক-বিতর্কের নিষেধাজ্ঞা
যাদের দলিল বোঝার যোগ্যতা নেই, তাদের সাথে অনর্থক যুক্তি বা তর্কে লিপ্ত হওয়া ঈমানের আলো
নিভিয়ে দেয়।
সহীহ হাদিস: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "কোনো জাতি হেদায়েত পাওয়ার পর পথভ্রষ্ট হয় না, যতক্ষণ না তারা অনর্থক তর্ক-বিতর্কে লিপ্ত হয়।"
(রেফারেন্স: সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ৩২৫৩; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ৪৮; ইমাম তিরমিজি হাদিসটিকে হাসান-সহীহ বলেছেন)
ইমাম মালিক
(রহ.)-এর উক্তি:
"দ্বীনের বিষয়ে অনর্থক তর্ক-বিতর্ক মানুষের অন্তর থেকে ঈমানের নূর (আলো)
নিভিয়ে দেয় এবং অন্তরকে শক্ত করে।"
(রেফারেন্স: জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম, পৃষ্ঠা: ২৪৮)
৬. মসজিদ কমিটি ও যোগ্যতার
অবমূল্যায়ন
১. নেতৃত্বের দায়িত্ব ও আমানতের খেয়ানত
মসজিদ কমিটি এবং দায়িত্বশীলরা আল্লাহর কাছে তাদের কাজের
জবাবদিহিতার জন্য দায়ী। দায়িত্ব নিয়ে তা পালন না করা বা মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া
মুনাফিকের আলামত।
রেফারেন্স: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং তোমাদের প্রত্যেকেই নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসিত হবে।” (সহীহ বুখারী: ৭১৩৮)
সালাফদের দৃষ্টিভঙ্গি: উমর (রা.) বলতেন, “আমি যদি ইরাকের কোনো প্রান্তেও একটি ছাগল
হারিয়ে ফেলি, তবে ভয় হয় কিয়ামতের দিন আল্লাহ আমাকে সে বিষয়ে
জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।” দায়িত্ব পালনে অবহেলা করা মানে আমানতের খেয়ানত।
২. অযোগ্যদের হাতে দায়িত্ব ও চরম বিশৃঙ্খলা
আপনি বলেছেন, মসজিদে
সঠিক যোগ্যতার বিচার নেই। ইসলামে ইমাম ও মুয়াজ্জিন নির্বাচনের প্রধান শর্ত হলো—সেই
বিষয়ে জ্ঞান ও দক্ষতা। অযোগ্যকে দায়িত্ব দেওয়া এবং পদ আঁকড়ে থাকা ইসলাম সমর্থন করে
না।
রেফারেন্স: রাসূল (সা.) বলেছেন, “যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো।” জিজ্ঞেস করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট হবে? তিনি বললেন, “যখন অযোগ্য ব্যক্তির ওপর কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হবে।” (সহীহ বুখারী: ৬৪৯৬)
সালাফদের দৃষ্টিভঙ্গি: খলিফা আবু বকর (রা.) তাঁর শাসনামলে সবচেয়ে যোগ্য ব্যক্তিদেরই গুরুত্বপূর্ণ
দায়িত্ব দিয়েছিলেন। অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়াকে তারা দ্বীনের জন্য ক্ষতিকর
মনে করতেন।
৩. দায়িত্বের অবহেলা ও ভুল ধরার সংস্কৃতি
মসজিদের প্রয়োজন দেখাশোনার চেয়ে কেবল খুঁত ধরার প্রবণতা অহংকারের
বহিঃপ্রকাশ। মসজিদে সেবা করা (যেমন টয়লেট পরিষ্কার করা বা রক্ষণাবেক্ষণ করা)
সাহাবীদের সুন্নাহ। অথচ বর্তমান সমাজের লোকজন কেবল ক্ষমতা ও আধিপত্য বিস্তারকেই
গুরুত্ব দেয়।
রেফারেন্স: রাসূল (সা.) বলেছেন, “তুমি যদি কোনো মন্দ কাজ হতে দেখো, তবে
তা হাত (শক্তি/পদক্ষেপ) দিয়ে পরিবর্তন করো...” (সহীহ মুসলিম: ৪৯)। এখানে হাত দিয়ে পরিবর্তন করার
অর্থ দায়িত্বশীল হয়ে সংশোধন করা, কেবল মুখ দিয়ে
সমালোচনা করা নয়।
সালাফদের দৃষ্টিভঙ্গি: ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহ.) বলতেন, “আমি মানুষের সমালোচনা করতে ভয় পাই, কারণ আমি জানি না আমি নিজের কাজে কতটুকু সফল।” সালাফরা নিজের কাজের উন্নতির পেছনে ব্যস্ত থাকতেন, অন্যদের ছিদ্রান্বেষণে নয়।
আপনার করণীয় (সালাফদের মানহাজ অনুযায়ী):
১. হিকমাহ বা প্রজ্ঞা: যেহেতু আপনি দেখছেন কমিটির
লোকেরা দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ, আপনি একা সব ঠিক
করতে পারবেন না। বরং দলিল দিয়ে তাদের বিনয়ের সাথে সতর্ক করুন।
২. নিজে দৃষ্টান্ত স্থাপন: তারা যদি পরিষ্কার না করে, আপনি নিজে এগিয়ে আসুন। রাসূল (সা.) মসজিদে ঝাড়ু দিতেন। আপনার
এই কাজ তাদের জন্য মৌন প্রতিবাদের চেয়েও শক্তিশালী হবে।
৩. ইসহাহ বা সংশোধন: যারা দায়িত্ব নিয়ে পালন করছে না, তাদের বারবার ব্যক্তিগতভাবে নসিহত করুন। যদি তাতে কাজ না হয়, তবে তাদের সাথে তর্ক না করে আল্লাহর কাছে সঠিক নেতৃত্বের জন্য দোয়া করুন এবং যারা সত্যিই দ্বীনের বোঝাপড়া রাখে, তাদের নিয়ে একটি শক্তিশালী গ্রুপ গড়ে তুলুন।
১. পদের লোভ করা ও অযোগ্যকে দায়িত্ব দেওয়া সম্পর্কে হাদিস
ইসলামে নেতৃত্ব চাওয়ার পরিবর্তে যোগ্যতার ভিত্তিতে দায়িত্ব
অর্পণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অযোগ্যকে দায়িত্ব দিলে কিয়ামতের অপেক্ষা: হাদিসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যখন অযোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হবে, তখনই ধ্বংস বা কিয়ামত নিশ্চিত।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষা করো। তিনি (রাসূল সা.)-কে জিজ্ঞেস করা হলো, আমানত কীভাবে নষ্ট হবে? তিনি বললেন, যখন কোনো অযোগ্য ব্যক্তির ওপর কাজের দায়িত্ব অর্পণ করা হবে, তখন তোমরা কিয়ামতের অপেক্ষা করো।" (সহীহ বুখারী: ৬৪৯৬)
পদপ্রার্থীকে দায়িত্ব না দেওয়া: যে ব্যক্তি নিজে থেকে পদের লোভ করে, তাকে
দায়িত্ব দিতে রাসূল (সা.) নিষেধ করেছেন।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আবদুর রহমান ইবনে সামুরা (রা.)-কে বলেন: "হে আবদুর রহমান! তুমি নেতৃত্বের (পদের) আবেদন করো না। কারণ, তুমি যদি চাওয়ার মাধ্যমে তা লাভ করো, তবে তোমাকে তার ওপরই ছেড়ে দেওয়া হবে (আল্লাহর সাহায্য পাবে না)। আর যদি না চেয়ে তা পাও, তবে তোমাকে সাহায্য করা হবে।" (সহীহ বুখারী: ৭১৪৬; সহীহ মুসলিম: ১৬৫২)
অযোগ্যতার পরিণাম:
রাসূলুল্লাহ (সা.) আবু যর (রা.)-কে বলেছিলেন: "হে আবু যর! তুমি তো দুর্বল (নেতৃত্বের জন্য), আর এটি (নেতৃত্ব) একটি আমানত। কিয়ামতের দিন এটি লাঞ্ছনা ও অনুশোচনার কারণ হবে। তবে যে ব্যক্তি তা হক অনুযায়ী গ্রহণ করবে এবং তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করবে, সে ছাড়া।" (সহীহ মুসলিম: ১৮২৫)
২. কুরআনের দৃষ্টিভঙ্গি
কুরআনে নেতৃত্বকে 'আমানত'
বা আমানত হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে এবং তা যোগ্য ও বিশ্বস্ত মানুষের
হাতে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আমানত যোগ্যদের প্রদান করা:
"নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দিচ্ছেন যে, তোমরা আমানতসমূহ তার হকদারের কাছে পৌঁছে দাও..." (সূরা আন-নিসা: ৫৮)
যোগ্যতার মাপকাঠি: ইউসুফ (আ.) নিজের যোগ্যতার কথা উল্লেখ করে বলেছিলেন:
"তিনি বললেন, ‘আপনি আমাকে এ ভূমির
ভাণ্ডারগুলোর দায়িত্বে নিযুক্ত করুন; কারণ আমি রক্ষক ও
সুবিজ্ঞ।’" (সূরা ইউসুফ: ৫৫)
শিক্ষণীয়: এখানে ইউসুফ (আ.) পদের লোভ করেননি, বরং পরিস্থিতির প্রয়োজনে নিজের যোগ্যতা ও বিশ্বস্ততার কথা প্রকাশ করেছেন, যা নেতৃত্ব পাওয়ার বৈধ কারণ।
৩. সালাফদের বুঝ ও মূলনীতি (উসূলে দ্বীন)
সালাফে সালেহীন সবসময় নেতৃত্বের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক
ছিলেন। তাদের বুঝ অনুযায়ী, নেতৃত্ব বা পদ অর্জনের ক্ষেত্রে দুটি বিষয়
অপরিহার্য:
১. আল-কুউয়াহ (যোগ্যতা/সামর্থ্য): ওই কাজের জন্য
প্রয়োজনীয় জ্ঞান, কিরাত বা দক্ষতা থাকা।
২. আল-আমানাহ (বিশ্বস্ততা/তাকওয়া): আল্লাহর ভয় এবং
দায়িত্ব পালনে সততা থাকা।
আপনার উল্লেখিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে, যারা হাদিসের গভীর ব্যাখ্যা বা সালাফদের বুঝ না বুঝে কেবল
শাব্দিক অর্থে হুকুম দেয়, তাদের জন্য ইবনে তাইমিয়্যাহ
(রহ.)-এর একটি মূলনীতি প্রণিধানযোগ্য:
"ইসলামী রাষ্ট্রের বা সমাজের কোনো দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি বেশি যোগ্য, তাকে বাদ দিয়ে কম যোগ্য ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া আমানতের খিয়ানত।" (আস-সিয়াসাতুল শারইয়্যাহ)
উপসংহার: আপনি যে অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তা মূলত নেতৃত্বের আমানত নষ্ট হওয়ার কারণেই ঘটছে। আপনার উচিত এই দলিলগুলো ধৈর্যসহকারে তাদের সামনে তুলে ধরা। যদি পরিস্থিতি পরিবর্তন না হয়, তবে নিজের দ্বীনি জ্ঞান ও আমল ঠিক রেখে বৃহত্তর ফিতনা থেকে দূরে থাকাই হবে প্রজ্ঞার পরিচয়। ইসলামের দৃষ্টিতে, মসজিদ বা সমাজের ইমামতি ও দায়িত্বের ক্ষেত্রে 'যোগ্যতা ও ইলম' হলো প্রধান শর্ত, ব্যক্তিগত পছন্দ বা আভিজাত্য নয়।
৪. ইমামতি ও আযান: যোগ্যতার
অবমাননা ও সুন্নাহর লঙ্ঘন
১. ইমামতির ক্ষেত্রে যোগ্যতার
মাপকাঠি
ইমামতি এমন এক দায়িত্ব যার
মাধ্যমে মানুষ সালাতে আল্লাহর সাথে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে। তাই ইমাম
নির্বাচনের ক্ষেত্রে রাসুল (সা.) সুনির্দিষ্ট নীতিমালা দিয়েছেন।
সবচেয়ে বিজ্ঞ ও কুরআন জানা
ব্যক্তি ইমাম হবেন: রাসুল (সা.) বলেছেন:
"মানুষের ইমামতি করবে সে ব্যক্তি, যে
তাদের মধ্যে কুরআন সবচেয়ে বেশি জানে (অর্থাৎ কিরাত ও জ্ঞান)। যদি কিরাতে সবাই সমান
হয়, তবে তাদের মধ্যে যে সুন্নাহ সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি অবগত।
আর যদি সুন্নাহর জ্ঞানেও সবাই সমান হয়, তবে যে সবার আগে
হিজরত করেছে (বা বয়োজ্যেষ্ঠ)।" (সহীহ মুসলিম: ৬৭৩)
সালাফদের বুঝ: ইমাম নববী (রহ.) এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, "এই হাদিস প্রমাণ করে যে, কুরআন ও
সুন্নাহর জ্ঞানে শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিই ইমামতির জন্য অধিক হকদার।" যদি সমাজে এমন
ব্যক্তি থাকেন যিনি সুন্দর কিরাত পারেন এবং দ্বীনি মাসায়েল সম্পর্কে অবগত, তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে ইমাম বানানো সুন্নাহর লঙ্ঘন।
২. আজানের ক্ষেত্রে সুন্নাহর
অনুস্মরণ
আজান হলো ইসলামের প্রতীক। এটি
সুন্দর কণ্ঠে এবং শুদ্ধভাবে দেওয়া ওয়াজিব পর্যায়ের গুরুত্ব রাখে। যে ব্যক্তি
আজানের সুন্নাহ জানে এবং যার কণ্ঠ সুন্দর, তাকে
বাদ দিয়ে অন্যকে দেওয়া অনুচিত।
কণ্ঠস্বর ও দক্ষতার গুরুত্ব: রাসুল (সা.) বেলাল (রা.)-কে আজান দিতে বলেছিলেন কারণ তাঁর
কণ্ঠ ছিল সুমধুর। তিনি আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-কে বলেছিলেন: "তুমি
বেলালকে এটা (আজানের শব্দগুলো) শিখিয়ে দাও, কারণ
তার কণ্ঠস্বর তোমার চেয়ে অধিক সুউচ্চ ও শ্রুতিমধুর।" (সুনানে আবু দাউদ: ৪৯৯)
৩. অযোগ্যকে দায়িত্ব দেওয়ার
ভয়াবহ পরিণতি
আপনার উল্লেখিত পরিস্থিতির
প্রেক্ষিতে, যারা অযোগ্যকে জবরদস্তি বা পছন্দ অনুযায়ী
দায়িত্ব দেয়, তারা মূলত আমানতের খিয়ানত করছে।
আমানতের খিয়ানত: রাসুল (সা.) বলেছেন: "যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কিয়ামতের অপেক্ষা করো। সাহাবীগণ প্রশ্ন করলেন, কীভাবে আমানত নষ্ট হবে? তিনি বললেন: যখন কোনো কাজের
দায়িত্ব এমন ব্যক্তির ওপর অর্পণ করা হবে, যে তার উপযুক্ত
নয়।" (সহীহ বুখারী: ৬৪৯৬)
সালাফদের দৃষ্টিভঙ্গি: উমর (রা.) বলতেন: "যে ব্যক্তি কোনো অযোগ্য ব্যক্তিকে
মুসলিমদের ওপর দায়িত্বশীল নিযুক্ত করে, সে
আল্লাহ, তাঁর রাসুল এবং মুমিনদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করল।"
(আল-আহকামুস সুলতানিয়া, আল-মাওয়ার্দি)
স্পষ্ট ও সুন্দর কণ্ঠে কিরাত পড়ার নির্দেশ: রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বর দিয়ে কুরআনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করো।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৪৬৮; সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ১০১৫ - আলবানী একে সহীহ বলেছেন)
(ইমামের কিরাতের আওয়াজ এমন হওয়া জরুরি যাতে পেছনের
মুক্তাদিরা স্পষ্ট শুনতে পান এবং নামাযে মনোযোগ ধরে রাখতে পারেন। ফিকহের উসূল
অনুযায়ী,
জাহরী বা উচ্চস্বরের নামাযে ইমামের আওয়াজ পেছনের কাতার
পর্যন্ত পৌঁছানো ওয়াজিবের কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ।)
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"লোকদের ইমামতি করবে সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর কিতাব (কুরআন) সবচেয়ে ভালো পড়তে পারে এবং সে
বিষয়ে সবচেয়ে বেশি জ্ঞান রাখে..." । (সহীহ মুসলিম,
হাদিস নং: ৬৭৩)
কণ্ঠ সুন্দর ও কিরাত স্পষ্ট
হওয়ার গুরুত্ব: জাহরী নামাজে
(মাগরিব,
এশা,
ফজর) ইমামের কিরাত মুক্তাদিদের শোনার জন্য আওয়াজ স্পষ্ট
হওয়া জরুরি। রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"তোমরা তোমাদের কণ্ঠস্বর দিয়ে কুরআনকে সৌন্দর্যমণ্ডিত
করো।"
(সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং:
১৪৬৮;
সহীহ ইবনে মাজাহ, হাদিস নং:
১১৫৮)
তাই যিনি ইমামতি করবেন, তার কুরআন শুদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি কিরাত স্পষ্ট এবং
শ্রবণযোগ্য হওয়া উচিত,
যেন পেছনের মানুষ শুনতে পান। আযানের ক্ষেত্রেও রাসুলুল্লাহ ﷺ আবদুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রা.)-কে বলেছিলেন উম্মে মাকতূমের পুত্র বা
বেলালের সাথে আযান দিতে,
কারণ "তার কণ্ঠ তোমার চেয়ে উচ্চ ও সুন্দর।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৯৯)।
আযানের ক্ষেত্রে সুমধুর, উচ্চ ও সহীহ-শুদ্ধ কণ্ঠের গুরুত্ব
আযান হলো ইসলামের অন্যতম একটি বড়
شعائر (নিদর্শন)। রাসুলুল্লাহ ﷺ এবং সালাফে সালেহীন আযানের ক্ষেত্রে সুন্দর কণ্ঠের পাশাপাশি
শব্দের সঠিক ও শুদ্ধ উচ্চারণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। আযানের শব্দে ভুল
উচ্চারণ করা বা মনগড়া টান (ভুল মাদ্দ) দেওয়া সুন্নাহর পরিপন্থী।
আযানের জন্য উচ্চ ও সুন্দর
কণ্ঠের গুরুত্ব: যখন প্রথম আযান চালু হয়, তখন রাসুলুল্লাহ ﷺ আবদুল্লাহ ইবনে
যায়েদ (রা.)-কে বলেছিলেন আযানের বাক্যগুলো বেলাল (রা.)-কে শিখিয়ে দিতে। কারণ
হিসেবে তিনি বলেছিলেন:
"তুমি বেলালের সাথে
দাঁড়াও এবং তাকে আযানের শব্দগুলো শিখিয়ে দাও, সে যেন তা দিয়ে আযান দেয়। কারণ, তার কণ্ঠস্বর তোমার চেয়ে বেশি উচ্চ এবং সুমধুর।" (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ৪৯৯; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ৭০৬)
সালাফদের বুঝ: এই হাদিস প্রমাণ করে, যার কণ্ঠ সুন্দর এবং দূর পর্যন্ত পৌঁছায়, সুমধুর কণ্ঠের মুয়াযযিন থাকা সত্ত্বেও তাকে বাদ দিয়ে অন্য কাউকে আযান দিতে
দেওয়া সুন্নাহর স্পষ্ট খেলাফ।
সুতরাং, সুন্দর কণ্ঠ ও যোগ্যতাকে বাদ দিয়ে যাকে তাকে দায়িত্ব দেওয়া
সুন্নাহর খেলাপ।
যখন ব্যক্তিগত রাগ ও অহংকার
প্রাধান্য পায়: কমিটির ভেতরে
ব্যক্তিগত কারণে ১ বছর ধরে রাগ পুষে রাখা এবং মজলিসে এসে সেই ক্ষোভ উগরে দেওয়া
কোনো প্রকৃত সালাফী বা মুমিনের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না।
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "কোনো মুসলমানের জন্য তার ভাইয়ের সাথে তিন দিনের
বেশি সম্পর্ক ছিন্ন (কথা বন্ধ) করে থাকা বৈধ নয়।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং:
৬০৬৫)
উপসংহার: আসুন, আমরা নিজেদের সংশোধন করি। শুধু ২-৪টি হাদিস মুখস্থ করে বা নিজের যুক্তিকে দলিল বানিয়ে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি না করি। কুরআন ও সহীহ হাদিসকে সাহাবী, তাবেয়ী ও সালাফদের বুঝ অনুযায়ী বোঝার চেষ্টা করি। আমাদের ইলম যেন আমাদের অহংকারী না বানায়, বরং রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ অনুযায়ী আমাদের আরও বেশি বিনয়ী ও চরিত্রবান করে তোলে।



0 Comments