শেখ রবী' ইবনে হাদী আল-মাদখালী (হাফিজাহুল্লাহ)-এর
এই মূল্যবান বাণীগুলোর উপস্থাপন করা হলো:
প্রমোশন ও নসীহত: শেখ রবী' ইবনে হাদী আল-মাদখালী (হাফিজাহুল্লাহ),
১. সালাফিয়্যাহ কিসের মুখাপেক্ষী?
"সালাফিয়্যাহ বা সালাফী দাওয়াতের
প্রয়োজন বিবেকবান মানুষ, প্রয়োজন দয়ালু মানুষ, প্রয়োজন প্রজ্ঞাবান (হাকীম) মানুষ এবং এসবের আগে প্রয়োজন আলেম বা জ্ঞানী
সমাজ। যদি সালাফীদের মাঝে এই বিষয়গুলো না থাকে,
তবে
সালাফিয়্যাহ কোথায় থাকবে? তা তো হারিয়ে যাবে—বারাকাল্লাহু ফীকুম
(আল্লাহ আপনাদের বরকত দান করুন)।"
—
উৎস: আসইলাহ মুহিম্মাহ হাউলার রুকিয়্যাহ
ওয়ার রুকাত
২. দাওয়াত প্রসারের মূল ভিত্তি
"আল্লাহর কসম! সাম্প্রতিক এই যুগে কিংবা
এর পূর্বে সালাফী দাওয়াত প্রসার লাভ করেছে কেবল এমন কিছু আলেমের মাধ্যমে, যারা ছিলেন প্রজ্ঞাবান, সহনশীল এবং যারা রাসুলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মানহাজকে নিজেদের জীবনে ধারণ করতেন ও
সাধ্যানুসারে তা প্রয়োগ করতেন। ফলে আল্লাহ তাঁদের দ্বারা উপকার পৌঁছেছেন এবং
তাঁদের চরিত্র, জ্ঞান ও প্রজ্ঞার বরকতে পৃথিবীর বিভিন্ন
প্রান্তে সালাফী দাওয়াত ছড়িয়ে পড়েছে।
অথচ বর্তমান সময়ে আমরা দেখছি যে,
সালাফী দাওয়াত
পিছিয়ে পড়ছে এবং সংকুচিত হয়ে আসছে—বারাকাল্লাহু ফীকুম। কারণ, তা ওই মনীষীদের প্রজ্ঞা—সর্বপ্রথম রাসুলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া
সাল্লাম)-এর প্রজ্ঞা, তাঁর সহনশীলতা, দয়া, উত্তম চরিত্র, কোমলতা ও নমনীয়তা—হারিয়ে ফেলেছে।"
উৎস/রেফারেন্স: আল-হাছছু 'আলাল মাওয়দ্দাহ ওয়াল ইতিলাফ ওয়াত তাহযীরু মিনাল ফুরকাতি ওয়াল ইখতিলাফ.
৩. কঠোরতা পরিহার ও নরম আচরণের আহ্বান:
"আমি আপনাদের বলছি: আপনারা কোমলতা অবলম্বন
করুন, নমনীয় হন,
পারস্পরিক
ভ্রাতৃত্ব ও দয়া বজায় রাখুন। এখন অবস্থা এমন হয়েছে যে, এই কঠোরতা আহলে সুন্নাহর নিজেদের দিকেই ধাবিত হচ্ছে! তারা বিদআতীদের ছেড়ে
দিয়ে নিজেদের এই ধ্বংসাত্মক কঠোরতার লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে আহলে সুন্নাহকেই। এর
সাথে যুক্ত হয়েছে জুলুম ও মিথ্যা-অবিচারপূর্ণ সিদ্ধান্ত।
সাবধান! আপনারা কখনোই এমন পথ অবলম্বন করবেন না,
যা আপনাকে, সালাফী দাওয়াতকে এবং এর অনুসারীদের ধ্বংস করে দেবে। সর্বাগ্রে দলিল ও
প্রমাণের মাধ্যমে সর্বত্র আল্লাহর দিকে আহ্বান জানান—'আল্লাহ বলেছেন, তাঁর রাসুল বলেছেন'। এরপর (আল্লাহর পর) হেদায়েতের এমন ইমামদের বাণীর সহযোগিতা নিন, যাঁদের ইমামত ও মর্যাদাকে আহলে সুন্নাহ এবং বিদআতী সকলেই একবাক্যে স্বীকার
করে।"
- উৎস/রেফারেন্স: আল-হাছছু 'আলাল মাওয়দ্দাহ ওয়াল ইতিলাফ ওয়াত তাহযীরু মিনাল ফুরকাতি ওয়াল ইখতিলাফ
৪. ভুলকারীর সাথে আচরণ
"আমি ভাইদের উদ্দেশে বলছি: আমাদের মধ্য
থেকে কেউ যদি ঘাটতি করে বা ভুল করে,
তবে আমরা তাকে
বরখাস্ত বা ধ্বংস করে দেব না—বারাকাল্লাহু ফীকুম। বরং কোমলতা ও প্রজ্ঞার সাথে তার
চিকিৎসা করব, তার প্রতি ভালোবাসা ও সৌহার্দ্য প্রদর্শন
করব, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। যদি তার মধ্যে
কিছু দুর্বলতা থেকেও যায়, তবে আমরা তার ব্যাপারে তাড়াহুড়ো করব না।
তা না হলে—আল্লাহর কসম—কেউই অবশিষ্ট থাকবে না,
কেউই না!"
"আপনারা তাদের (বিভ্রান্তিকর পথ) সম্পর্কে
সম্পূর্ণ সতর্ক থাকুন এবং নিজেদের মধ্যে সীসাঢালা প্রাচীরের মতো ঐক্যবদ্ধ ও
ভ্রাতৃত্বপূর্ণ থাকুন। আমি জানি আপনারা নিষ্পাপ নন,
এমনকি আলেমরাও
নিষ্পাপ নন; আমাদের ভুল হতে পারে। তবে কেউ যদি রাফেজী
(শিয়া), মু'তাযিলা, জাহমিয়া কিংবা বিদ্যমান কোনো দলীয় কোন্দলে (হিযবিয়্যাহ) জড়িয়ে পড়ে, সেটা ভিন্ন কথা। কিন্তু যে সালাফী—সে সালাফীদের ভালোবাসে, সালাফী মানহাজকে পছন্দ করে, দলীয় দলাদলি ও
বিদআত এবং বিদআতীদের ঘৃণা করে—তারপরও কিছু বিষয়ে দুর্বলতা দেখায়, তবে আমরা তার সাথে নম্র আচরণ করব,
তাকে ছুঁড়ে
ফেলব না। আমরা তাকে উপদেশ দেব, তাকে উদ্ধার করব, তার ওপর ধৈর্য ধরব এবং তার সংশোধনের ব্যবস্থা করব—বারাকাল্লাহু ফীকুম। কিন্তু 'যে ভুল করবে সে-ই ধ্বংস'—এ নীতি চললে কেউ
বাকি থাকবে না।"
উৎস/রেফারেন্স: আল-হাছছু 'আলাল মাওয়দ্দাহ ওয়াল ইতিলাফ ওয়াত তাহযীরু মিনাল فুরকাতি ওয়াল ইখতিলাফ.
৫. মতভেদ দূরীকরণ ও দ্বীনের সুরক্ষার
আকুল আবেদন
"আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন আপনাদের অন্তরের মাঝে প্রীতি সৃষ্টি করে দেন, সত্যের ওপর আপনাদের একত্রিত করেন এবং শয়তানের চক্রান্তকে আপনাদের থেকে দূর
করে দেন। আপনারা প্রচেষ্টা চালান—কেবল দোয়ার অপেক্ষায় থাকবেন না, নিজেরাই মাধ্যমগুলো গ্রহণ করুন। আল্লাহর কসম! মতভেদ ও বিভেদের মূল উৎপাটন করতে
আপনারা উদ্যোগ নিন। আল্লাহ আপনাদের তাওফীক দিন,
আপনাদের কদম
সুদৃঢ় করুন।
দেখুন, আল্লাহর কসম! শত্রুরা আজ আনন্দিত।
আল্লাহর কসম! সালাফী দাওয়াত থমকে গেছে;
হে ভাইয়েরা, এটি আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে। সুতরাং নিজেদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন, এই দাওয়াতের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করুন এবং যেসব মাধ্যম এই বাতিল ও ফেতনাকে
মুছে দেয়, তা গ্রহণ করুন—বারাকাল্লাহু ফীকুম।"
— উৎস: আল-হাছছু 'আলাল মাওয়দ্দাহ ওয়াল ইতিলাফ ওয়াত তাহযীরু মিনাল ফুরকাতি ওয়াল ইখতিলাফ
৬. সুন্নাহর অনুসারীদের ঐক্য ও আখলাক:
"আপনাদের কর্তব্য হলো পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব
বজায় রাখা, ঐক্যবদ্ধ থাকা, সৎকাজে একে অপরকে সহযোগিতা করা এবং বিভেদ ও বিভেদের সমস্ত কারণ থেকে দূরে
থাকা। সালাফী দাওয়াত যে পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, তা সহনশীলতা দাবি করে। যেসব বিষয় মতভেদ ও বিভেদ সৃষ্টি করে, তা থেকে দূরে থাকুন। কিছু মানুষ বিভেদের কারণগুলো উস্কে দেয় এবং ফেতনা সৃষ্টি
করে সালাফীদের চূর্ণ-বিচূর্ণ করে ফেলে। এটি সঠিক মানহাজ নয়, সালাফী মানহাজও নয়, আর সাহাবা বা তাবেঈনদের পথও নয়।
কিছু মানুষ এমন কারণ খুঁজে বেড়ায় যা বিভাজন ও টুকরো টুকরো করে। এরা আল্লাহর
দ্বীনের ওপর আমানতদার নয় এবং তাদের সালাফিয়্যাহর দাবিতেও তারা সত্যবাদী নয়।
তাদের মুখোশ উন্মোচন করা উচিত। কেন তুমি বিভেদের পথ ধরছ? কেন সালাফীদের বিভক্ত করছ?
যে ভুল করবে, তাকে প্রজ্ঞা, কোমলতা ও নমনীয়তার সাথে উপদেশ দিতে হবে:
'কোমলতা যে জিনিসেই থাকে, তা তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে; আর যা থেকে তা ছিনিয়ে নেওয়া হয়, তা তাকে ত্রুটিযুক্ত করে। লজ্জা যার মধ্যেই থাকে, তা তাকে সুন্দর করে।'
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সহধর্মিণী আয়িশাহ (রাযিঃ) থেকে
বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি
ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ হে আয়িশাহ্! আল্লাহ তা’আলা নম্র ব্যবহারকারী। তিনি নম্রতা
পছন্দ করেন। তিনি নম্রতার দরুন এমন কিছু দান করেন যা কঠোরতার দরুন দান করেন না; আর অন্য কোন কিছুর দরুনও তা দান করেন না।
রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম (হাদিস নং: ২৫৯৪) , ৬৪৯৫-(৭৭/২৫৯৩) (ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৩৬৫, ইসলামিক সেন্টার
৬৪১৫), জামে
আত-তিরমিযী (হাদিস নং: ১৯৭৪),
আপনাদের উচিত ধৈর্য, সহনশীলতা, সত্যবাদিতা এবং সত্যের ওপর অবিচলতার মতো উচ্চ নৈতিক গুণাবলী অর্জন করা—বারাকাল্লাহু ফীকুম।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
(অর্থ: অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে
রয়েছে উত্তম আদর্শ তাদের জন্য যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক
স্মরণ করে।
সূরাঃ ৩৩/ আল-আহযাব
এবং আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে আরও বলেন:
(অর্থ: এবং নিশ্চয়ই আপনি মহান চরিত্রের ওপর অধিষ্ঠিত।)"
রেফারেন্স: সূরা আল-কলম (৬৮:০৪)
·
পৃষ্ঠা/মাকতাবাহ রেফারেন্স: এটি পরবর্তীতে শেখের গ্রন্থাবলী সংকলন 'মাজমু'
কুতুব ও
রাসায়িল ও ফাতাওয়া শেখ রবী'
ইবনে হাদী
আল-মাদখালী' এর ১৫তম খণ্ডে.



0 Comments