কিতাবুয যাকাত
كتاب الزكاة
কিতাবুয যাকাত প্রশ্ন উত্তর
জবাব জানতে প্রশ্নের উপর ক্লিক করুন
নং
|
যাকাত বিষয়ক মাসলা- মাসায়েল
|
كتاب الزكاة
উত্তরঃ যাকাত ফরদ্ব হওয়ার শর্তাবলী নিুরূপঃ
ক) ইসলাম
খ) স্বাধীন
গ) নেসাবের মালিক
হওয়া ও তা স্থিতিশীল থাকা।
ঘ) বছর পূর্ণ হওয়া।
ইসলামঃ কাফেরের উপর যাকাত ফরদ্ব নয়। যাকাতের নামে
সে প্রদান করলেও আল্লাহতা কবূল করবেন না। আল্লাহ বলেনঃ
]وَمَا مَنَعَهُمْ أَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ وَلَا يَأْتُونَ الصَّلَاةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالَى وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُونَ[
“তাদের সম্পদ ব্যয় শুধু মাত্র এই কারণে গ্রহণ করা হবে না
যে, তারা আল্লাহও তার রাসূলের সাথে কুফরী করেছে।
অলসভঙ্গিতে ছাড়া তারা স্বলাতে আসে না। এবং মনের অসন'ষ্টি নিয়ে
খরচ করে।” (সূরা তওবাঃ ৫৪) কাফেরের উপর যাকাত ফরদ্ব নয় এবং আদায় করলেও গ্রহণ
করা হবে না একথার অর্থ এটা নয় যে, পরকালেও তাকে ক্ষমা করে দেয়া
হবে; বরং তাকে এজন্য শাস্তি দেয়া হবে। আল্লাহবলেন,
]كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ، إِلَّا أَصْحَابَ الْيَمِينِ، فِي جَنَّاتٍ يَتَسَاءَلُونَ، عَنْ الْمُجْرِمِينَ، مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ، قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ، وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ، وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ، وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ، حَتَّى أَتَانَا الْيَقِينُ[
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী; কিন্তু ডান দিকস্তরা। তারা থাকবে জান্নাতে এবং পরস্পরে জিজ্ঞাসাবাদ
করবে অপরাধীদের সম্পর্কে। বলবে, তোমাদেরকে কিসে
জাহান্নামে প্রবেশ করিয়েছে? তারা বলবে, আমরা স্বলাত পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহার্য দিতাম না।
আমরা সমালোচকদের সাথে সমালোচনা করতাম। এবং আমরা প্রতিফল দিবসকে অস্বীকার করতাম।
এমনকি আমাদের মৃত্যু এসে গেছে।” (সূরা মুদ্দাস্সিরঃ ৩৮-৪৭) এথেকে বুঝা যায়
ইসলামের বিধি-বিধান না মেনে চলার কারণে কাফেরদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।
স্বাধীনতাঃ ক্রীতদাসের কোন সম্পদ নেই। কোন সম্পদ
থাকলেও তা তার মালিকের সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। কেননা নবী (ﷺ) বলেন,مَنِ ابْتَاعَ عَبْدًا فَمَالُهُ لِلَّذِي بَاعَهُ إِلَّا أَنْ يَشْتَرِطَ الْمُبْتَاع “সম্পদের অধিকারী কোন ক্রীতদাস
যদি কেউ বিক্রয় করে, তবে উক্ত সম্পদের মালিকানা বিক্রেতার
থাকবে। কিন্তু যদি ক্রেতা উক্ত সম্পদের শর্তারোপ করে থাকে তবে ভিন্ন কথা।”
নেসাবের মালিক হওয়াঃ অর্থাৎ তার কাছে এমন পরিমাণ
সম্পদ থাকবে, শরীয়ত যা নেসাব হিসেবে
নির্ধারণ করেছে। সম্পদের প্রকারভেদ অনুযায়ী এর পরিমাণ বিভিন্ন্নরূপ হয়ে থাকে। অতএব
মানুষের কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে বা নেসাবের কম সম্পদ থাকলে তাতে যাকাত
দিতে হবে না। কেননা তার সম্পদ কম। আর অল্প সম্পদ দ্বারা অন্যের কল্যাণ করা সম্ভব
নয়।
চতুস্পদ জন্তুর নেসাবে শুরু এবং শেষ সংখ্যার খেয়াল
রাখতে হবে। কিন্তু অন্যান্য সম্পদে শুধু প্রথমে কত ছিল তার হিসাব ধর্তব্য। পরে যা
অতিরিক্ত হবে তার হিসাব করে যাকাত দিতে হবে।
বছর অতিক্রান্ত হওয়াঃ কেননা বছর পূর্ণ না হওয়া
সত্বেও যাকাতের আবশ্যকতা সম্পদশালীর প্রতি কঠোরতা করা হয়। বছর পূর্তি হওয়ার পরও
যাকাত বের না করলে যাকাতের হকদারদের প্রতি অবিচার করা হয়; তাদের ক্ষতি করা হয়। একারণে প্রজ্ঞাপূর্ণ শরীয়ত এর জন্য একটি সীমারেখা
নির্ধারণ করেছে এবং এর মধ্যে যাকাতের আবশ্যকতা নির্ধারণ করেছে। আর তা হচ্ছে বছর
পূর্তী। অতএব এর মধ্যে সম্পদশালী ও যাকাতের হকদারদের মধ্যে একটি সামঞ্জস্যতা বিধান
করা হয়েছে।
এ কারণে বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কোন মানুষ যদি
মৃত্যু বরণ করে বা তার সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে
যাকাত রহিত হয়ে যাবে। অবশ্য তিনটি জিনিস এ বিধানের ব্যতিক্রমঃ ১) ব্যবসার লভ্যাংশ ২) চতুস্পদ জন্তুর
বাচ্চা ৩) উশর।
ব্যবসার লভ্যাংশে ব্যবসার মূল সম্পদের সাথে যোগ
করে যাকাত দিতে হবে। আর চতুস্পদ জন্তুর ভুমিষ্ট বাচ্চার যাকাত তার মায়ের সাথে
মিলিত করে দিতে হবে। আর উশর অর্থাৎ যমীনে উৎপাদিত ফসল ঘরে উঠালেই যাকাত দিতে হবে।
উত্তরঃ এক্ষেত্রে সুন্দর পন্থা হচ্ছে, প্রথম বেতনের যদি এক বছর পূর্তী হয়; তবে তার
সাথে সংশ্লিষ্ট করে সবগুলোর যাকাত আদায় করে দিবে। যে বেতনে বছর পূর্ণ হয়েছে তার
যাকাত সময়ের মধ্যেই আদায় করা হল। আর যাতে বছর পূর্ণ হয়নি তার যাকাত অগ্রীম আদায়
হয়ে গেল। প্রতিমাসের বেতন আলাদা হিসাব রাখার চাইতে এটাই হচ্ছে সহজ পন্থা। কিন্তু
দ্বিতীয় মাসের বেতন আসার আগেই যদি প্রথম মাসের বেতন খরচ হয়ে যায়, তবে তার উপর কোন যাকাত নেই। কেননা যাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্ত হচ্ছে বছর
পূর্ণ হওয়া।
উত্তরঃ বিষয়টি বিদ্বানদের মধ্যে মতবিরোধপূর্ণ। কেউ বলেন, নাবালেগ ও পাগলের সম্পদে যাকাত ওয়াজিব নয়। কেননা এরা তো শরীয়তের
বিধি-নিষেধ মেনে চলার বাধ্যবাধকতার বাইরে। অতএব তাদের সম্পদে যাকাত আবশ্যক হবে না।
কোন কোন বিদ্বান বলেন, বরং তাদের সম্পদে যাকাত আবশ্যক হবে। আর এটাই বিশুদ্ধ মত। কেননা যাকাত
সম্পদের অধিকার। মালিক কে তা দেখার বিষয় নয়। আল্লাহবলেন, خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً “তাদের সম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ
করুন।” (সূরা তাওবাঃ ১০৩) এখানে আবশ্যকতার নির্দেশ সম্পদে করা হয়েছে। তাছাড়া
মুআ’য বিন জাবাল hকে নবী (ﷺ) ইয়ামান প্রেরণ করে বলেছিলেন,
أَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ
“তাদেরকে জানিয়ে দিবে আল্লাহতাদের সম্পদে যাকাত ফরদ্ব
করেছেন। ধনীদের থেকে যাকাত গ্রহণ করে তাদের মধ্যে অভাবীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।”
অতএব এ ভিত্তিতে নাবালেগ ও পাগলের সম্পদে যাকাত আবশ্যক হবে। তাদের অভিভাবক এ যাকাত
বের করার দায়িত্ব পালন করবেন।
উত্তরঃ সম্পদ যদি ঋণ হিসেবে অন্যের কাছে থাকে, তবে ফিরিয়ে না পাওয়া পর্যন্ত তাতে যাকাত আবশ্যক নয়। কেননা উহা তার হাতে
নেই। কিন্তু ঋনগ্রস্ত ব্যক্তি যদি সম্পদশালী লোক হয়, তবে
প্রতি বছর তাকে (ঋণ দাতাকে) যাকাত বের করতে হবে। নিজের অন্যান্য সম্পদের সাথে তার
যাকাত আদায় করে দিলে যিম্মামুক্ত হয়ে যাবে। অন্যথা উহা ফেরত পাওয়ার পর হিসেব করে
বিগত প্রত্যেক বছরের যাকাত আদায় করতে হবে। কেননা উহা সম্পদশালী লোকের হাতে ছিল। আর
তা তলব করাও সম্ভব ছিল। সুতরাং ঋণদাতার ইচ্ছাতেই চাইতে দেরী করা হয়েছে।
কিন্তু ঋণ যদি অভাবী লোকের হাতে থাকে। অথবা এমন
ধনী লোকের হাতে যার নিকট থেকে উদ্ধার করা কষ্টকর, তবে তার উপর প্রতি বছর যাকাত আবশ্যক হবে না। কেননা উহা হাতে পাওয়া তার
জন্য অসম্ভব। কেননা আল্লাহবলেনঃ
]وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ[
“যদি অভাবী হয় তবে তাকে সচ্ছলতা পর্যন্ত অবকাশ দিবে।” (সূরা
বাক্বারাঃ ২৮০) অতএব তার জন্য সম্ভব নয় এসম্পদ পূণরুদ্ধার করা এবং তা দ্বারা উপকৃত হওয়া।
কিন্তু পূণরুদ্ধার করতে পারলে বিদ্বানদের মধ্যে কেউ বলেন, তখন থেকে নতুন করে বছর গণনা শুরু করবে। আবার কেউ বলেন, বিগত এক বছরের যাকাত বের করবে। এবং পরবর্তী বছর আসলে আবার যাকাত আদায়
করবে। এটাই অত্যধিক সতর্ক অভিমত।
উত্তরঃ ইবনু আবদুল বার্ও আবু উবাইদা বলেন, বিদ্বানদের এজমা বা ঐকমত্য হচ্ছে, কোন সম্পদ
রেখে যায়নি এমন অভাবী ঋণগ্রস্ত মৃত ব্যক্তির ঋণ যাকাত দ্বারা পরিশোধ করা যাবে না।
কিন্তু আসলে বিষয়টি মতবিরোধপূর্ণ। অবশ্য অধিকাংশ আলেম বলে থাকেন, যাকাত দ্বারা মৃতের ঋণ পরিশোধ করা যাবে না। কেননা মৃত ব্যক্তি তো
আখেরাতে পাড়ি জমিয়েছে। ঋণের কারণে জীবিত ব্যক্তি যে ধরণের লাঞ্ছনা ও অবমাননার
স্বীকার হয় মৃত ব্যক্তি এরূপ হয় না। তাছাড়া নবী (ﷺ) মৃতের ঋণ যাকাত থেকে আদায় করতেন না; বরং
গনীমতের সম্পদ থেকে উক্ত ঋণ পরিশোধ করতেন। এথেকে বুঝা যায় যাকাত থেকে মৃতের ঋণ
পরিশোধ করা বিশুদ্ধ নয়।
বলা হয়, মৃত
ব্যক্তি যদি পরিশোধ করার নিয়ত রেখে ঋণ করে থাকে, তবে
আল্লাহতাঁর দয়া ও অনুগ্রহে তার পক্ষ থেকে তা আদায় করে দিবেন। কিন্তু গ্রহণ করার
সময় পরিশোধের নিয়ত না থাকলে, অপরাধী হিসেবে তার জিম্মায়
উহা অবশিষ্ট থাকবে এবং ক্বিয়ামত দিবসে তা পরিশোধ করবে। আমার মতে এই মতটিই অধিক
পছন্দনীয় যাকাত থেকে তার ঋণ পরিশোধ করার মতের চেয়ে।
এমনও বলা হয়, প্রয়োজনীয়তার
দিকে লক্ষ্য রেখে জীবিত ও মৃতের মধ্যে পার্থক্য করতে হবে। জীবিত লোকদের অভাব,
ঋণ, জিহাদ প্রভৃতি ক্ষেত্রে যদি যাকাতের
অধিক প্রয়োজনীয়তা থাকে, তবে তাদের বিষয়টি অগ্রগণ্য। কিন্তু
তাদের এধরণের কোন প্রয়োজনীয়তা না থাকলে, সহায়-সম্বলহীন
মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া ঋণ যাকাত দ্বারা পরিশোধ করতে কোন অসুবিধা নেই। সম্ভবতঃ
এটি মধ্যমপন্থী মত।
প্রশ্নঃ (৩৫৯)
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির সাদকা করা কি ঠিক হবে? ঋণগ্রস্ত
ব্যক্তি কোন ধরণের শরীয়তের দাবী থেকে মুক্তি পাবে?
উত্তরঃ শরীয়ত নির্দেশিত একটি খরচ হচ্ছে দান সাদকা। সাদকা
জায়গা মত দেয়া হলে তা হবে আল্লাহর বান্দাদের উপর অনুগ্রহ। সাদকাকারী ছওয়াব পাবে, ক্বিয়ামত দিবসে ছাদকার ছায়ার নীচে অবস্থান করবে। সাদকা কবূল হওয়ার শর্ত
পূর্ণ করে যাকেই দান করা হোক তার দান গ্রহণ করা হবে। চাই দানকারী ঋণগ্রস্ত হোক বা
না হোক। ইখলাছ বা একনিষ্ঠতার সাথে, হালাল উপার্জন থেকে
জায়গামত দান করলেই শরীয়তের দলীল অনুযায়ী তার দান কবূল হবে। দানকারী ঋণমুক্ত হতে
হবে এমন কোন শর্ত নেই। কিন্তু কোন ব্যক্তি যদি এমন ঋণে ডুবে থাকে যা পরিশোধ করার
জন্য তার সমস্ত সম্পত্তি দরকার, তবে এটা কোন যুক্তি সংগত
ও বিবেক সম্মত কথা নয় যে, জরুরী ও আবশ্যক ঋণ পরিশোধ না
করে সে নফল দান সাদকা করবে! অতএব তার উপর আবশ্যক হচ্ছে, প্রথমে
ফরদ্ব কাজ করা তারপর নফল কাজ করা। তারপরও ঐ অবস্থায় দান করলে তার ব্যাপারে আলেমগণ
মতভেদ করেছেন। কেউ বলেন, এরূপ করা জায়েয নয়। কেননা এতে
পাওনাদারের ক্ষতি করা হয় এবং নিজের জিম্মায় আবশ্যিক ঋণের বোঝা বহন করে রাখা হয়।
আবার কেউ বলেনঃ দান করা জায়েয আছে কিন্তু উত্তমতার বিপরীত।
মোটকথা, যে
ব্যক্তির আপাদমস্তক ঋণে জর্জরিত আর পরিশোধ করার জন্য নিজের সমস্ত সম্পত্তি দরকার,
তার পক্ষে দান সাদকা করা উচিত নয়। কেননা নফল কাজের চাইতে ওয়াজিব
কাজের গুরুত্ব বেশী এবং তা অগ্রগণ্য।
আর ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি ঋণ মুক্ত হওয়া পর্যন্ত
কোন্ধরণের শরীয়তের দাবী থেকে মুক্তি পাবে?
তার মধ্যে একটি হচ্ছে হজ্জ। ঋণ পরিশোধ করা পর্যন্ত
ঋণগ্রস্ত ব্যক্তির উপর হজ্জের দায়িত্ব নেই বা হজ্জ ফরদ্ব নয়।
কিন্তু যাকাতের ব্যাপারে বিদ্বানগণ মতভেদ করেছেন।
ঋণগ্রসে-র উপর থেকে যাকাতের আবশ্যকতা রহিত হবে কি হবে না?
একদল আলেম বলেছেন, ঋণ পরিমাণ সম্পদে যাকাতের আবশ্যকতা রহিত হবে। চাই উক্ত সম্পদ প্রকাশ্য
হোক বা অপ্রকাশ্য।
আরেক দল আলেম বলেন, তার উপর কোন সময় যাকাতের আবশ্যকতা রহিত হবে না। হাতে যে সম্পদই থাক না
কেন হিসেব করে তার যাকাত বের করতে হবে। যদিও তার উপর এমন ঋণ থাকে যা পরিশোধ করে
দিলে অবশিষ্ট সম্পদ নেসাব পরিমাণ হয় না।
অন্যদল আলেম বলেন, বিষয়টি ব্যাখ্যা সাপেক্ষ। তার সম্পদ যদি অপ্রকাশ্য ধরণের হয় যা প্রত্যক্ষ
নয় গোপন থাকে, যেমন্ত টাকা-পয়সা এবং ব্যবসায়িক পণ্য,
তবে তাতে ঋণ পরিমাণ সম্পদে যাকাত রহিত হবে। আর সম্পদ যদি
প্রকাশ্য ধরণের হয়, যেমন্ত পশু, যমীন
থেকে উৎপাদিত ফসল ইত্যাদি, তবে তাতে যাকাত রহিত হবে না।
আমার মতে বিশুদ্ধ কথা হচ্ছেঃ কোন সময়ই যাকাত রহিত
হবে না। চাই সম্পদ প্রকাশ্য হোক বা অপ্রকাশ্য। তার হাতে যে সম্পদ আছে তা যদি
যাকাতের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং নেসাব পরিমাণ হয়, তবে তার
যাকাত দিতে হবে। যদিও তার উপর ঋণ থাকে। কেননা যাকাত হচ্ছে সম্পদের অধিকার।
আল্লাহতা’আলা এরশাদ করেন,
]خُذْ مِنْ أَمْوَالِهِمْ صَدَقَةً تُطَهِّرُهُمْ وَتُزَكِّيهِمْ بِهَا وَصَلِّ عَلَيْهِمْ إِنَّ صَلَاتَكَ سَكَنٌ لَهُمْ وَاللَّهُ سَمِيعٌ عَلِيمٌ[
“(হে নবী ) আপনি তাদের ধন্তসম্পদ থেকে যাকাত গ্রহণ করুন,
যা দ্বারা আপনি তাদেরকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন, আর তাদের জন্য দু’আ করুন। নিঃসন্দেহে আপনার দু’আ হচ্ছে তাদের জন্য
শান্তির কারণ। আর আল্লাহখুব শোনেন, খুব জানেন।” (সূরা
তাওবা- ১০৩) তাছাড়া মুআ’য বিন জাবাল hকে নবী (ﷺ) ইয়ামান প্রেরণ করে বলেছিলেন,
أَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ
“তাদেরকে জানিয়ে দিবে আল্লাহতাদের সম্পদে যাকাত ফরদ্ব
করেছেন। ধনীদের থেকে যাকাত গ্রহণ করে তাদের মধ্যে অভাবীদের মাঝে বিতরণ করা হবে।”
কুরাআন্তসুন্নাহ্র এই দলীলের ভিত্তিতে বিষয় দু’টি আলাদা হয়ে গেল। অতএব যাকাত ও
ঋণের মাঝে কোন দ্বন্দ থাকল না। কেননা ঋণ হচ্ছে ব্যক্তির যিম্মায় আবশ্যক। আর যাকাত
সম্পদে আবশ্যক। প্রত্যেকটি বিষয় তার নির্দিষ্ট স্থানে আবশ্যক হবে। কেউ কারো
স্তলাভিষিক্ত হবে না। অতএব ঋণ ব্যক্তির যিম্মায় বাকী থাকবে। আর সময় হলে শর্ত পূর্ণ
হলে অবশ্যই যাকাত বের করে দিবে।
উত্তরঃ যাকাত আদায়ে বিলম্ব করার কারণে এ লোক গুনাহ্গার।
কেননা মানুষের উপর ওয়াজিব হচ্ছে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে যাকাত
আদায় করে দেয়া। আবশ্যিক বিষয়ের মূল হচ্ছে, সময়
হওয়ার সাথে সাথে দেরী না করে তা সম্পাদন করে ফেলা। এ লোকের উচিত আল্লাহর কাছে
ক্ষমা প্রার্থনা করা, তওবা করা। তার উপর আবশ্যক হচ্ছে
বছরগুলোর হিসেব করে যাকাত আদায় করে দেয়া। উক্ত যাকাতের কোন কিছুই তার থেকে রহিত
হবে না। তাকে তওবা করতে হবে এবং দ্রুত যাকাত আদায় করে দিতে হবে। যাতে করে দেরী
করার কারণে গুনাহ্আরো বাড়তে না থাকে।
উত্তরঃ যে পশু বছরের পূর্ণ অর্ধেক সময় চারণ ভূমিতে চরে
খায় তাতে যাকাত দিতে হবে না। কেননা পশু সায়েমা না হলে তাতে যাকাত ওয়াজিব হয় না।
সায়েমা সেই পশুকে বলা হয়, যা বছরের পূর্ণ সময় বা বছরের
অধিকাংশ সময় মাঠে-ঘাটে চরে বেড়ায় ও তৃণ-লতা খেয়ে বড় হয়। কিন্তু বছরের কিছু সময় বা
অর্ধেক সময় চরে খেলে তাতে যাকাত আবশ্যক নয়। অবশ্য যদি উহা ব্যবসার জন্য হয়ে থাকে,
তখন তার বিধান ভিন্ন। ব্যবসায়িক পণ্য হিসেবে যাকাত বের করতে হবে।
বছর পূর্ণ হলে মূল্য নির্ধারণ করে ২.৫% (আড়াই শতাংশ) হারে যাকাত বের করবে।
বাড়ী-ঘরের আশেপাশে ফলদার বৃক্ষের ফলের যাকাত।
প্রশ্নঃ (৩৬২) তিন বছর আগে আমি বাড়ী ক্রয় করেছি।
(আল্হামদু লিল্লাহ্) বাড়ীর সীমানার মধ্যে তিনটি খেজুর গাছ আছে। প্রত্যেক গাছে
প্রচুর পরিমাণে খেজুর পাওয়া যায়। এ খেজুরে কি যাকাত দিতে হবে? যাকাত দেয়া ওয়াজিব হয়ে থাকলে তো এ সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই অজ্ঞ। এখন
আমার প্রশ্ন হচ্ছেঃ ১) খেজুরগুলো নেসাব পরিমাণ হল কি না তা জানার উপায় কি? আমি তো বিভিন্ন সময় খেজুর পেড়ে থাকি? ২)
কিভাবে যাকাতের পরিমাণ নির্ধারণ করতে হবে? প্রত্যেক প্রকার
খেজুরের যাকাত কি আলাদাভাবে বের করতে হবে? নাকি সবগুলো
একত্রিত করে যে কোন এক প্রকার থেকে যাকাত দিলেই চলবে? ৩)
খেজুর থেকে যাকাত না দিয়ে এর বিনিময় মূল্য দিলে চলবে কি? ৪)
বিগত বছরগুলোতে তো যাকাত বের করিনি। এখন আমি কি করব?
উত্তরঃ বাড়ির আশে পাশে খেজুর গাছে প্রাপ্ত খেজুর থেকে যে
যাকাত আবশ্যক হতে পারে এ ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষ জ্ঞান রাখে না প্রশ্নকারীর একথা
সত্য ও সঠিক। কারো বাড়িতে সাতটি কারো দশটি কারো কম বা বেশী সংখ্যার গাছ থাকে।
এগুলোর ফল নেসাব পরিমাণও হয়ে যায়। কিন্তু অধিকাংশ লোক জানে না যে এতেও যাকাত দিতে হবে।
তাদের ধারণা যে, বাগানের খেজুরেই শুধু যাকাত
দেয়া লাগবে। অথচ খেজুর বৃক্ষ বাগানে হোক বা বাড়ীতে হোক, উৎপাদিত
ফসল নেসাব পরিমাণ হলেই তাতে যাকাত দিতে হবে। এই ভিত্তিতে অভিজ্ঞতা সম্পন্ন একজন
মানুষ অনুমান করবে, এ গাছগুলোতে যাকাতের নেসাব পরিমাণ
খেজুর আছে কি না? যদি নেসাব পরিমাণ হয় তবে কিভাবে যাকাত
দিবে সে তো বিভিন্ন্ন সময় ফল পেড়ে খেয়ে থাকে?
আমি মনে করি, এ
অবস্থায় খেজুরের মূল্য নির্ধারণ করবে এবং পূর্ণ মূল্যের এক বিশমাংশ যাকাত হিসেবে
বের করবে। কেননা এ পদ্ধতি মালিকের জন্য যেমন সহজ তেমনি অভাবীদের জন্যও উপকারী। এতে
যাকতের পরিমাণ হবে ৫% (শতকরা পাঁচ) টাকা। কেননা ইহা হচ্ছে ফসলের যাকাত ব্যবসায়িক
পণ্যের যাকাত নয়। কিন্তু অন্যান্য সম্পদ যদি হয় যেমন্ত স্বর্ণ-রৌপ্য, টাকা-পয়সা, তবে তাতে যাকাতের পরিমাণ হচ্ছে
২.৫% (শতকরা আড়াই) টাকা।
আর অজ্ঞতা বশতঃ বিগত যে কয় বছরের যাকাত আদায় করেনি, তার জন্য অনুমান করে সর্বমোট একটা পরিমাণ নির্ধারণ করবে, তারপর তার যাকাত এখনই আদায় করে দিবে। আর যাকাত আদায় করতে এই দেরীর
কারণে তার কোন গুনাহ্হবে না। কেননা সে ছিল অজ্ঞ। কিন্তু বিগত বছরগুলোর যাকাত
অবশ্যই আদায় করতে হবে।
উত্তরঃ স্বর্ণের নেছাব হচ্ছে বিশ মিসক্বাল তথা ৮৫ পঁচাশি
গ্রাম।
আর রৌপ্যের নেছাব হচ্ছে ১৪০ (একশ চল্লিশ) মিসক্বাল
তথা সৌদী আরবের রৌপ্যের দিরহাম অনুযায়ী ৫৬ রিয়াল। অর্থাৎ ৫৯৫ গ্রাম।
আর কিলোগ্রাম হিসেবে নবী (ﷺ) এর ছা’ এর পরিমাণ হচ্ছে, দু’কিলো চল্লিশ গ্রাম (২.৪০
কেজি) পাকা পুষ্ট গম।
প্রশ্নঃ (৩৬৪) মেয়েদেরকে দেয়া স্বর্ণ একত্রিত করলে
নেসাব পরিমাণ হয়। একত্রিত না করলে নেসাব হয় না। এ অবস্থায় করণীয় কি?
উত্তরঃ কোন মানুষ যদি গয়নাগুলো তার মেয়েদেরকে ধার স্বরূপ
শুধুমাত্র পরিধান করার জন্য দিয়ে থাকে, তবে সেই
তার মালিক। সবগুলো একত্রিত করে যদি নেসাব পরিমাণ হয় তবে যাকাত প্রদান করবে। কিন্তু
যদি তাদেরকে সেগুলো দান স্বরূপ প্রদান করে থাকে অর্থাৎ মেয়েরাই সেগুলোর মালিক,
তবে গয়নাগুলো একত্রিত করা আবশ্যক নয়। কেননা প্রত্যেকেই আলাদাভাবে
স্বর্ণগুলোর মালিক। অতএব তাদের একজনের স্বর্ণ যদি নেসাব পরিমাণ হয়, তবেই যাকাত প্রদান করবে। অন্যথায় নয়।
প্রশ্নঃ (৩৬৫) নিজের প্রদত্ব যাকাত থেকে গ্রহীতা
যদি উপহার স্বরূপ কিছু প্রদান করে, উহা কি
গ্রহণ করা যাবে?
উত্তরঃ যাকাতের হকদার কোন ব্যক্তি যদি প্রাপ্ত যাকাত থেকে
প্রদানকারীকে কিছু হাদিয়া বা উপহার স্বরূপ দেয়, তবে উহা
নিতে কোন বাধা নেই। কিন্তু তাদের মাঝে যদি পূর্ব থেকে কোন গোপন সমঝোতা হয়ে থাকে
তবে তা হারাম। এই কারণে তার উক্ত হাদিয়া বা উপহার গ্রহণ না করাই উত্তম।
উত্তরঃ না, তা জায়েয
হবে না।
উত্তরঃ অভিজ্ঞ ব্যক্তিগণ উহা নির্ধারণ করবে। স্বর্ণ
ব্যবসায়ী বা স্বর্ণকারের কাছে গিয়ে পরিমাণ জেনে নিবে। এখানে যে পরিমাণ স্বর্ণ আছে
তা নেসাব পরিমাণ হয় কি না? নেসাব পরিমাণ না হলে যাকাত
নেই। তবে তার কাছে অন্য স্বর্ণ থাকলে তা দ্বারা নেসাব পূর্ণ করে হিরা প্রভৃতি
মিশ্রিত স্বর্ণের মূল্য নির্ধারণ করে তা থেকে ২.৫% (আড়াই শতাংশ) হারে যাকাত আদায়
করবে।
উত্তরঃ যাকাতের জন্য আল্লাহ তা’আলা যে আট শ্রেণীর কথা
কুরআনে উল্লেখ করেছেন, তা ছাড়া অন্য কোন খাতে যাকাত
প্রদান করা জায়েয নয়। কেননা আল্লাহ তা’আলা আয়াতে إنما অব্যয় দ্বারা যাকাত প্রদানের খাতকে আট শ্রেণীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ করেছেন।
তিনি বলেন,
]إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَاِبْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنْ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ[
“যাকাত তো হচ্ছে শুধুমাত্র গরীবদের এবং অভাব গ্রস্থদের আর
এই যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের এবং ইসলামের প্রতি তাদের (কাফেরদের)
হৃদয় আকৃষ্ট করতে, ঋণ পরিশোধে, আল্লাহর
পথে জিহাদে, আর মুসাফিরদের সাহায্যে। এ বিধান আল্লাহর
পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী অতি প্রজ্ঞাময়। (সূরা
তওবাঃ ৬০)
সুতরাং তা মসজিদ নির্মাণের কাজে বা জ্ঞানার্জনের
কাজে খরচ করা জায়েয হবে না। আর নফল সাদকা সমূহের ক্ষেত্রে উত্তম হচ্ছে যেখানে বেশী
উপকার পাওয়া যাবে সেখানে প্রদান করা।
ফক্বীরের সংজ্ঞা হচ্ছেঃ স্থান ও কাল ভেদে যার কাছে
পূর্ণ এক বছরের নিজের ও পরিবারের খরচ পরিমাণ অর্থ না থাকবে তাকে বলা হয় ফক্বীর।
স্থান্তকাল ভেদে এজন্য বলা হয়েছে, হয়তো কোন কালে বা কোন স্থানে
এক হাজার রিয়ালের অধিকারীকে ধনী বলা হয়। আবার কোন কালে বা কোন স্থানে এটা কোন
সম্পদই নয়। কেননা সে সময় বা স্থানে জীবন ধারণের উপকরণ খুবই চড়া মূল্যের।
উত্তরঃ ভাড়ার কাজে মানুষ যে গাড়ী ব্যবহার করে অথবা নিজের
ব্যক্তিগত কাজে যে গাড়ী ব্যবহার করা হয় তার কোনটাতেই যাকাত নেই। তবে প্রাপ্ত ভাড়া
যদি নেসাব পরিমাণ হয় বা তা অন্য অর্থের সাথে মিলিত করে তা নেসাব পরিমাণ পৌঁছে এবং
এক বছর অতিক্রান্ত হয় তবে তাতে যাকাত দিতে হবে। অনুরূপভাবে ভাড়ায় ব্যবহৃত জমি বা
ভূমিতে যাকাত নেই। তার প্রাপ্ত ভাড়া থেকে যাকাত দিতে হবে।
উত্তরঃ ভাড়া দেয়া হয়েছে এমন বাড়ী যদি ভাড়ার জন্যই নির্মাণ
করা হয়ে থাকে তবে বাড়ীর মূল্যে কোন যাকাত নেই। তবে বাড়ী থেকে প্রাপ্ত ভাড়ার যাকাত
দিতে হবে, যদি ভাড়া দেয়ার দিন থেকে প্রাপ্ত অর্থের উপর বছর পূর্ণ
হয়। ভাড়ার চুক্তি নামা স্বাক্ষর করার দিন থেকে যদি বছর পূর্ণ না হয় তবে তাতে যাকাত
নেই। যেমন বছরে ১০,০০০ (দশ হাজার) টাকা প্রদানের চুক্তিতে
ঘর ভাড়া দেয়া হল। চুক্তির শুরুতে পাঁচ হাজার টাকা গ্রহণ করে উহা খরচ হয়ে গেল।
অবশিষ্ঠ পাঁচ হাজার টাকা বছরের মধ্যবর্তী সময়ে গ্রহণ করে উহাও বছর পূর্ণ হওয়ার
আগেই খরচ হয়ে গেল, তবে এক বছরে প্রাপ্ত দশ হাজার টাকার এই
ভাড়ার মধ্যে কোন যাকাত দিতে হবেনা। কেননা এই অর্থে বছর পূর্ণ হয়নি।
কিন্তু বাড়ীটি যদি ব্যবসার জন্য নির্মাণ করে মূল্য
বৃদ্ধি বা লাভের অপেক্ষায় থাকে এবং বিক্রি হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ভাড়া আদায় করে, তবে উক্ত বাড়ীর মূল্যে যাকাত দিতে হবে এবং ভাড়ারও যাকাত দিতে হবে যখন
বছর পূর্ণ হবে।। কেননা উহা ব্যবসার জন্য নির্মাণ করা হয়েছে। নিজ মালিকানায় থেকে
যাওয়া বা তা থেকে উপকৃত হওয়ার উদ্দেশ্যে নয়। আর এমন প্রত্যেক বস্ত যা ব্যবসা বা
উপার্জনের উদ্দেশ্যে প্রস্তত করা হয় তাতেই যাকাত রয়েছে। কেননা নবী (ﷺ) বলেন, “প্রত্যেকটি কর্ম নিয়তের উপর
নির্ভরশীল। আর মানুষ যা নিয়ত করে তাই রয়েছে তার জন্য।”
এই ব্যক্তির নিকট উপার্জনের জন্য যে সম্পদ রয়েছে।
তার লক্ষ্য তো বস্তটির মূল্যের প্রতি - মূল বস্ত নয়। আর উহার মূল্য হচ্ছে দিরহাম
বা টাকা বা নগদ অর্থ আর নগদ অর্থে বা টাকা-পয়সায় যাকাত ওয়াজিব। অতএব যে গৃহ
ব্যবসার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে বছর শেষে তার মূল্য নির্ধারণ করে তাতে এবং উহা যদি
ভাড়ায় থাকে তবে ভাড়ার চুক্তির দিন থেকে বছর পূর্ণ হলে তাতেও যাকাত দিতে হবে।
বসবাসের উদ্দেশ্যে যমীন খরিদ করার পর উহা দ্বারা
ব্যবসা করার ইচ্ছা করলে তার যাকাত।
প্রশ্নঃ (৩৭১) জনৈক ব্যক্তি বসবাসের উদ্দেশ্যে
একটি যমীন খরিদ করেছে। তিন বছর পর সে উহা দ্বারা ব্যবসা করার ইচ্ছা করল। এখন উক্ত
তিন বছরের কি যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ বিগত বছরগুলোর জন্য কোন যাকাত ওয়াজিব হবেনা। কেননা
সে তো বসবাসের জন্য উহা খরিদ করেছিল। কিন্তু ব্যবসা ও উপার্জনের নিয়ত করার সময়
থেকেই বছরের হিসাব শুরু করতে হবে। যখন বছর পূর্ণ হবে তখনই তাতে যাকাত আবশ্যক হবে।
উত্তরঃ যাকাতুল ফিতর শব্দটির নামকরণ করা হয়েছে সওম ভঙ্গকে
কেন্দ্র করে। সওম ভঙ্গ বা শেষ করার কারণেই উক্ত যাকাত প্রদান করা আবশ্যক। সুতরাং
উক্ত নির্দিষ্ট কারণের সাথেই সংশ্লিষ্ট রাখতে হবে, অগ্রীম করা চলবে না। একারণে ফিতরা বের করার সর্বোত্তম সময় হচ্ছে ঈদের
দিন স্বলাতের পূর্বে। কিন্তু ঈদের একদিন বা দু’দিন আগে তা আদায় করা জায়েয।
কেননা এতে প্রদানকারী ও গ্রহণকারীর জন্য সহজতা রয়েছে। কিন্তু এরও আগে বের করার
ব্যাপারে বিদ্বানদের প্রাধান্যযোগ্য মত হচ্ছে তা জায়েয নয়। এই ভিত্তিতে ফিতরা আদায়
করার সময় দু’টি: ১) জায়েয বা বৈধ সময়। তা হচ্ছে ঈদের একদিন বা দু’দিন পূর্বে। ২) ফযীলতপূর্ণ
উত্তম সময়। তা হচ্ছে ঈদের দিন - ঈদের স্বলাতের পূর্বে। কিন্তু স্বলাতের পর পর্যন্ত
দেরী করে আদায় করা হারাম। ফিতরা হিসেবে কবূল হবেনা। ইবনু আব্বাসের হাদীসে বর্ণিত
হয়েছে:
مَنْ أَدَّاهَا قَبْلَ الصَّلَاةِ فَهِيَ زَكَاةٌ مَقْبُولَةٌ وَمَنْ أَدَّاهَا بَعْدَ الصَّلَاةِ فَهِيَ صَدَقَةٌ مِنَ الصَّدَقَاتِ
“স্বলাতের পূর্বে যে উহা আদায় করে তার যাকাত গ্রহণযোগ্য।
আর যে ব্যক্তি স্বলাতের পর আদায় করবে তার জন্য উহা একটি সাধারণ সাদ্কা বা যাকাত
হিসেবে গণ্য হবে।”
তবে কোন লোক যদি জঙ্গল বা মরুভূমি বা এ ধরণের
জনমানবহীন কোন স্থানে থাকার কারণে ঈদের দিন সম্পর্কে অজ্ঞ থাকে এবং ঈদের স্বলাত
শেষ হওয়ার পর সে সম্পর্কে অবগত হয়, তবে ঈদের
পর ফিতরা আদায় করলেও তার কোন অসুবিধা হবে না।
উত্তরঃ হ্যাঁ, বেশী করে
ফিতরা আদায় করা জায়েয। ফিতরার অতিরিক্ত বস্ত সাদ্কার নিয়তে প্রদান করবে। যেমন
আজকাল বহু লোক এরূপ করে থাকে। মনে করুন একজন লোক দশ জনের ফিতরা আদায় করবে। এই
উদ্দেশ্যে সে এক বস্তা চাউল খরিদ করে যাতে দশ জনের অধিক ব্যক্তির ফিতরা আদায় করা
যাবে। অতঃপর উহা নিজের পক্ষ থেকে এবং নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে আদায় করে। এটা জায়েয
যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে, নির্দিষ্ট পরিমাণ বা তার
চাইতে বেশী চাউল আছে। বস্তার মধ্যে নির্দিষ্ট ফিতরার পরিমাপ যদি জানা যায় তবে উহা
আদায় করাতে কোন দোষ নেই।
চাউল দ্বারা ফিতরা আদায় করা।
প্রশ্নঃ (৩৭৪) কতিপয় বিদ্বান মনে করেন, যে সমস্ত বস্ত দ্বারা ফিতরা দেয়ার কথা হাদীছে বর্ণিত হয়েছে, তা যেহেতু বর্তমানে পাওয়া যায়, তাই চাউল
দ্বারা ফিতরা দেয়া বিধিসম্মত নয়। এ সম্পর্কে আপনার মতামত জানতে চাই?
উত্তরঃ একদল আলেম বলেন, হাদীসে উল্লেখিত পাঁচ প্রকার বস্ত: গম, খেজুর,
যব, কিসমিস এবং পনীর- এগুলো যদি থাকে
তবে অন্য বস্ত দ্বারা ফিতরা আদায় করা জায়েয হবে না।
অন্য একটি মত হচ্ছে উল্লেখিত বস্ত এবং অন্য যে কোন
বস্ত এমনকি টাকা-পয়সা দ্বারাও ফিতরা আদায় করা বৈধ। পরস্পর বিরোধী দু’টি মত।
বিশুদ্ধ কথা হচ্ছে:- মানুষের সাধারণ খাদ্য থেকে ফিতরা আদায় করা বৈধ। কেননা
সহীহ্বুখারীতে আবু সাঈদ খুদরী h থেকে বর্ণিত
হয়েছে। তিনি বলেন,
كُنَّا نُخْرِجُ فِي عَهْدِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زكاة الْفِطْرِ صَاعًا مِنْ طَعَامٍ أَوْ صَاعًا مِنْ شَعِيرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ تَمْرٍ أَوْ صَاعًا مِنْ أَقِطٍ أَوْ صَاعًا مِنْ زَبِيبٍ
“আমরা রাসূলুল্লাহ (ﷺ) এর যুগে এক ছা’ পরিমাণ খাদ্য ফিতরা হিসেবে বের করতাম। খেজুর, যব, কিসমিস ও পনীর।” এ হাদীসে গমের কথা উল্লেখ
নেই। তাছাড়া যাকাতুল ফিতরে গম দেয়া যাবে এরকম সুস্পষ্ট ও বিশুদ্ধ কোন হাদীস আমার
জানা নেই। কিন্তু তারপরও নিঃসন্দেহে গম দ্বারা ফিতরা আদায় বৈধ।
আবদুল্লাহ্বিন আব্বাস h হতে বর্ণিত। তিনি বলেন:
فَرَضَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ زَكَاةَ الْفِطْرِ طُهْرَةً لِلصَّائِمِ مِنَ اللَّغْوِ وَالرَّفَثِ وَطُعْمَةً لِلْمَسَاكِينِ
“রাসূলুল্লাহ্(ﷺ) যাকাতুল ফিতর ফরদ্ব করেছেন সওমদ্বারকে অনর্থক কথা ও অশ্লীলতা থেকে পবিত্র
করার জন্য ও মিসকীনদের জন্য খাদ্য স্বরূপ।” অতএব মানুষের প্রচলিত খাদ্য থেকে ফিতরা
বের করাই যথেষ্ট। যদিও উহা ফিকাহ্বিদদের উক্তিতে উল্লেখিত পাঁচ প্রকারের
অন্তর্ভুক্ত না হয়। কেননা এই প্রকার সমূহ যেমন পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে- চারটি
ছিল। যা নবী (ﷺ) এর
যুগে মানুষের সাধারণ খাদ্য হিসেবে প্রচলিত ছিল। অতএব চাউল দ্বারা ফিতরা আদায় করা
জায়েয। বরং আমি মনে করি বর্তমান যুগে ফিতরা হিসেবে চাউলই উত্তম। কেননা উহা সহজলভ্য
ও মানুষের অধিক পছন্দনীয় বস্ত। তাছাড়া বিষয়টি স্থানভেদে বিভিন্ন্ন রকম হতে পারে।
হতে পারে গ্রামাঞ্চলে কোন কোন গোষ্ঠির নিকট খেজুর অধিক প্রিয় খাদ্য। তারা খেজুর
দ্বারা ফিতরা আদায় করবে। কোন এলাকায় কিসমিস, কোন
এলাকায় পনীর প্রিয় খাদ্য হতে পারে তারা তা দিয়েই ফিতরা আদায় করবে। প্রত্যেক এলাকা
ও সম্প্রদায়ের জন্য সেটাই উত্তম যেটাতে রয়েছে তাদের জন্য অধিক উপকার।
মৃত ব্যক্তির ওছীয়তকৃত সম্পদে এবং ইয়াতীমের সম্পদে যাকাত
প্রশ্নঃ (৩৭৫) কারো নিকট যদি মৃত ব্যক্তির
ওছীয়তকৃত সম্পদের এক তৃতীয়াংশ থাকে এবং ইয়াতীমের কিছু সম্পদ থাকে, তাতে কি যাকাত দিতে হবে?
উত্তরঃ মৃত ব্যক্তির ছেড়ে যাওয়া সম্পদের উক্ত এক
তৃতীয়াংশে কোন যাকাত নেই। কেননা তার কোন মালিক নেই। উহা তো অসীয়ত অনুযায়ী
জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যবহার করা হবে। কিন্তু ইয়াতীমের অর্থ যদি নেসাব পরিমাণ হয় এবং
বছর পূর্ণ হয় তবে তাতে যাকাত ওয়াজিব হবে। ইয়াতীমের অভিভাবক সেই যাকাত বের করবে।
বিদ্বানদের মতসমূহের মধ্যে বিশুদ্ধ মত হচ্ছে যাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য প্রাপ্ত
বয়স্ক হওয়া বা বিবেকবান হওয়া শর্ত নয়। কেননা যাকাত সম্পদে ওয়াজিব হয়।
উত্তরঃ এতে কোন যাকাত নেই। স্বর্ণ-রৌপ্য ছাড়া মানুষের
ব্যবহৃত কোন বস্ততে যাকাত নেই। যেমন গাড়ী, উট,
ঘোড়া, ঘর-বাড়ী ইত্যাদি। কেননা নবী (ﷺ) বলেন,
لَيْسَ عَلَى الْمُسْلِمِ فِي عَبْدِهِ وَلَا فَرَسِهِ صَدَقَةٌ
“মুসলিম ব্যক্তির ক্রীতদাস, ঘোড়ায়
কোন যাকাত নেই।”
উত্তরঃ যাকে যাকাত প্রদান করা হবে সে যদি যাকাতের হকদার
হয় কিন্তু সাধারণত: সে যাকাত গ্রহণ করেনা, তাহলে
যাকাত দেয়ার সময় তাকে বলে দিতে হবে যে, এটা যাকাত। যাতে
করে বিষয়টি তার নিকট সুস্পষ্ট হয় ফলে সে ইচ্ছা হলে যাকাত গ্রহণ করবে ইচ্ছা হলে
প্রত্যাখ্যান করবে। আর যে লোক যাকাত গ্রহণে অভ্যস্ত তাকে যাকাত দেয়ার সময় কোন কিছু
না বলাই উচিত। কেননা এতে তার প্রতি দয়া প্রদর্শনের খোঁটা দেয়া হয়। আল্লাহ বলেন,
]يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُبْطِلُوا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى[
“হে ঈমানদারগণ খোঁটা দিয়ে ও কষ্ট দিয়ে তোমরা তোমাদের
সাদ্কা বা দান সমূহকে বিনষ্ট করে দিও না।” (সূরা বাকারাঃ ২৬৪)
উত্তরঃ এক শহর থেকে অন্য শহরে যাকাত স্থানান্তর করলে যদি
কল্যাণ থাকে তবে তা জায়েয। যাকাত প্রদানকারীর কোন নিকটাত্মীয় যাকাতের হকদার অন্য
শহরে থাকে তবে তার নিকট যাকাত প্রেরণ করলে কোন অসুবিধা নেই।
অনুরূপভাবে জীবন যাত্রার মান উঁচু এমন দেশে বসবাস
করে এবং তুলনামূলক অভাবী দেশে যদি যাকাত প্রেরণ করে তবেও কোন অসুবিধা নেই। কিন্তু
যদি অন্য শহরে বা দেশে যাকাত প্রেরণ করাতে তেমন কোন কল্যাণ না থাকে তবে তা
স্থানান্তর করা যাবে না।
অন্য স্থানে বসবাসকারী পরিবারের লোকদের ফিতরা আদায় করা।
প্রশ্নঃ (৩৭৯) জনৈক ব্যক্তি মক্কায় থাকে আর তার পরিবার
রিয়াদে। সে কি নিজ পরিবারের লোকদের ফিতরা মক্কায় আদায় করতে পারবে?
উত্তরঃ নিজ পরিবারের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা জায়েয যদিও
তারা তার সাথে তার শহরে না থাকে। অতএব সে মক্কায় আর তার পরিবার রিয়াদে, সে মক্কাতেই তার ও তার পরিবারের ফিতরা আদায় করতে পারে। কিন্তু উত্তম
হচ্ছে যে স্থানে ফিতরা আদায় করার সময় হবে সে স্থানেই উহা আদায় করা। ফিতরা আদায়
করার সময় সে যদি মক্কায় থাকে তবে মক্কাতেই আদায় করবে। রিয়াদে থাকলে রিয়াদে।
পরিবারের কিছু লোক মক্কায় কিছু রিয়াদে। যারা মক্কায় আছে তারা মক্কায় যারা রিয়াদে
আছে তারা রিয়াদে ফিতরা আদায় করবে। কেননা ফিতরা শরীরের সাথে সম্পর্কিত। সায়িম
যেখানে তার ফিতরাও সেখানে।
প্রশ্নঃ (৩৮০) ঋণগ্রস্থের হাতে যাকাত দেয়া উত্তম? না কি তার পাওনাদারের নিকট গিয়ে তার পক্ষ থেকে ঋণ পরিশোধ করা উত্তম?
উত্তরঃ বিষয়টির বিধান অবস্থা ভেদে ভিন্ন রকম হতে পারে। ঋণ
গ্রস্ত ব্যক্তি যদি দায়মুক্তি ও ঋণ পরিশোধ করার ব্যাপারে আগ্রহী হয়। অর্থ হাতে এলে
ঋণ পরিশোধ করবে এরকম বিশস্ত হয় তবে যাকাতের অর্থ তার হাতেই প্রদান করা উচিত। যাতে
করে উহা পরিশোধ করতে পারে। তার ব্যাপারটা গোপন থাকে। দাবীদারদের সামনে লজ্জিত হওয়া
থেকে রক্ষা পায়।
কিন্তু ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি যদি বেহিসাবী অপব্যয়ী হয়।
তার হাতে অর্থ আসলে ঋণ পরিশোধের পরিবর্তে অপ্রয়োজনীয় খাতে তা খরচ করে, তবে যাকাতের অর্থ তাকে না দিয়ে সরাসরি পাওনাদারের নিকট গিয়ে, প্রাপ্য জেনে নিয়ে- তা পরিশোধ করে দিবে অথবা সাধ্যানুযায়ী তার ঋণ হালকা
করে দিবে।
উত্তরঃ যাকাতের জন্য যে কেউ হাত বাড়ালেই তাকে যাকাত দেয়া
উচিত নয়। কেননা সমপদশালী হওয়া সত্বেও অনেক মানুষ পয়সার লোভে হাত বাড়ায়। এসমস্ত লোক
কিয়ামত দিবসে এমন অবস্থায় আসবে যে তার মুখমন্ডলে এক টুকরা গোস্তও থাকবে না
(নাউযুবিল্লাহ) সমস্ত মানুষের সাক্ষাতে কিয়ামত দিবসে তার মুখ মন্ডলের শুধুমাত্র
হাড়-হাড্ডি ছাড়া আর কিছুই দেখা যাবে না। নবী (ﷺ) বলেনঃ
مَنْ سَأَلَ النَّاسَ أَمْوَالَهُمْ تَكَثُّرًا فَإِنَّمَا يَسْأَلُ جَمْرًا فَلْيَسْتَقِلَّ أَوْ لِيَسْتَكْثِرْ
“যে ব্যক্তি সম্পদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মানুষের কাছে হাত
পাতে সে যেন জাহান্নামের আগুন চাইল। অতএব বেশী চাইলে চাক বা কম চাইলে চাক।”
এ সুযোগে আমি সর্তক করছি সেই লোকদেরকে যারা ভিক্ষা
বৃত্তি চর্চা করে। সর্তক করছি সেই লোকদেরকে যারা যাকাতের হকদার না হওয়া সত্বেও
যাকাত গ্রহণ করে। সাবধান! যাকাতের হকদার না হয়েও আপনি যদি যাকাত গ্রহণ করেন, তবে আপনি হারাম খেলেন। (নাউযুবিল্লাহ) আল্লাহকে ভয় করুন। অথচ নবী (ﷺ) বলেন,
وَمَنْ يَسْتَغْنِ يُغْنِهِ اللَّهُ وَمَنْ يَسْتَعْفِفْ يُعِفَّهُ اللَّهُ
“যে ব্যক্তি অভাব মুক্ত থাকতে চায় আল্লাহ তাকে অভাবমুক্ত
করেন। যে ব্যক্তি পবিত্র থাকতে চায় আল্লাহ তাকে পবিত্র করে দেন।”
তবে কোন লোক যদি আপনার কাছে হাত পাতে, আর তার বাহ্যিক অবস্থা দেখে আপনি মনে করেন সে যাকাতের হকদার, তবে তাকে যাকাত দিলে আদায় হয়ে যাবে এবং আপনি দায় মুক্ত হবেন। পরবর্তীতে
যদি জানা যায় যে, সে যাকাতের হকদার ছিল না তবে পুনরায়
যাকাত দিতে হবে না। দলীলঃ
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِي اللَّه عَنْه أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللَّه عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ قَالَ رَجُلٌ لَأَتَصَدَّقَنَّ الليلة بِصَدَقَةٍ فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدِ سَارِقٍ فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تُصُدِّقَ عَلَى سَارِقٍ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدَيْ زَانِيَةٍ فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تُصُدِّقَ اللَّيْلَةَ عَلَى زَانِيَةٍ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى زَانِيَةٍ لَأَتَصَدَّقَنَّ بِصَدَقَةٍ فَخَرَجَ بِصَدَقَتِهِ فَوَضَعَهَا فِي يَدَيْ غَنِيٍّ فَأَصْبَحُوا يَتَحَدَّثُونَ تُصُدِّقَ عَلَى غَنِيٍّ فَقَالَ اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ عَلَى سَارِقٍ وَعَلَى زَانِيَةٍ وَعَلَى غَنِيٍّ فَأُتِيَ فَقِيلَ لَهُ أَمَّا صَدَقَتُكَ عَلَى سَارِقٍ فَلَعَلَّهُ أَنْ يَسْتَعِفَّ عَنْ سَرِقَتِهِ وَأَمَّا الزَّانِيَةُ فَلَعَلَّهَا أَنْ تَسْتَعِفَّ عَنْ زِنَاهَا وَأَمَّا الْغَنِيُّ فَلَعَلَّهُ يَعْتَبِرُ فَيُنْفِقُ مِمَّا أَعْطَاهُ اللَّهُ
আবূ হুরায়রা h হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (ﷺ) বলেন, “একদা (বণী ইসরাঈলের) জনৈক
ব্যাক্তি বলল, অবশ্যই আমি এই রাত্রে কিছু দান করব। এ
উদ্দেশ্য সে স্বীয় দান নিয়ে বের হল, এবং (গোপনীয়তার কারনে
নিজের অজান্তে) এক চোরের হাতে তা রেখে দিল। সকালে মানুষে বলাবলি করতে লাগল,
কি আশ্চর্য! আজ রাতে এক চোরকে দান করা হয়েছে! সে বলল, যে আল্লাহচোরের হাতে আমার দান দাওয়ার কারনে সকল প্রশংস তোমার জন্য।
অবশ্যই (আবার) দান করব। অতঃপর সে তাঁর দান নিয়ে বের হল এবং এক ব্যাভিচারিনীর হাতে
রেখে দিল। সকালে মানুষ বলাবলি করতে লাগল, কি আশ্চর্য! গত
রাতে এক ব্যাভিচারিনীকে দান করা হয়েছে। সে বলল, হে
আল্লাহব্যাভিচারিনীকে দান করার কারনে সমস্ত প্রশংসা তোমারই প্রাপ্য। অবশ্যই (আবার)
সাদকা করব। সে তাঁর দান নিয়ে বের হল অতঃপর এক ধনী লোকের হাতে দিয়ে দিল। সকালে
মানুষ বলতে লাগল, আশ্চর্য ব্যাপার! আজ রাতে একজন ধনী
মানুষকে দান করা হয়েছে। সে বললঃ হে আল্লাহযাবতীয় প্রশংসা তোমারই প্রাপ্য। চোর
ব্যাভিচারিনী এবং ধনী লোককে দান করার কারনে।
তাঁর নিকট আসা হল (কোন ঐশী দূত হতে পারে), অতঃপর তাকে বল হল, তোমার দান চোরের হাতে যাওয়ার কারন্তেহতে পারে সে চুরি থেকে বিরত থাকবে। আর ব্যাভিচারিনী, হতে পারে সে এ দানের কারনে ব্যাভিচার থেকে বিরত হবে। আর ধনী ব্যাক্তি এ থেকে শিক্ষা গ্রহন করে হতে পারে সেও তাঁর সম্পদ থেকে দান করবে। (বুখারী, অধ্যায়ঃ যাকাত, অনুচ্ছেদঃ ধনী মানুষের অজান্তে তাকে দান করা। মুসলিম, অধ্যায়ঃ যাকাত, অনুচ্ছেদঃ দানকারীর প্রতিদানের আবশ্যকতা যদিও উহা অপাত্রে দেয়া হয়।)
তাঁর নিকট আসা হল (কোন ঐশী দূত হতে পারে), অতঃপর তাকে বল হল, তোমার দান চোরের হাতে যাওয়ার কারন্তেহতে পারে সে চুরি থেকে বিরত থাকবে। আর ব্যাভিচারিনী, হতে পারে সে এ দানের কারনে ব্যাভিচার থেকে বিরত হবে। আর ধনী ব্যাক্তি এ থেকে শিক্ষা গ্রহন করে হতে পারে সেও তাঁর সম্পদ থেকে দান করবে। (বুখারী, অধ্যায়ঃ যাকাত, অনুচ্ছেদঃ ধনী মানুষের অজান্তে তাকে দান করা। মুসলিম, অধ্যায়ঃ যাকাত, অনুচ্ছেদঃ দানকারীর প্রতিদানের আবশ্যকতা যদিও উহা অপাত্রে দেয়া হয়।)
দেখুন সৎ নিয়তের কিরূপ প্রভাব হয়। অতএব যে ব্যক্তি
আপনার কাছে হাত পেতেছে আপনি তাকে ফকীর বা অভাবী মনে করে দান করেছেন কিন্তু পরে
জানা গেল সে অভাবী নয় সমপদশালী তবে আপনার যাকাত হয়ে যাবে। পুনরায় আদায় করতে হবে
না।
প্রশ্নঃ ৩৮২) জনৈক ধনী ব্যক্তি একজন লোককে বলল আপনি
যাদেরকে হকদার মনে করেন তাদের কাছে আমার এই যাকাত বন্টন করে দিন। এখন এই ব্যক্তি
কি যাকাতের কাজে নিযুক্ত হিসেবে গণ্য হবে এবং কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী যাকাতের
হকদার হবে?
উত্তরঃ না, এ লোক
যাকাতের কাজে নিযুক্ত বলে গণ্য হবে না। ফলে সে যাকাতেরও হকদার হবে না। কেননা সে
নির্দিষ্ট ভাবে এক ব্যক্তির যাকাত বন্টন করার দায়িত্ব নিয়েছে। (আল্লাহই ভাল জানেন)
পবিত্র কুরআনের বাক্য ভঙ্গির গোপন উদ্দেশ্য হচ্ছে এটাই- আল্লাহ বলেন, (والعاملين عليها ( এখানেعلى অব্যয় দ্বারা এক প্রকার
কর্তৃত্ব বুঝা যায়। অর্থাৎ যাকাত আদায় ও বন্টনের কাজে সরকারের পক্ষ থেকে নিযুক্ত
কর্মচারী। এ জন্য নির্দিষ্ট ভাবে একক ব্যক্তির পক্ষ থেকে নিযুক্ত কর্মচারী কুরআনে
বর্ণিত উক্ত প্রকারের অন্তর্ভুক্ত হবে না।
প্রশ্নঃ (৩৮৩) দুর্বল ঈমানের অধিকারী কোন
ব্যক্তিকে ঈমান শক্তিশালী করার জন্য যাকাত দেয়া যাবে কি? সে কিন্তু কোন এলাকার নেতা বা সরদার নয়।
উত্তরঃ মাসআলাটি বিদ্বানদের মাঝে মতবিরোধপূর্ণ। আমার মতে
ইসলামের প্রতি ধাবিত করতে ঈমান শক্তিশালী করার জন্য তাকে যাকাত দিলে কোন অসুবিধা
নেই। যদিও সে কোন কবীলা বা এলাকায় সরদার বা নেতা না হয়। যদিও একান্ত ব্যক্তিগতভাবে
উক্ত উদ্দেশ্যে দেয়া হয়। কেননা আল্লাহ বলেন, “তাদের
হৃদয়গুলো ইসলামের দিকে ধাবিত করার জন্য।” যখন ফকীর ও অভাবীকে যাকাত দেয়া বৈধ তখন
দুর্বল ঈমানের অধিকারী ব্যক্তিকে তা প্রদান করা তো আরো অধিক বৈধ। কেননা কোন
ব্যক্তির শরীর শক্তিশালী করার চেয়ে তার ঈমানকে শক্তিশালী করা অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
উত্তরঃ ইসলামী জ্ঞান শিক্ষার কাজে সম্পূর্ণরূপে নিয়োজিত
ছাত্রদেরকে যাকাত দেয়া জায়েয, যদিও তারা কামাই রোজগার করার
সামর্থ রাখে। কেননা ইসলামী জ্ঞান শিক্ষা করা এক প্রকার জিহাদ। আর আল্লাহর পথে
জিহাদ হচ্ছে যাকাতের একটি খাত। আল্লাহ বলেন,
]إِنَّمَا الصَّدَقَاتُ لِلْفُقَرَاءِ وَالْمَسَاكِينِ وَالْعَامِلِينَ عَلَيْهَا وَالْمُؤَلَّفَةِ قُلُوبُهُمْ وَفِي الرِّقَابِ وَالْغَارِمِينَ وَفِي سَبِيلِ اللَّهِ وَاِبْنِ السَّبِيلِ فَرِيضَةً مِنْ اللَّهِ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَكِيمٌ[
“যাকাত তো হচ্ছে শুধুমাত্র গরীবদের এবং অভাব গ্রস্তদের আর
এই যাকাত আদায়ের জন্য নিযুক্ত কর্মচারীদের এবং ইসলামের প্রতি যাদের হৃদয় আকৃষ্ট
করতে হয়, গোলাম আযাদ করার জন্য, ঋণ
পরিশোধে, আল্লাহর পথে জিহাদে আর মুসাফিরদের সাহায্যে। এ
বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ মহাজ্ঞানী অতিপ্রজ্ঞাময়।” (সূরা
তওবাঃ ৬০)
কিন্তু শিক্ষার্থী যদি শুধুমাত্র দুনিয়াবী শিক্ষায়
সম্পূর্ণরূপে ব্রতী থাকে তবে তাকে যাকাত দেয়া যাবেনা। আমরা তাকে বলব তুমি তো
দুনিয়ার কর্মেই ব্যস্ত আছ। অতএব চাকরী করার মাধ্যমে তো দুনিয়া অর্জন করতে পার। তাই
তোমাকে যাকাত দেওয়া যাবে না।
কিন্তু আমরা যদি এমন লোক পাই যে নিজ পানাহার ও
বাসস্থানের জন্য রোজগার করতে সক্ষম কিন্তু তার নিকট এমন সম্পদ নাই যা দ্বারা সে
বিবাহ করতে পারে, তবে যাকাতের অর্থ দিয়ে কি এ
ব্যক্তির বিবাহের ব্যবস্থা করা যাবে?
উত্তর: হ্যাঁ, বিবাহের
জন্য তাকে যাকাত দেয়া যাবে। যাকাত থেকে তার পূর্ণ মোহর আদায় করা যাবে।
যদি প্রশ্ন করা হয় বিবাহে অপরাগ ব্যক্তিকে যাকাত
দেয়া কিভাবে জায়েয হতে পারে?
জবাবে আমরা বলবঃ কেননা মানুষের বিবাহের
প্রয়োজনীয়তা অত্যধিক। কখনো খানা পিনার মতই এর প্রয়োজনীয়তা মানুষের জীবনে প্রকট হয়ে
দেখা যায়। এ জন্য বিদ্বানগণ বলেন, কারো ভরণ-পোষণের অর্থ বহন করা
যার উপর আবশ্যক থাকে তার উপর ওয়াজিব হচ্ছে তার বিবাহেরও ব্যবস্থা করে দেয়া- যদি
তার কাছে প্রয়োজনীয় সম্পদ থাকে। অতএব পুত্র যদি বিবাহ উপযুক্ত হয় এবং বিবাহের
দরকার মনে করে তবে পিতার উপর ওয়াজিব হচ্ছে পুত্রের বিবাহের ব্যবস্থা করে দেয়া।
কিন্তু আমি শুনেছি পুত্র যদি বিবাহের কথা উত্থাপন করে তবে কোন কোন পিতা নিজেদের
যৌবন কালের কথা ভুলে গিয়ে পুত্রকে ধমক দেন আর বলেন, নিজের
মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে উপার্জন কর তারপর বিবাহ কর। এটা মোটেও জায়েয না।
পিতা সামর্থবান থাকলে পুত্রের সাথে এরকম ব্যবহার করা হারাম। পিতার সামর্থ থাকা
সত্বেও পুত্রের বিবাহের ব্যবস্থা না করলে সে অবশ্যই কিয়ামত দিবসে পিতার বিরুদ্ধে
অভিযোগ দায়ের করবে।
একটি মাসাআলাঃ জনৈক ব্যক্তির কয়েকটি পুত্র সন্তান
আছে। সে যদি উপযুক্ত বড় ছেলের বিবাহ নিজের খরচে প্রদান করে, তবে মৃত্যুর পূর্বে ছোট ছেলেদের জন্য কি নিজ সম্পত্তি থেকে বড় ছেলের
মোহরের অনুরূপ প্রদান করার ওছিয়ত করে যেতে পারে?
উত্তরঃ না এরূপ করা জায়েয হবে না। তবে পিতার জীবদ্দশাতেই
যদি ছোট ছেলেরা বিবাহের উপযুক্ত হয় এবং বড় ছেলের ন্যায় তাদের নিজ খরচে বিবাহ দিয়ে
দেয় তবে তা জায়েয। কিন্তু তারা এখনও ছোট তাই মৃত্যুর পর তাদের জন্য আলাদা অছিয়ত
করে যাবে তা হারাম। এর দলীল হচ্ছেঃ নবী (ﷺ) বলেন,
]إِنَّ اللَّهَ قَدْ أَعْطَى لِكُلِّ ذِي حَقٍّ حَقَّهُ فَلَا وَصِيَّةَ لِوَارِثٍ[
“নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক অধিকারীকে তার নির্দিষ্ট অধিকার
প্রদান করেছেন। অতএব উত্তরাধিকারের জন্য কোন অছিয়ত নেই।”
উত্তরঃ যাকাত প্রদানের খাত সমূহের মধ্যে আল্লাহ তা’আলা
মুজাহিদদের কথা উল্লেখ করেছেন। অতএব আল্লাহর পথের মুজাহিদেরকে যাকাত প্রদান করা
জায়েয। কিন্তু আল্লাহর পথে মুজাহিদ কে? জনৈক
ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ﷺ)কে লড়াইকারী সর্ম্পকে প্রশ্ন করলেন, একজন বীরত্ব প্রকাশ করার জন্য লড়াই করে, একজন
গোত্রীয় সম্প্রীতি রক্ষার জন্য লড়াই করে, একজন নিজের
শক্তি প্রর্দশনের জন্য যুদ্ধ করে, এদের মধ্যে কে প্রকৃত
পক্ষে আল্লাহর পথে? এর জবাবে নবী (ﷺ) আমাদের ইনসাফপূর্ণ মূল্যবান একটি মাপকাঠি প্রদান করেছেন, তিনি বলেন,
مَنْ قَاتَلَ لِتَكُونَ كَلِمَةُ اللَّهِ هِيَ الْعُلْيَا فَهُوَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ
“যে ব্যক্তি লড়াই করবে আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার
উদ্দেশ্যে সেই প্রকৃত পক্ষে আল্লাহর পথে যুদ্ধকারী।” অতএব প্রত্যেক যে ব্যক্তি
আল্লাহর বাণীকে সমুন্নত করার জন্য যুদ্ধ করবে- লড়াই করবে আল্লাহর শরীয়তকে
প্রতিষ্ঠিত করার জন্যে, কাফের রাষ্ট্রে আল্লাহর দ্বীনকে
কায়েম করার জন্য সে-ই আল্লাহর পথে, সেই মুজাহিদ। তাকে
যাকাত প্রদান করা যাবে। তাকে নগদ অর্থ প্রদান করবে, যাতে
জিহাদের পথে উহা ব্যয় করতে পারে অথবা যাকাতের অর্থ দ্বারা যুদ্ধের সরঞ্জাম ক্রয়
করে দিবে।
উত্তরঃ মসজিদ নির্মাণের কাজ কুরআনের বাণী ‘ফি
সাবিলিল্লার’ অন্তর্ভুক্ত নয়। কেননা তাফসীরবিদগণ ‘ফি সাবিলিল্লার’ তাফসীরে উল্লেখ
করেছেনঃ এ দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে আল্লাহর পথে জিহাদ।
মসজিদ নির্মাণসহ অন্যান্য জনকল্যাণ মূলক কাজে
যাকাত ব্যয় করা প্রকৃত কল্যাণের পথকে বিনষ্ট করারই নামান্তর। কেননা কৃপণতা ও লোভ
অনেক লোকের মধ্যে স্বভাবজাত প্রকৃতি। যখন তারা দেখবে মসজিদ নির্মাণ এবং অন্যান্য
সব ধরণের কল্যাণ মূলক ক্ষেত্রে যাকাত দেয়া হচ্ছে, তখন তারা সমস্ত যাকাত সে সকল কাজেই ব্যবহার করা শুরু করবে। ফলে দুঃস্ত
অভাবী মানুষ তাদের অভাব অনটনের মধ্যেই রয়ে যাবে।
উত্তরঃ নিকটাত্মীয়ের ব্যাপারে মূলনীতি হচ্ছেঃ
নিকটাত্মীয়ের ব্যয়ভার বহন করা যদি যাকাত প্রদানকারীর উপর ওয়াজিব বা আবশ্যক হয়ে
থাকে, তবে তাকে (উক্ত নিকটাত্মীয়কে) যাকাত দেয়া জায়েয নয়।
কিন্তু সে যদি এমন ব্যক্তি হয় যার খরচ বহন করা যাকাত প্রদানকারীর উপর আবশ্যক নয়,
তবে তাকে যাকাত প্রদান করা জায়েয। যেমন সহদোর ভাই। যদি ভাইয়ের
পুত্র সন্তান থাকে, তবে তার ব্যয়ভার বহন করা অন্য ভাইয়ের
উপর আবশ্যক নয়। কেননা তার পুত্র সন্তান থাকার কারণে দু’ভাই পরষ্পর মীরাছ
(উত্তরাধিকার) পাবে না। এ অবস্থায় উক্ত ভাই যদি যাকাতের হকদার হয় তবে তাকে যাকাত দেয়া
যাবে।
অনুরূপভাবে নিকটাত্মীয়ের কোন ব্যক্তি ভরণ-পোষণের
ক্ষেত্রে যদি অভাবী না হয়, কিন্তু সে ঋণগ্রস্ত, তবে ঋণ পরিশোধ করার জন্য তাকে যাকাত প্রদান করা যাবে। যদিও উক্ত
নিকটাত্মীয় নিজের পিতা মাতা ছেলে বা মেয়ে হোক। যখন এই ঋণ ভরণ-পোষণে ত্রুটির কারণে
নয়।
উদাহরণঃ জনৈক ব্যক্তির পুত্র গাড়ি দুর্ঘটনা কবলিত
হওয়ার কারণে বড় একটি জরিমানার সম্মুখিন হয়েছে। অথচ তার নিকট জরিমানা আদায় করার মত
কোন অর্থ নেই। এ অবস্থায় তার পিতা নিজের যাকাতের অর্থ পুত্রের ঋণ পরিশোধ করার জন্য
প্রদান করলে তা বৈধ হবে। কেননা এই ঋণ ভরণ-পোষণের কারণে নয়। এমনিভাবে কোন মানুষ
যাকাতের কারণ ছাড়া অন্য কারণে যদি কোন আত্মীয়কে যাকাত থেকে প্রদান করে, তবে তা জায়েয।
উত্তরঃ দান সাদকা রমাদ্বন মাসের সাথে নির্দিষ্ট নয়; বরং উহা সর্বাবস্থায় প্রদান করা মুস্তাহাব। আর নেসাব পরিমাণ সম্পদে বছর
পূর্ণ হলেই যাকাত দেয়া ওয়াজিব। রমাদ্বনের অপেক্ষা করবে না; হ্যাঁ রমাদ্বন যদি নিকটবর্তী হয় যেমন শাবান মাসে বছর পূর্ণ হচ্ছে- তবে
রমাদ্বন পর্যন্ত বিলম্ব করে যাকাত বের করলে কোন অসুবিধা নেই।
কিন্তু যাকাত যদি উদাহরণ স্বরূপ মুহাররমে আবশ্যক
হয়, তবে রমাদ্বন পর্যন্ত অপেক্ষা করা জায়েয হবে না। অবশ্য
যদি পূর্ববর্তী রমাদ্বনে অগ্রীম যাকাত বের করে তবে তা জায়েয। কিন্তু ওয়াজিব হওয়ার
পর বিলম্ব করা জায়েয নয়। কেননা নির্দিষ্ট কারণের সাথে সংশ্লিষ্ট ওয়াজিব সমূহ উক্ত
কারণ পাওয়া গেলেই আদায় করতে হবে। বিলম্ব করা জায়েয হবে না। তাছাড়া মানুষের জীবনের
এমন তো কোন গ্যারান্টি নেই যে বিলম্বিত সময় পর্যন্ত সে বেঁচে থাকবে। যদি যাকাত
প্রদান করার পূর্বেই মৃত্যু বরণ করে তার যিম্মায় যাকাত রয়েই গেল। হতে পারে
উত্তরাধিকারীগণ বিষয়টি না জানার কারণে তার পক্ষ থেকে যাকাত আদায় করবে না অথবা হতে
পারে সম্পদের লোভে ও মোহে পড়ে তারা তা করবে না।
কিন্তু দান সাদকার জন্য নির্ধারিত কোন সময় নেই।
বছরের প্রতিদিনই তার সময়। কিন্তু লোকেরা রমাদ্বন মাসে দান সাদকা ও যাকাত প্রদান
পসন্দ করে। কেননা সময়টি ফযীলত পূর্ণ। দান ও বদান্যতার সময়। নবী (ﷺ) ছিলেন সর্বাধিক দানশীল। রমাদ্বন মাসে তিনি আরো বেশী দানশীল হতেন, যখন জিবরীল (আঃ) তাঁর সাথে সাক্ষাত করতেন এবং তাঁকে কুরআন পড়াতেন।
কিন্তু জানা আবশ্যক যে রমাদ্বন মাসে যাকাত প্রদান
বা দান সাদকার ফযীলত নির্দিষ্ট সময়ের (শুধু এক মাস) ফযীলতের সাথে সংশ্লিষ্ট। এর
চাইতে ফযীলতপূর্ণ অন্য কোন সময় বা অবস্থা যদি পাওয়া যায়, তবে সে সময়ই দান করা বা যাকাত প্রদান করা উত্তম। যেমন রমাদ্বন ছাড়া
অন্য সময় যদি ফকীর মিসকীনদের অভাব প্রকট আকার ধারণ করে বা দেশে দুর্ভিক্ষ দেখা যায়,
তবে সে সময় দান করার ছাওয়াব রমাদ্বন মাসে দান করার চাইতে
নিঃসন্দেহে বেশী।
অধিকাংশ ক্ষেত্রে ফকীর মিসকীনদের অবস্থা রমাদ্বন
ছাড়া অন্যান্য মাসে বেশী শোচনীয় থাকে। রমাদ্বন মাসে দান সাদকা বা যাকাতের
ব্যাপকতার কারণে তারা সে সময় অনেকটা অভাবমুক্ত হয়। কিন্তু বছরের অবশিষ্ট সময়ে তারা
প্রচন্ড অভাব ও অনটনের মাঝে দিন কাটায়। সুতরাং বিষয়টির প্রতি লক্ষ্য করা উচিত।
প্রশ্নঃ (৩৮৯) মানুষ তার জীবদ্দশায় যা দান করে তাকেই কি
সাদকায়ে জারিয়া বলে? নাকি মৃত্যুর পর আত্মীয়-স্বজনের
দানকে সাদকায়ে জারিয়া বলে?
উত্তরঃ হাদীছে এরশাদ হয়েছে মানুষ মৃত্যু বরণ করলে তিনটি
আ‘মাল ছাড়া সব আ‘মাল বন্ধ হয়ে যায়।
১) সাদকায়ে জারিয়া
২) ইসলামী জ্ঞান, উপকারী
বিদ্যা লিপিবদ্ধ করে যাওয়া
৩) সৎ সন্তানদের দু’আ।
এ হাদীছের বাহ্যিক অর্থে বুঝা যায়, জীবিত অবস্থায় ব্যক্তির দানকেই সাদকা জারিয়া বলা হয়। মৃত্যুর পর তার
সন্তানদের দানকে নয়। কেননা মৃত্যুর পর সন্তানদের থেকে যা হবে তা রাসূল (ﷺ) বর্ণনা করে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘অথবা সৎ
সন্তান যে তার জন্য দু’আ করবে।’
অতএব কোন ব্যক্তি যদি মৃত্যুর পূর্বে কিছু দান
করার অসীয়ত করে যায় অথবা ওয়াক্্ফ্করে যায়, তবে তা
সাদকা জারিয়া হিসাবে গণ্য হবে। মৃত্যুর পর কবরে সে তা থেকে উপকৃত হবে। অনুরূপভাবে
ইসলামী জ্ঞান, তার উপার্জন থেকে হতে হবে। এমনি ভাবে
সন্তান, যদি পিতার জন্য দু’আ করে।
এ জন্য কেউ যদি প্রশ্ন করে আমি কি পিতার জন্য
দু’রাকাত স্বলাত পড়ব? নাকি নিজের জন্য দু’রাকাত
স্বলাত আদায় করে এর মধ্যে পিতার জন্য দু’আ করব? আমি বলব:
উত্তম হচ্ছে নিজের জন্য দু’রাকাত স্বলাত আদায় করবেন এবং এর মধ্যে পিতার জন্য দু’আ
করবেন।
কেননা এ দিকেই নবী (ﷺ) নির্দেশনা প্রদান করেছেন। তিনি বলেন, অথবা ‘সৎ
সন্তান’ যে তার জন্য দু’আ করবে, এরূপ বলেন নি যে তার জন্য
স্বলাত আদায় করবে বা অন্য কোন নেক আ‘মাল করবে।
প্রশ্নঃ ৩৯০) স্ত্রী যদি স্বামীর সম্পদ থেকে নিজের জন্য
দান করে বা তা মৃত নিকটাত্মীয়ের জন্য দান করে, তবে তা
জায়েয হবে কি?
উত্তরঃ একথা নিশ্চিত জানা যে, স্বামীর সম্পদ স্বামীরই। অনুমতি ছাড়া কারো সম্পদ দান করা কারো জন্য বৈধ
নয়।
স্বামী যদি অনুমতি প্রদান করে তবে স্ত্রীর নিজের
জন্য বা তার মৃত আত্মীয়ের জন্য দান করা জায়েয, কোন
অসুবিধা নেই। অনুমতি না পেলে এরূপ করা হালাল নয়। কেননা এটা তার সম্পদ। আত্মার সন'ষ্টি ছাড়া কারো জন্য কারো সম্পদ খরচ করা বৈধ নয়।
প্রশ্নঃ (৩৯১) জনৈক ফক্বীর এক ধনী লোকের যাকাত নিয়ে আসে
এই কথা বলে যে, তার পক্ষ থকে সে তা বিতরণ করে দিবে।
তারপর তা সে নিজের কাছেই রেখে দেয়। তার এ কাজের বিধান কি?
উত্তরঃ এটা হারাম। ইহা আমানতের খিয়ানত। কেননা মালিক তো
দায়িত্বশীল হিসেবে তাকে যাকাত দিয়েছে। যাতে করে উহা বন্টন করে দেয়। অথচ সে নিজেই
তা রেখে দেয়। বিদ্বানগণ উল্লেখ করেছেন, কোন
বস্তর জিম্মাদারপ্রাপ্ত ব্যক্তি উক্ত বস্ত থেকে নিজের জন্য কোন কিছু নিতে পারবে
না। অতএব এই ব্যক্তির উপর আবশ্যক হচ্ছে যাকাতের মালিককে একথা বলে দেয়া যে, ইতিপূর্বে যা সে নিয়েছিল তা নিজের কাছে রেখে দিয়েছে। মালিক যদি তাতে
অনুমতি দিয়ে দেয় তো ভাল, অন্যথা যা সে নিয়েছে তার
জিম্মাদার হবে এবং তাকে তা আদায় করতে হবে।
এ উপলক্ষে একটি বিষয়ে আমি মানুষকে সতর্ক করতে চাই।
তা হচ্ছে, ফক্বীর থাকাবস্থায় যাকাত নিয়ে থাকে। তারপর আল্লাহতাকে
সম্পদশালী করেন। কিন্তু তখনও মানুষ তাকে যাকাত দিতে থাকে আর সেও নিতে থাকে। বলে,
আমি তো চাইনি। আল্লাহর পক্ষ থেকে আমার কাছে এ রিযিক এসেছে..।
কিন্তু এটা হারাম। কেননা আল্লাহযাকে অভাবমুক্ত করেন, যাকাত
গ্রহণ করা তার জন্য হারাম।
আবার কেউ কেউ যাকাত নিয়ে নিজে খায় না, অন্য মানুষকে দেয়। কিন্তু যাকাতের মালিক বিষয়টি জানেনা বা তাকে এ
ব্যাপারে দায়িত্বও দেয়া হয়নি। এরূপ করাও তার জন্য হরাম। যদিও এলোকের বিষয়টি আগের
জনের চাইতে কিছুটা হালকা। কিন্তু তারপরও নাজায়েয। সে যাকাতের মালিককে বিষয়টি অবহিত
করে অনুমতি নিয়ে নিবে। অনুমতি না দিলে তার ঘাড়ে যিম্মাদারী রয়ে যাবে। (আল্লাহই
অধিক জ্ঞান রাখেন)
0 Comments