
সালাফি মানহাজ অনুসারিদের মূলনীতি
🔳সালাফি মানহাজ মানহাজ অনুসারীদের মূলনীতিঃ
"وَأَنزَلْنَا إِلَيْكَ الْكِتَابَ بِالْحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيْهِ مِنَ الْكِتَابِ وَمُهَيْمِنًا عَلَيْهِ ۖ فَاحْكُم بَيْنَهُم بِمَا أَنزَلَ اللَّهُ ۖ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ عَمَّا جَاءَكَ مِنَ الْحَقِّ ۚ لِكُلٍّ جَعَلْنَا مِنكُمْ شِرْعَةً وَمِنْهَاجًا..."
সালাফি মানহাজ: সংজ্ঞা ও উৎপত্তি
কুরআন মাজীদের সূরা আল-মায়েদার ৪৮ নম্বর আয়াতে 'মানহাজ' (স্পষ্ট
পন্থা) শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে:
অনুবাদ: "আর আমি তোমার প্রতি কিতাব নাযিল করেছি যথাযথভাবে, এর পূর্বের কিতাবের সত্যায়নকারী ও এর উপর তদারককারীরূপে।
সুতরাং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন, তুমি তার মাধ্যমে ফয়সালা কর এবং তোমার নিকট যে সত্য এসেছে, তা ত্যাগ করে তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করো না। তোমাদের প্রত্যেকের জন্য আমি নির্ধারণ করেছি শরীআত ও স্পষ্ট
পন্থা (মানহাজ)..."
—
[সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৮]
সালাফি মানহাজ কী?
এটি কুরআন, সুন্নাহ এবং
সালাফদের (পুণ্যবান পূর্বসূরি) আদর্শের উপর ভিত্তি করে সঠিক ধর্মীয় ব্যাখ্যা
নির্ধারণের একটি পদ্ধতি।
এটি মহানবী মুহাম্মদ (সা.) কর্তৃক সমর্থিত এবং খাঁটি (সহীহ) হাদিসে লিপিবদ্ধ ইসলামী সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত। এর মূল ভিত্তি হলো তাওহিদ (আল্লাহর একত্ববাদ)।
২. আকিদাহ ও মানহাজের পারস্পরিক সম্পর্ক
সালাফিবাদ মূলত দুটি প্রধান ক্ষেত্র নিয়ে গঠিত: আকিদাহ (বিশ্বাস) এবং মানহাজ (পদ্ধতি/প্রয়োগ)।
বিখ্যাত হাদিস বিশারদ শায়খ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (রহ.)-এর ফতোয়া
অনুযায়ী:
পার্থক্য: "আকিদাহ মানহাজের চেয়ে বেশি নির্দিষ্ট।" আকিদাহ হলো অন্তরের তাত্ত্বিক বিশ্বাস (যেমন: তাওহিদ, ঈমান, কুফর)। আর মানহাজ হলো সেই বিশ্বাস ও দ্বীনকে বাস্তব জীবনে প্রয়োগের পদ্ধতি।
অবিচ্ছেদ্যতা: একজন
মানুষের প্রকৃত সালাফি হওয়ার জন্য আকিদা ও মানহাজ উভয়ই সঠিক হওয়া আবশ্যক।
উদাহরণস্বরূপ: কেউ ইখওয়ানি বা অন্য কোনো বিদআতি রাজনৈতিক মানহাজ গ্রহণ করে আকিদায় সালাফি দাবি করতে পারে না।
শেখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (র.)-এর বক্তব্য: "আকিদাহ মানহাজের চেয়ে বেশি নির্দিষ্ট।" একজন ব্যক্তির খাঁটি সালাফী হওয়ার জন্য আকিদা এবং মানহাজ উভয়টিই সঠিক হওয়া অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইখওয়ানি মানহাজ প্রয়োগ করে কেউ আকিদাতে সালাফী হতে পারে না।
সৌদি পন্ডিত সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজানের মতে মানহাজের ৩টি স্তর:
·
১. উৎস পাঠের নীতি: কোনো যুক্তি
বা অনুমানের আশ্রয় না নিয়ে আক্ষরিক অর্থে কুরআন ও সুন্নাহ পাঠ ও অনুধাবন করা।
·
২. বিদআত বর্জন: ইবাদতের ক্ষেত্রে সব
ধরনের ধর্মীয় উদ্ভাবন (বিদআত) থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা।
· ৩. সমসাময়িক সমাজ: সমাজ এবং বর্তমান বিশ্বপরিস্থিতির সাথে যুক্ত হওয়া। (এই তৃতীয় নীতিটির প্রয়োগের পার্থক্যের কারণেই সালাফীদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণীবিভাগ তৈরি হয়)।
সালাফি মানহাজের মূলনীতি ও বৈশিষ্ট্য
(উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শেখ
মুহাম্মদ ইবনে উমর বাজমুল-এর 'সালাফি মানহাজ' গ্রন্থ অবলম্বনে)
🔳 প্রথম উদ্দেশ্য: সালাফি পদ্ধতির সংজ্ঞা ও মৌলিক নীতিসমূহ
প্রথম উদ্দেশ্য: সালাফি পদ্ধতির সংজ্ঞা, এর মূলনীতি ও বিধান
১.১. প্রথম নীতি (The First Principle): পুণ্যবান পূর্বসূরিদের (আল-সালাফ আল-সালিহ; অর্থাৎ সাহাবি, তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়ি) বোধ ও বুঝ
অনুযায়ী কিতাব (কুরআন) ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার মাধ্যমে একমাত্র আল্লাহর খাঁটি
ইবাদত কায়েম করা।
১.২. দ্বিতীয় নীতি (The Second Principle): মুসলিম উম্মাহর জামাআতকে শক্ত করে ধরে রাখা এবং [মুসলিম
শাসকদের] হকের ওপর শ্রবণ ও আনুগত্য করা (বিদ্রোহ বা বিশৃঙ্খলা না করা)।
১.৩. তৃতীয় নীতি (The Third Principle): ধর্মীয় উদ্ভাবন (বিদআত) এবং ধর্মীয় উদ্ভাবক (মুবতাদিউন তথা
বিদআতিদের) ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকা।
১.৩.১. সালাফীগণ
বিদআতী ও ভ্রান্ত উপদলসমূহের মজলিশ বা সমাবেশ থেকে দূরে থাকেন।
১.৩.২. সালাফী
পদ্ধতি অনুসরণ করা প্রতিটি মুসলমানের জন্য আবশ্যক/ওয়াজিব (শরঈ বিধান)।
১.৩.৩. সালাফী
পদ্ধতি অনুসরণের উপকারিতা হলো দুনিয়াতে হেদায়েত এবং আখিরাতে মুক্তি লাভ।
🔳 দ্বিতীয় উদ্দেশ্য: সালাফী পদ্ধতির স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসমূহ
·
১. আল-ওয়ালা'
ওয়া আল-বারা' (আনুগত্য ও বিচ্ছিন্নতা): তাদের
বন্ধুত্ব ও শত্রুতা কেবল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রদর্শিত পথ অনুসরণকে কেন্দ্র করে
আবর্তিত হয়।
·
২. সুন্নাহর অনুসরণ: জীবনের
প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা কঠোরভাবে সুন্নাহর অনুসারী।
·
৩. মধ্যমপন্থা ও সংযম: তারা দ্বীনের
সমস্ত বিষয়ে চরমপন্থা ও শিথিলতা বর্জন করে মধ্যমপন্থা অবলম্বন করেন।
·
৪. ঐক্য ও দৃঢ়তা: তারা সত্যের
ওপর ঐক্যবদ্ধ,
চুক্তিবদ্ধ এবং দ্বীনের ব্যাপারে সর্বদা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
·
৫. জ্ঞান ও সঠিক প্রয়োগ: তারা সঠিক
ইসলামী জ্ঞান অর্জন এবং এর বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে সমাজে দ্বীন প্রতিষ্ঠার কাজ
করেন।
🔳 তৃতীয় উদ্দেশ্য: সংশোধন ও দাওয়াতের সঠিক মানদণ্ড
সুন্নাহ ও জামাতের লোকদের আদর্শ অনুসারে সমাজে সঠিক সংস্কার বা সংশোধন আনার
উপায়সমূহ নিম্নরূপ:
১. তাওহিদ ভিত্তিক সূচনা: সংশোধনের মূল ভিত্তি ও সূচনা হবে আল্লাহর ইবাদত এবং তাওহিদ
(একেশ্বরবাদ) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
২. ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু: সংশোধন সমষ্টি বা সমাজ দিয়ে শুরু হয় না, বরং নিজের ভেতর থেকে শুরু হয়। প্রথমে নিজের সংশোধন, তারপর পরিবার, নিকটবর্তী
এবং ক্রমান্বয়ে দূরবর্তীদের দিকে দাওয়াত পৌঁছানো।
৩. কর্মের আগে জ্ঞান: যেকোনো বক্তব্য ও কর্মের পূর্বে সঠিক ও বিশুদ্ধ জ্ঞান অর্জন
করা আবশ্যক।
৪. সালাফদের অনুধাবন: অর্জিত জ্ঞান অবশ্যই সালাফদের (সাহাবী, তাবেয়ী, তাবে-তাবেয়ী) বুঝ ও
ব্যাখ্যার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হবে।
৫. উত্তম চরিত্রে ভূষিত হওয়া: আল্লাহর পথে দাওয়াত দেওয়ার সময় দাঈ বা আহ্বানকারীকে অবশ্যই কুরআন, সুন্নাহ এবং সালাফদের বর্ণিত উত্তম আখলাক ও ধৈর্য গুণের দ্বারা নিজেকে সজ্জিত করতে হবে।
·
তথ্যসূত্র:
·
আল-কুরআন (সূরা আল-মায়েদা, আয়াত: ৪৮)
·
শেখ মুহাম্মদ নাসিরুদ্দীন আল-আলবানী (ফাতাওয়া).
·
শেখ সালিহ বিন ফাওজান আল-ফাওজান (আল-মানহাজ).
· ড. মুহাম্মদ ইবনে উমর বাজমুল (অধ্যাপক, উম্মুল কুরা বিশ্ববিদ্যালয়) - 'সালাফি মানহাজ' গ্রন্থ।


0 Comments