🌙 দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ:
সেহরি।
প্রথম অনুচ্ছেদ: সেহরির সংজ্ঞা
সুহুর (সীন অক্ষরে পেশ যোগে):
অর্থ
হলো শেষ রাতে(সাহরীর সময়ে) খাবার খাওয়ার কাজকে বুঝায়।
সাহুর- সীন বর্ণে জবরসহ): অর্থ হলো শেষ রাতে যা কিছু খাওয়া বা পান করা হয় (খাবার ও পানীয়) তাকে বুঝায়। অর্থাৎ, জবর দিয়ে পড়লে এটি খাবারের নাম, আর পেশ দিয়ে পড়লে এটি খাবার খাওয়ার কাজ বা পদ্ধতি।
ü সূত্র: ইবনে মনজুর প্রণীত 'লিসানুল আরব' (১/৩৫১)।
অতএব,
সীন অক্ষরে ‘জবর’ যোগে এটি সেই বস্তুর নাম যা দ্বারা সাহরী করা হয়। আর সীন অক্ষরে
‘পেশ’যোগে এটি একটি মাসদার (ক্রিয়ামূল), যার অর্থ হলো সাহরী খাওয়ার কাজটি নিজে।
আল-আযহারী বলেন:
আস-সাহুর’
হলো হলো সেই খাবার, শেষ রাতে যে খাদ্য, দুধ বা ছাতু খাওয়া হয়। এই সময়ে যা খাওয়া হয়
তার নাম হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়। বলা হয় ‘ব্যক্তিটি এই খাবার দ্বারা সাহরি করেছে’,
অর্থাৎ সে এটি খেয়েছে।"
সূত্র: 'তাহযিবুল লুগাহ' (৪/১৭১, ১৭২)।
ইবনুল আসীর বলেন: "...এটি জবরসহ (সাহুর) হলো ঐ খাবার ও পানীয়ের নাম যা গ্রহণ করা হয়, আর পেশসহ (সুহুর) হলো কাজ বা আমলটি স্বয়ং।"
সূত্র: 'আন-নিহায়াহ' (২/৩৪৭)।
দ্বিতীয় অনুচ্ছেদ: সেহরির বিধান ⚖
যে
ব্যক্তি রোজা রাখার ইচ্ছা করে, তার জন্য সাহরি খাওয়া মুস্তাহাব
(সুন্নত/পছন্দনীয়)।
প্রথমত:
সুন্নাহ থেকে দলিলঃ
১.
নবী করীম ﷺ থেকে কথা
ও কাজের (কওলী ও ফে'লী) মাধ্যমে সাহরীর বিষয়টি প্রমাণিত।
আনাস বিন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী (সা.) বলেছেন: "তোমরা
সাহরি খাও, কারণ সাহরিতে বরকত রয়েছে।"
ইমাম বুখারী তাঁর সহীহ গ্রন্থে অনুচ্ছেদ রচনা করেছেন: "সাহরি ওয়াজিব (আবশ্যক) হওয়া ছাড়াই এতে বরকত থাকা প্রসঙ্গে। কারণ নবী (সা.) ও তাঁর সাহাবীগণ বিরতিহীন রোজা (সাওমে বিসাল) রেখেছেন এবং সেখানে সাহরির উল্লেখ নেই।"
ü রেফারেন্স: সহীহ
বুখারী (১৯২৩) ও সহীহ মুসলিম (১০৯৫); ইবনে হাজারের 'ফাতহুল বারী'
(৪/১৩৯)।
আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত যে, যায়েদ ইবনে সাবিত (রা.)
তাকে হাদীস শুনিয়েছেন: "তারা নবী করীম ﷺ-এর সাথে সাহরী খেয়েছেন, অতঃপর তারা
সালাতের (ফজরের) জন্য দাঁড়িয়েছেন।"
আল-জাসসাস
বলেন:
"রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহরির প্রতি উৎসাহিত করেছেন।
আর আল্লাহর বাণী—'তোমরা পানাহার করো
যতক্ষণ না ফজরের সাদা রেখা কালো রেখা থেকে স্পষ্ট হয়'—এর অন্তর্ভুক্ত বিষয়
হলো সাহরি খাওয়া। ফলে এটি আয়াত দ্বারাও নির্দেশিত হতে পারে।"
ü সূত্র: সহীহ
বুখারী (৫৭৫), সহীহ মুসলিম (১০৯৭) ও জাসসাসের 'আহকামুল কুরআন'
(১/২৮৯)।
২.
যায়েদ বিন সাবিত (রা.) হতে বর্ণিত: "তারা নবী ﷺ এর সাথে সেহরি খেলেন, তারপর সালাতের
জন্য দাঁড়ালেন..."।
উৎস: সহীহ বুখারী, পৃষ্ঠা বা নম্বর: ৫৭৬।
তাকরীজ (অন্যান্য সূত্র): ইমাম আহমদ (১৩৪৬০),
ইবনে হিব্বান (১৪৯৭) এবং আবু ইয়ালা (৩১৬২)।
হাদিস: আনাস বিন মালিক (রা.)। নবী কারীম ﷺ এরশাদ
করেছেন: "তোমরা সাহরী খাও; কারণ সাহরীর মধ্যে বরকত রয়েছে।"
উৎস: সহীহ
বুখারী- পৃষ্ঠা বা নম্বর: ১৯২৩।
তাকরীজ (অন্যান্য সূত্র): ইমাম বুখারী (১৯২৩) এবং ইমাম
মুসলিম (১০৯৫)।
ইমাম জাসসাস বলেন: "রাসূল ﷺ সেহরি খাওয়ার প্রতি উৎসাহিত করেছেন।" রেফারেন্সঃ [আহকামুল কুরআন: ১/২৮৯]।
দ্বিতীয়ত: ইজমা (ঐক্যমত) থেকে এ বিষয়ে ইজমা বর্ণনা করেছেন:
২. ইজমা (ঐক্যমত) থেকে: একাধিক
আলেম এ বিষয়ে ঐক্যমত বর্ণনা করেছেন:
ইবনুল মুনযির:
"ওলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন যে, সাহরি খাওয়া মুস্তাহাব।" (আল-ইজমা,
পৃ. ৪৯)
কাযী ইয়াদ:
"ফকিহগণ একমত যে এটি মুস্তাহাব, ওয়াজিব নয়।" (ইকমালুল মুয়াল্লিম, ৪/৩৩)
ইবনে কুদামা: "এ
বিষয়ে আলেমদের মাঝে কোনো মতভেদ আছে বলে আমরা জানি না।" (আল-মুগনি, ৩/১৭৩)
ইমাম নববী:
"সাহরি মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে আলেমদের ঐক্যমত রয়েছে।" (শরহ নববী আলা মুসলিম, ৭/২০৬)
আল-আইনী: "সাহরি করো—এটি নির্দেশসূচক
হলেও ইজমা অনুযায়ী এটি মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য।" (উমদাতুল কারী, ১০/৩০০)
হাদিসের
ব্যাখ্যার (শরহ) অনুবাদ:
নবী কারীম
ﷺ দুনিয়া
ও আখেরাতের কল্যাণের এমন কোনো পথ বাকি রাখেননি, যার দিকে তিনি উম্মতকে দিকনির্দেশনা
দেননি এবং সে বিষয়ে উৎসাহ প্রদান করেননি।
এই হাদিসে নবী কারীম ﷺ যারা রোজা রাখার ইচ্ছা পোষণ করেন, তাদের প্রত্যেককে ফজরের আগে সাহরী খাওয়ার প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন এবং নির্দেশ প্রদান করেছেন। তিনি বলেছেন: "তোমরা সাহরী খাও"—অর্থাৎ তোমরা সাহরীর খাবার গ্রহণ করো। আর 'সাহুর' হলো সেই খাবার যা সাহরীর সময়ে খাওয়া হয়; আর এই সময়টি হলো রমজানে বা নফল রোজার ক্ষেত্রে সুবহে সাদিক উদিত হওয়ার ঠিক পূর্ব মুহূর্ত।
তিনি
বলেছেন: "কারণ সাহরীর মধ্যে বরকত রয়েছে"—অর্থাৎ এর মধ্যে রয়েছে প্রবৃদ্ধি,
কল্যাণ ও আশীবার্দের আধিক্য। সাহরীর এই বরকত বিভিন্ন দিক থেকে অর্জিত হয়, যেমন:
১.
সুন্নাহর অনুসরণ করা।
২.
আহলে কিতাবদের (ইহুদি ও খ্রিস্টান) বিরোধিতা করা; কারণ তারা সাহরী খায় না।
৩.
ইবাদত করার শক্তি অর্জন করা।
৪.
কর্মতৎপরতা বা উদ্যম বৃদ্ধি পাওয়া।
৫.
ক্ষুধার কারণে যে মেজাজ খিটখিটে হয় বা অসদাচরণের সৃষ্টি হয়, তা প্রতিরোধ করা।
৬.
ওই সময়ে কোনো সাহায্যপ্রার্থী আসলে তাকে দান করার সুযোগ হওয়া অথবা অন্য কারো সাথে একত্রে
খাওয়ার সওয়াব পাওয়া।
৭.
দোয়া কবুলের বিশেষ সময়ে জিকির ও দোয়া করার সুযোগ পাওয়া।
৮.
ঘুমানোর আগে যারা রোজার নিয়ত করতে ভুলে গিয়েছিল, তাদের নিয়ত করার সুযোগ লাভ করা।
সাহরীর এই খাবারের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কারণ হলো—এই সময়টি অধিকাংশ মানুষের ঘুমের সময়। ঘুমের প্রবলতা ও স্বাদের কারণে মানুষ হয়তো এই খাবারের গুরুত্ব ভুলে যেতে পারে, আর সাহরী ত্যাগ করার ফলে দিনের বেলা কাজকর্মে তারা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
হাদীস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাসমূহ:
১. নবীজীর উত্তম আচরণ: এতে নবীজী ﷺ-এর তাঁর সাহাবীদের
সাথে সদ্ব্যবহার ও মেলামেশার প্রমাণ পাওয়া যায়, যেহেতু তিনি তাঁদের সাথে বসে খাবার
খেতেন।
২. সাহরী বিলম্বে খাওয়া: ফজরের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত
সাহরী পিছিয়ে নেওয়া বা দেরি করে খাওয়া সুন্নাত।
৩. একত্রে সাহরী খাওয়া: সাহরীতে দলবদ্ধভাবে বা একত্রে
খাওয়ার গুরুত্ব ও বৈধতা।
৪. ইবাদতে মগ্নতা: এটি ইশারা করে যে, সাহাবায়ে কেরামের
পুরো সময়টিই ইবাদতে মগ্ন থাকত (তাই তাঁরা সময়ের হিসাবও তিলওয়াতের মাধ্যমে দিয়েছেন)।
৫. ফজরের ওয়াক্তের বর্ণনা: এতে ফজরের শুরুর সময়ের
বর্ণনা রয়েছে, যা মূলত সুবহে সাদিক; যে সময় থেকে রোজাদারের জন্য পানাহার হারাম হয়ে
যায়।
৬. সময় নির্ধারণের পদ্ধতি: আয়াত তিলওয়াত বা শারীরিক
কাজের মাধ্যমে সময়ের পরিমাপ করা। আরবরা তৎকালীন সময়ে কাজের মাধ্যমেই সময় নির্ধারণ করত;
যেমন তারা বলত—একটি বকরি দোহন করতে যতটুকু সময় লাগে ইত্যাদি।



0 Comments