পঞ্চম অনুচ্ছেদ: সেহরি দেরি করে খাওয়া 🕙
রোজাদারের
জন্য ফজর হওয়ার ভয় না থাকলে সেহরি দেরি করে খাওয়া সুন্নাত। সামান্য কোনো খাবার বা
পানীয় গ্রহণ করলেও সেহরি আদায় হয়ে যায়।
সূত্র📖 [আল-মুগনী: ৩/১৭৪,
ফাতহুল বারী: ৪/১৪০]।
দলিলসমূহ:
প্রথমত: সুন্নাহ থেকে:
যায়েদ
বিন সাবিত (রা.) বর্ণনা করেন যে, তারা নবী ﷺ এর সাথে সেহরি খেলেন তারপর সালাতে
দাঁড়ালেন। আনাস (রা.) জিজ্ঞাসা করলেন: "সেহরি ও আজানের মধ্যে সময়ের ব্যবধান
কতটুকু ছিল?" তিনি বললেন: "পঞ্চাশ আয়াত পড়ার মতো সময়।"
(ইবনে হাজার বলেন: মাঝারি দৈর্ঘ্যের ৫০ আয়াত)।
সূত্র📖 [সহীহ বুখারী: ১৯২১, সহীহ মুসলিম: ১০৯৭, ফাতহুল বারী: ১/৩৬৭]।
সূত্র ও
ব্যাখ্যা (রেফারেন্স নম্বর সহ):
· সাহরীর
পরিমাণ: যেকোনো খাদ্য বা পানীয়ের
মাধ্যমেই সাহরী সম্পন্ন হয়, যদিও তা পরিমাণে সামান্য হয়। দেখুন:
ইবনে কুদামা, আল-মুগনী (৩/১৭৪)
এবং ইবনে হাজার আসকালানী, ফাতহুল বারী
(৪/১৪০)।
· হাদীসের সূত্র: সহীহ বুখারী (১৯২১) এবং সহীহ মুসলিম (১০৯৭)।
· সময়ের
ব্যাখ্যা: হাফেজ ইবনে হাজার (রাহ.)
বলেন: "পঞ্চাশটি আয়াত বলতে উদ্দেশ্য হলো—মাঝারি দৈর্ঘ্যের আয়াত; যা অনেক
দীর্ঘও নয়, আবার খুব ছোটও নয়। এবং পড়ার গতিও খুব দ্রুত নয় কিংবা খুব ধীর নয়।"
— ফাতহুল বারী (১/৩৬৭)।
·
অতিরিক্ত সূত্র: বদরুদ্দীন আইনী, উমদাতুল কারী (৫/৭৩)।
হাদীসের
সারসংক্ষেপ ও ব্যাখ্যা (শরহ):
হাদীস: আল্লাহর
নবী ﷺ এবং জায়েদ
বিন সাবিত (রা.) উভয়ে সাহরী খেলেন। যখন তাঁরা সাহরী শেষ করলেন, আল্লাহর নবী ﷺ সালাতের (ফজরের) জন্য
দণ্ডায়মান হলেন এবং সালাত আদায় করলেন। আমরা আনাস (রা.)-কে জিজ্ঞাসা করলাম: তাঁদের
সাহরী শেষ করা এবং সালাতে প্রবেশের মধ্যে সময়ের ব্যবধান কতটুকু ছিল? তিনি বললেন:
একজন মানুষের (স্বাভাবিক গতিতে) পঞ্চাশটি আয়াত পাঠ করতে যতটুকু সময় লাগে।
ü (সহীহ বুখারী: ৫৭৬; মুসনাদে আহমদ: ১৩৪৬০; ইবনে হিব্বান: ১৪৯৭)
ব্যাখ্যার অনুবাদ: সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর প্রতিটি বিষয়ে তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণে অত্যন্ত আগ্রহী ছিলেন। এই হাদীসে
আনাস (রা.) বর্ণনা করছেন যে, নবী কারীম ﷺ জায়েদ বিন সাবিত (রা.)-এর সাথে সাহরী খেয়েছিলেন। সাহরী হলো ফজর হওয়ার আগে
খাবার গ্রহণ করা। সাহরী শেষ করার পর নবীজী ﷺ ফজরের সালাতের জন্য দাঁড়ালেন। সাহরী এবং ফজরের সালাতের মধ্যবর্তী সময়টুকু
ছিল তাঁদের স্বাভাবিক পড়ার গতিতে পঞ্চাশটি আয়াত তিলওয়াত করার সময়ের সমান।
এই
হাদীস থেকে প্রাপ্ত শিক্ষাসমূহ:
১. নবীজীর উত্তম আচরণ:
সাহাবীদের সাথে বসে খাবার খাওয়া নবীজীর বিনয় ও উত্তম চরিত্রের বহিঃপ্রকাশ।
২. সাহরী বিলম্বে খাওয়া:
ফজরের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত সাহরী পিছিয়ে নেওয়া সুন্নাত।
৩. একত্রে সাহরী খাওয়া:
সাহরীতে দলবদ্ধভাবে বা একত্রে খাওয়ার গুরুত্ব।
৪. ইবাদতে মগ্নতা:
সাহাবীদের সময়গুলো ইবাদতে মগ্ন থাকতো, তাই তাঁরা সময়ের হিসাবও তিলওয়াতের মাধ্যমে
দিয়েছেন।
৫. ফজরের ওয়াক্ত:
সুবহে সাদিক উদিত হওয়াই হলো ফজরের শুরুর সময়, যখন থেকে পানাহার হারাম হয়।
৬. সময় নির্ধারণের পদ্ধতি:
আরবরা কাজের মাধ্যমে সময় নির্ধারণ করতো; যেমন—বকরি দোহনের সময় বা পঞ্চাশ আয়াত
তিলওয়াতের সময়।
দ্বিতীয়ত:
ইজমা(ঐকমত্য),
সাহরী বিলম্বে করা যে সুন্নাত, এ বিষয়ে 'ইজমা' বা আলেমদের সর্বসম্মত ঐকমত্য বর্ণনা
করেছেন:
ইবনে রুশদ, ইবনে মুফলিহ এবং আল-মারদাভী (রহিমাহুল্লাহ)।
রেফারেন্সঃ [বিদায়াতুল মুজতাহিদ: ১/৩০৭,
আল-ফুরু: ৫/৩০, আল-ইনসাফ: ৩/২৩৪]।
মূল উদ্ধৃতি ও রেফারেন্সসমূহ:
১. আল-মারদাভী (রাহ.)-এর বক্তব্য: তিনি বলেন: "(রোজার দুটি সুন্নাত রয়েছে) এর একটি হলো:
'ইফতার দ্রুত করা মুস্তাহাব'—এ বিষয়ে ইজমা রয়েছে। অর্থাৎ যখন সূর্যাস্ত নিশ্চিত হবে।
দ্বিতীয়টি হলো: 'সাহরী বিলম্বে করা মুস্তাহাব'—এ বিষয়েও ইজমা বা ঐকমত্য রয়েছে।"
সূত্র: আল-ইনসাফ (৩/২৩৪)।
২. ইবনে মুফলিহ (রাহ.)-এর বক্তব্য: তিনি বলেন: "যখন সূর্যাস্ত নিশ্চিত হবে, তখন ইফতার
দ্রুত করা সুন্নাত—এতে ইজমা রয়েছে। আর সাহরী বিলম্বে করাও সুন্নাত—এতেও ইজমা রয়েছে,
যতক্ষণ না ফজর উদিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।"
সূত্র: আল-ফুরু’ (৫/৩০)।
৩. ইবনে রুশদ (রাহ.)-এর বক্তব্য: তিনি বলেন: "আলেমগণ এ বিষয়ে একমত (ইজমা) হয়েছেন যে, রোজার সুন্নাতসমূহের অন্তর্ভুক্ত হলো—সাহরী বিলম্বে করা এবং ইফতার দ্রুত করা।"
সূত্র: বিদায়াতুল মুজতাহিদ (১/৩০৭)।



0 Comments