Subscribe Us

হে পথিক ভবিষ্যৎ বলে কিছু নাই ,আসোল ভবিষ্যৎ হলো পরোকাল।।

চতুর্থ অনুচ্ছেদ: কিয়ামুল লাইলের রাকাত সংখ্যা সালাফদের আলোকে ২০২৬



চতুর্থ অনুচ্ছেদ: কিয়ামুল লাইলের রাকাত সংখ্যা:

কিয়ামুল লাইলের রাকাত সংখ্যার জন্য নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই যা কমানো বা বাড়ানো যাবে না; বরং বিষয়টি অত্যন্ত প্রশস্ত।

১. ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.): তিনি বলেন, "নবীজী (সা.) রমজানে বা রমজানের বাইরে সাধারণত ১৩ রাকাতের বেশি পড়তেন না, তবে তিনি কিয়াম (দাঁড়ানো) অনেক দীর্ঘ করতেন। পরবর্তীতে ওমর (রা.) যখন মানুষকে উবাই ইবনে কাব (রা.)-এর পেছনে একত্রিত করলেন, তখন তিনি ২০ রাকাত পড়াতেন এবং ৩ রাকাত বিতর। তিনি কিয়াম সংক্ষিপ্ত করে রাকাত সংখ্যা বাড়িয়ে দিয়েছিলেন যাতে মুসল্লিদের কষ্ট না হয়। সালাফদের কেউ কেউ ৪০ রাকাতও পড়তেন। সুতরাং রাকাত সংখ্যা নিয়ে কোনো নির্দিষ্ট সীমা নবীজী (সা.) থেকে আসেনি, যে যেভাবে সহজ মনে করে পড়বে।" সূত্র: মাজমুউল ফাতাওয়া (২২/২৭২)।

 

২. ইমাম শাওকানী ও আল-শিনকিতি (রহ.)-এর মত:

·        ইমাম শাওকানী: তারাবিহ নামাজকে নির্দিষ্ট সংখ্যক রাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা বা নির্দিষ্ট তেলাওয়াত সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত নয়। (নায়েল আল-আওতার ৫/১০৮)

·        আল-শিনকিতি: রাতের নামাজের রাকাত সংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই যার নিচে নামাজ বাতিল বা যার ওপরে পড়া জায়েজ নেই। এটি বান্দার শক্তি ও প্রস্তুতির ওপর নির্ভরশীল। (আদওয়া’ আল-বায়ান ৮/৩৫৭)

 

৩. ইমাম ইবনে বায ও ইবনে উসাইমিন (রহ.)-এর মত:

·        ইবনে বায: রাতের নামাজে নমনীয়তার সুযোগ রয়েছে। সুন্নাত হলো দুই রাকাত করে নামাজ পড়া। (মাজমু’ ফাতাওয়া ১১/৩২০)

 

·        ইবনে উসাইমিন: যারা বলেন সুন্নাহর নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন ১১ রাকাত) অতিক্রম করা জায়েজ নয় এবং যারা বেশি পড়ে তাদের নিন্দা করেন, তারা স্পষ্ট ভুল করছেন। নবী (সা.)-কে যখন রাতের নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি বলেছিলেন: "দুই দুই রাকাত করে"। তিনি কোনো সংখ্যা নির্দিষ্ট করেননি। কেউ চাইলে ১০০ রাকাত পড়ে এক রাকাত বিতর দিয়ে শেষ করতে পারে। তবে নবী (সা.) থেকে বর্ণিত ১১ বা ১৩ রাকাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকাই উত্তম।

(আল-শারহ আল-মুমতি ৪/৫৩, মাজমু' ফাতাওয়া ১৪/১৮৭-১৮৮)

চতুর্থ অনুচ্ছেদ (বাকি অংশ): রাকাত সংখ্যা ও ইমামগণের অভিমত

১. ২০ ও ৩৬ রাকাতের মতভেদ ও প্রশস্ততা

অনুবাদ: ইমাম ইবনে কুদামা বলেন: "ইমাম সুফিয়ান সাওরী, আবু হানিফা এবং শাফেয়ী (রহ.)-ও ২০ রাকাতের পক্ষে মত দিয়েছেন।" (আল-মুগনী, ১/৪৫৬)। আবার কেউ কেউ এর চেয়ে বাড়িয়ে ৩৬ রাকাত পর্যন্ত পড়ার কথা বলেছেন। আবু হাসান আল-মালেকী (রহ.) বলেন: "সাহাবায়ে কেরামের পরবর্তী প্রজন্মের লোকেরা (ওমর বিন আব্দুল আজিজের যুগে) শাফ্‌আ ও বিতর ছাড়া ৩৬ রাকাত নামাজ পড়তেন। ইমাম মালিক 'আল-মুদাওয়ানা' গ্রন্থে এটিই পছন্দ করেছেন। এর সবটুকুই প্রশস্ত ও জায়েজ।" (কিফায়াতুত তালিব আর-রব্বানী, ১/৫৮১)।

২. ইবনে তাইমিয়া (রহ.)-এর বিশ্লেষণ: রাকাত বনাম দৈর্ঘ্য

অনুবাদ: ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: "নবীজী (সা.)-এর রাতের নামাজই ছিল তাঁর বিতর। তিনি রমজান ও রমজানের বাইরে ১১ বা ১৩ রাকাত পড়তেন, কিন্তু তিনি এই নামাজগুলো অনেক দীর্ঘ করতেন। যখন এটি সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টকর হয়ে পড়ল, তখন ওমর (রা.)-এর যুগে উবাই ইবনে কাব (রা.) মানুষকে নিয়ে ২০ রাকাত পড়া শুরু করলেন এবং এরপর বিতর পড়তেন। এতে তিনি কিয়াম (দাঁড়ানো) সংক্ষিপ্ত করতেন। অর্থাৎ দীর্ঘ কিয়ামের পরিবর্তে রাকাত সংখ্যা বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সালাফদের কেউ কেউ ৪০ রাকাত পড়তেন এবং পরে ৩ রাকাত বিতর পড়তেন।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৩/১২০)।

তিনি আরও বলেন: "উবাই ইবনে কাব (রা.) মুহাজির ও আনসারদের উপস্থিতিতে ২০ রাকাত পড়িয়েছেন এবং কেউ এর প্রতিবাদ করেননি। তাই অনেক আলেম একে সুন্নাত মনে করেন। মদীনার অধিবাসীদের প্রাচীন আমল অনুযায়ী কেউ কেউ ৩৯ রাকাত (৩৬+৩) মুস্তাহাব বলেছেন। আবার একদল আলেম আয়েশা (রা.)-এর হাদিস অনুযায়ী ১১ বা ১৩ রাকাতের বাইরে না যাওয়ার কথা বলেছেন। সঠিক কথা হলো—এসবের প্রতিটিই উত্তম (হাসান), যা ইমাম আহমাদ (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছেন। রমজানের কিয়ামের জন্য কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা নেই; কারণ নবীজী (সা.) কোনো সংখ্যা নির্দিষ্ট করে দেননি।" (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৩/১১২-১১৪)।


৩. সুন্নাহ থেকে দলিলসমূহ

১. আবু সালামাহ বিন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণিত: তিনি আয়েশা (রা.)-কে জিজ্ঞেস করলেন, রমজানে আল্লাহর রাসূল (সা.)-এর নামাজ কেমন ছিল? তিনি বললেন: "রাসূলুল্লাহ (সা.) রমজানে বা অন্য কোনো সময়ে ১১ রাকাতের বেশি পড়তেন না। তিনি ৪ রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কে তুমি জিজ্ঞেস করো না (অর্থাৎ তা ছিল অত্যন্ত দীর্ঘ ও সুন্দর)। এরপর আরও ৪ রাকাত পড়তেন, যার সৌন্দর্য ও দৈর্ঘ্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করো না। এরপর তিনি ৩ রাকাত পড়তেন।"

সূত্র: সহীহ বুখারী (২০১৩), সহীহ মুসলিম (৮৩৭)।

২. ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত: "নবীজী (সা.)-এর রাতের নামাজ ছিল ১৩ রাকাত।"

সূত্র: সহীহ বুখারী (১১৩৮), সহীহ মুসলিম (৭৬৪)।

৩. আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত: এক ব্যক্তি রাসূল (সা.)-কে রাতের নামাজ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন: "রাতের নামাজ দুই দুই রাকাত (মাছনা মাছনা)। তোমাদের কেউ যদি ফজর হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করে, তবে সে যেন এক রাকাত পড়ে নেয়, যা তার আগের পড়া নামাজকে বিতর (বেজোড়) করে দেবে।"

সূত্র: সহীহ বুখারী (৯৯০), সহীহ মুসলিম (৭৪৯)।

দলিলের যৌক্তিকতা (وجه الدلالة): নবীজী (সা.) বিতরের আগে মুসল্লি কত রাকাত পড়বে তার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেননি। (মাজমুউ ফাতাওয়া ইবনে বাজ, ১১/২৯৯)।


৪. দ্বিতীয় উৎস: ইজমা (ঐক্যমত)

অনুবাদ: ইমাম ইবনে আব্দুল বার (রহ.) এই বিষয়ে ইজমা বর্ণনা করে বলেন: "ওলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন যে, রাতের নামাজের কোনো নির্দিষ্ট সীমা বা পরিমাণ নেই। এটি একটি নফল নামাজ। সুতরাং কেউ চাইলে কিয়াম (দাঁড়ানো) দীর্ঘ করে রাকাত সংখ্যা কমাতে পারে, আবার কেউ চাইলে রুকু-সিজদা বাড়িয়ে রাকাত সংখ্যা বাড়িয়ে দিতে পারে।" (আল-ইস্তিজকার, ২/১০২, ৯৮)। কাজী ইয়াজ (রহ.) বলেন: "এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে, রাকাত সংখ্যার কোনো নির্দিষ্ট সীমা নেই যা কমানো বা বাড়ানো যাবে না। এটি একটি ফজিলতপূর্ণ নফল আমল, এতে যত রাকাত বাড়ানো হবে সওয়াব তত বাড়বে।" (ইকমালুল মুয়াল্লিম, ৩/৮২)।

ইমাম ইরাকী (রহ.) বলেন: "ওলামায়ে কেরাম একমত হয়েছেন যে, এর (রাতের নামাজের) কোনো নির্দিষ্ট সীমাবদ্ধ সংখ্যা নেই।"

সূত্র: তরাহুত তাসরীব (৩/৪৩)।


Post a Comment

0 Comments