২০২৬ সালের বর্তমান বাজারদর এবং শরীয়তের নিসাব
অনুযায়ী স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত হিসাব করার একটি পূর্ণাঙ্গ ও নির্ভরযোগ্য
নির্দেশিকা নিচে প্রদান করা হলো।
যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য সম্পদের একটি নির্দিষ্ট সীমারেখা বা 'নিসাব' অতিক্রম করা
শর্ত। বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতিতে স্বর্ণ ও রৌপ্যের মূল্যে যে পরিবর্তন এসেছে, সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের আনুমানিক গড় বাজারমূল্য ব্যবহার
করে এই হিসাবটি সাজানো হয়েছে।
১. স্বর্ণের নিসাব ও যাকাত (Gold Zakat)
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী স্বর্ণের নিসাব হলো ৮৫ গ্রাম খাঁটি স্বর্ণ (যা ২০ মিছকাল বা ৭.৫ ভরি)।
|
স্বর্ণের মান (Purity) |
আনুমানিক বর্তমান দাম (প্রতি গ্রাম) |
নিসাব (৮৫ গ্রাম খাঁটি স্বর্ণের সমমূল্য) |
|
২৪ ক্যারেট (খাঁটি) |
১২,৫০০ টাকা |
১০,৬২,৫০০ টাকা |
|
২২ ক্যারেট |
১১,৬০০ টাকা |
১০,৬২,৫০০ টাকা (খাঁটি স্বর্ণের মানদণ্ডে) |
|
২১ ক্যারেট |
১১,১০০ টাকা |
১০,৬২,৫০০ টাকা (খাঁটি স্বর্ণের মানদণ্ডে) |
|
১৮ ক্যারেট (সাদা স্বর্ণ) |
৯,৬০০ টাকা |
১০,৬২,৫০০ টাকা (খাঁটি স্বর্ণের মানদণ্ডে) |
হিসাব পদ্ধতি: আপনার কাছে যে ক্যারেটের স্বর্ণই থাকুক না কেন, আপনাকে দেখতে হবে সেটির বর্তমান বাজারমূল্য ১০,৬২,৫০০ টাকা (নিসাব)
স্পর্শ করেছে কি না। যদি করে, তবে মোট মূল্যের ২.৫% যাকাত প্রদান
করতে হবে।
২. রৌপ্য বা রূপার নিসাব (Silver Zakat)
রৌপ্যের নিসাব হলো ৫৯৫ গ্রাম খাঁটি রৌপ্য (যা ৫২.৫ ভরি বা ১৪০ তোলা)। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে রৌপ্যের নিসাব এবং স্বর্ণের নিসাবের মূল্য প্রায় সমান ছিল, কিন্তু বর্তমানে রৌপ্যের দাম অনেক কম হওয়ায় এর নিসাব সীমা অনেক নিচে।
প্রতি গ্রাম রৌপ্যের দাম (আনুমানিক): ১৮০ টাকা
রৌপ্যের নিসাব (৫৯৫ গ্রাম): ১৮০
× ৫৯৫ = ১,০৭,১০০ টাকা
বিশেষ দ্রষ্টব্য: আপনার কাছে যদি স্বর্ণ এবং রূপা উভয়টি থাকে অথবা নগদ টাকা ও
স্বর্ণ থাকে,
তবে অধিকাংশ ফকীহদের মতে রৌপ্যের নিসাব (১,০৭,১০০ টাকা) মানদণ্ড
হিসেবে ধরতে হবে। অর্থাৎ আপনার মোট সঞ্চিত সম্পদ যদি ১,০৭,১০০ টাকার বেশি হয়, তবে আপনার
ওপর যাকাত ফরজ।
৩. আধুনিক কিছু গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা (২০২৬ আপডেট)
সাদা স্বর্ণের (White Gold) ক্ষেত্রে সতর্কতা: সাদা স্বর্ণ
সাধারণত ১৮ ক্যারেটের হয়। অনেক সময় এতে রোডিয়াম বা প্লাটিনামের প্রলেপ থাকে। যাকাত
দেওয়ার সময় শুধুমাত্র এতে থাকা নিট স্বর্ণের ওজনের বর্তমান বাজারমূল্য হিসাব
করবেন।
ডায়মন্ড বা হীরা বসানো গহনা: গহনায় যদি মূল্যবান হীরা বা পাথর থাকে, তবে সেই পাথরের ওজনের ওপর যাকাত নেই। আপনি স্বর্ণকারকে দিয়ে
হীরা বা পাথর বাদ দিয়ে নিট স্বর্ণের ওজন মেপে নিয়ে সেই ওজনের ওপর যাকাত দেবেন।
যাকাত প্রদানের সময়: যাকাত হিসাব করার দিন বাজারে স্বর্ণের যে 'বিক্রয় মূল্য' (Selling Price) চলছে, সেই দাম ধরবেন। ভরি
প্রতি মজুরি (Making
charge) বা ভ্যাট যাকাতের হিসাবে আসবে না।
ঋণ বাদ দেওয়া: যদি আপনার ওপর বড় কোনো ঋণ থাকে যা দ্রুত পরিশোধ করতে হবে, তবে মোট সম্পদ থেকে সেই ঋণের পরিমাণ বাদ দিয়ে বাকি অংশের
ওপর যাকাত হিসাব করবেন।
৪. নিসাব (Nisab) এর সঠিক আর্থিক হিসাব (মার্চ ২০২৬)
যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য আপনার মোট সম্পদ নিচের যেকোনো একটি
সীমা অতিক্রম করতে হবে:
স্বর্ণের নিসাব (৮৫ গ্রাম খাঁটি স্বর্ণ):
৮৫ গ্রাম×১২,৮৫০ টাকা=১০,৯২,২৫০ টাকা
(অর্থাৎ আপনার কাছে কেবল স্বর্ণ থাকলে তার মূল্য ১০.৯২ লাখ
টাকার বেশি হতে হবে)
রৌপ্যের নিসাব (৫৯৫ গ্রাম খাঁটি রূপা):
৫৯৫ গ্রাম×১৮৫ টাকা=১,১০,০৭৫ টাকা
(অর্থাৎ আপনার কাছে যদি স্বর্ণ, নগদ টাকা ও রূপা মিলিয়ে ১.১০ লাখ টাকার বেশি থাকে, তবেই যাকাত ফরজ হবে)
৫. আপনার জন্য জরুরি কিছু পয়েন্ট (ভুল
এড়াতে):
কোন দাম ধরবেন? যাকাত হিসাব
করার সময় আপনি স্বর্ণের দোকানের 'বিক্রয় মূল্য' (যে দামে আপনি গহনা কিনেছেন) ধরবেন না। বরং আপনি যদি আজ
স্বর্ণটি বিক্রি করতে যান,
তবে দোকানদার আপনাকে 'কেনার রেট' হিসেবে যে
নিট দাম দেবে (মজুরি ও ভ্যাট বাদে), সেটিই হবে
আপনার যাকাতের ভিত্তি।
ক্যাশ ও গোল্ড মিলিয়ে হিসাব: যদি আপনার কাছে কিছু স্বর্ণ (যেমন ২ ভরি) এবং কিছু নগদ টাকা
(যেমন ৩০ হাজার টাকা) থাকে,
তবে আপনি স্বর্ণের নিসাব ধরতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে আপনাকে
রৌপ্যের নিসাব
১,১০,০৭৫ টাকা মানদণ্ড ধরতে
হবে। আপনার ২ ভরি স্বর্ণের দাম ও নগদ ৩০ হাজার যোগ করলে যদি ১.১০ লাখের বেশি হয়, তবে পুরোটার ওপর ২.৫% যাকাত দিতে হবে।
সাদা স্বর্ণের ক্যারেট: সাদা স্বর্ণ বা হোয়াইট গোল্ড সচরাচর ১৮ ক্যারেটের হয়। তাই এর
যাকাত হিসাব করার সময় এর বর্তমান বাজার মূল্য প্রতি ভরি ১,১২,৪৪০ টাকার আশেপাশে ধরে হিসাব করবেন।
হাদিস এবং ফিকহ শাস্ত্রের কিতাবসমূহে সোনা ও
রূপার যে নিসাব বর্ণিত হয়েছে, তা মূলত 'মিছকাল' এবং 'দিরহাম' এককে ছিল। আধুনিক গ্রাম বা ভরি এককে এর সঠিক হিসাব নিচে দেওয়া
হলো:
১. সোনার নিসাব (হাদিসের হিসাব অনুযায়ী)
হাদিসে বর্ণিত নিসাব: ২০ মিছকাল। গ্রামের হিসাবে: ৮৫ গ্রাম (খাঁটি স্বর্ণ)। ভরির হিসাবে: ৭.২৯ ভরি (প্রায় ৭.৫
ভরি)।
নবীজি (সা.) বলেছেন: "যতক্ষণ পর্যন্ত তোমার কাছে বিশ দিনার (মিছকাল) সোনা না থাকবে এবং তার ওপর এক
বছর অতিবাহিত না হবে,
ততক্ষণ তাতে কোনো যাকাত নেই।" (সুনানে আবু দাউদ)।
২০২৬ সালের বাজারমূল্যে হিসাব:
৮৫ গ্রাম খাঁটি সোনার দাম: ১০,৯২,২৫০ টাকা (প্রায় ১০.৯২ লাখ টাকা)।
২. রূপার নিসাব (হাদিসের হিসাব অনুযায়ী)
হাদিসে বর্ণিত নিসাব: ৫ উকিয়া বা ২০০ দিরহাম। গ্রামের হিসাবে: ৫৯৫ গ্রাম (খাঁটি রূপা)।
ভরির হিসাবে: ৫১.০১ ভরি (প্রায় ৫২.৫ ভরি)।
নবীজি (সা.) বলেছেন: "পাঁচ উকিয়ার কম (রূপার) ক্ষেত্রে কোনো যাকাত নেই।" (সহিহ বুখারী ও
মুসলিম)।
২০২৬ সালের বাজারমূল্যে হিসাব:
৫৯৫ গ্রাম খাঁটি রূপার দাম: ১,১০,০৭৫ টাকা (প্রায় ১.১০ লাখ টাকা)।
৩. আধুনিক নিয়মে যাকাতের ছক (এক নজরে)
হাদিসের এই ভরি বা গ্রামের হিসাব অনুযায়ী ২০২৬ সালে আপনার
যাকাত ফরজ হয়েছে কি না তা নিচের টেবিল থেকে দেখে নিন:
|
সম্পদের ধরণ |
নিসাবের পরিমাণ (হাদিস অনুযায়ী) |
বাজারমূল্য (প্রায়) |
যাকাতের হার |
|
সোনা (Gold) |
৭.৫ ভরি (৮৫ গ্রাম) |
১০,৯২,২৫০ টাকা |
২.৫% (৪০ ভাগের ১ ভাগ) |
|
রূপা (Silver) |
৫২.৫ ভরি (৫৯৫ গ্রাম) |
১,১০,০৭৫ টাকা |
২.৫% (৪০ ভাগের ১ ভাগ) |
জরুরি মাসআলা (সঠিক হিসাবের জন্য):
১. যদি আপনার কাছে শুধু সোনা থাকে: তবে আপনার সোনা অন্তত ৭.৫ ভরি (৮৫ গ্রাম) হতে হবে। এর
কম হলে যাকাত দিতে হবে না।
২. যদি সোনা ও নগদ টাকা দুটোই থাকে: তবে হাদিসের বিধান অনুযায়ী রূপার নিসাব ধরতে হয়। অর্থাৎ
সোনা ও নগদ টাকা মিলিয়ে যদি আপনার কাছে ১,১০,০৭৫ টাকার বেশি থাকে, তবে আপনাকে ২.৫%
হারে যাকাত দিতে হবে। (এটিই জমহুর ফকীহদের মত, যাতে
দরিদ্রদের বেশি ফায়দা হয়)।
৩. যাকাত বের করার নিয়ম: আপনার কাছে
থাকা মোট সোনার ভরিকে ৪০ দিয়ে ভাগ করলে যা আসবে, তা-ই হলো আপনার যাকাত। (যেমন: ৪০ ভরি সোনা থাকলে ১ ভরি সোনা যাকাত দিতে হবে)।
নগদ টাকা বা ব্যাংকে জমানো সম্পদের যাকাতের হিসাবও
সোনা-রূপার মতোই
২.৫% (৪০ ভাগের ১ ভাগ)।
তবে টাকার ক্ষেত্রে যাকাত ফরজ হওয়ার মানদণ্ড হিসেবে হাদিস
অনুযায়ী
রূপার নিসাবকে (Silver Nisab) ধরা হয়।
২০২৬ সালের বর্তমান বাজার দর অনুযায়ী টাকার যাকাতের
পূর্ণাঙ্গ হিসাব নিচে দেওয়া হলো:
১. টাকার নিসাব (ন্যূনতম কত টাকা থাকলে যাকাত
দিতে হয়?)
হাদিস অনুযায়ী ৫৯৫ গ্রাম বা ৫২.৫ ভরি রূপার যে দাম, সেই পরিমাণ টাকা আপনার কাছে ১ বছর জমা থাকলে
যাকাত ফরজ হয়।
২০২৬ সালের রূপার নিসাব: আনুমানিক ১,১০,০৭৫ টাকা।
নিয়ম: যদি আপনার
কাছে ১,১০,০৭৫ টাকা বা তার বেশি নগদ টাকা (ব্যাংকে বা হাতে) এক বছর
ধরে জমা থাকে,
তবে আপনার ওপর যাকাত ফরজ।
২. টাকার যাকাত বের করার সহজ নিয়মঃ
আপনার কাছে যে পরিমাণ নগদ টাকা আছে, তাকে ৪০ দিয়ে ভাগ করলেই যাকাতের
পরিমাণ বেরিয়ে আসবে। অথবা সরাসরি ২.৫%
দিয়ে গুণ করতে পারেন।
গাণিতিক সূত্র:
যাকাতের পরিমাণ=৪০ মোট টাকা
উদাহরণ স্বরূপ কিছু হিসাব:
জমানো টাকার পরিমাণ
যাকাতের পরিমাণ (২.৫%)
|
১,৫০,০০০ টাকা |
৩,৭৫০ টাকা |
|
২,০০,০০০ টাকা |
৫,০০০ টাকা |
|
৫,০০,০০০ টাকা |
১২,৫০০ টাকা |
|
১০,০০,০০০ টাকা |
২৫,০০০ টাকা |
৩. সোনা, রূপা ও টাকা যখন একসাথে থাকে
আপনার কাছে যদি শুধু টাকা না থেকে কিছু সোনা এবং কিছু টাকা
থাকে,
তবে দুটোর মূল্য যোগ করতে হবে।
উদাহরণ: আপনার কাছে ১
ভরি সোনা (১,৩৭,৪০০ টাকা) এবং নগদ ২০,০০০ টাকা
আছে।
মোট সম্পদ: ১,৩৭,৪০০ + ২০,০০০ = ১,৫৭,৪০০ টাকা।
যেহেতু এটি রূপার নিসাব (১,১০,০৭৫ টাকা) পার করেছে, তাই আপনাকে ১,৫৭,৪০০ টাকার ওপর যাকাত দিতে হবে।
যাকাত: ১,৫৭,৪০০÷৪০=৩,৯৩৫ টাকা।
৪. কোন কোন টাকার ওপর যাকাত আসবে?
ব্যাংকে জমা টাকা: সেভিংস অ্যাকাউন্ট, ডিপিএস (জমা
হওয়া কিস্তি),
বা ফিক্সড ডিপোজিট (মূল টাকা)।
হাতে থাকা নগদ: ব্যবসার ক্যাশ বাক্স বা ঘরে রাখা টাকা।
বিনিয়োগ: শেয়ার বাজার
বা বন্ডে থাকা টাকা।
পাওনা টাকা: আপনি কাউকে ধার দিয়েছেন এবং সেই টাকা ফেরত পাওয়ার নিশ্চিত সম্ভাবনা আছে।
৫. ঋণ থাকলে কী হবে?
আপনার মোট টাকা থেকে যদি কোনো জরুরি ঋণ (যা পরিশোধ করতে
হবে) থাকে,
তবে তা বাদ দিয়ে বাকি টাকার ওপর যাকাত দেবেন। যেমন: আপনার
কাছে ২ লাখ টাকা আছে কিন্তু আপনি ১ লাখ টাকা ঋণগ্রস্ত, তবে আপনি ১ লাখ টাকার যাকাত (২,৫০০ টাকা) দেবেন।
বর্তমান কারো কাছে ১ লাখ টকা আছে?
২০২৬ সালের বর্তমান বাজার দর এবং শরীয়তের বিধান অনুযায়ী এর
উত্তর নিচে দেওয়া হলো:
সংক্ষেপে উত্তর হলো: না,
বর্তমানে ১ লাখ টাকার ওপর যাকাত ফরজ নয়।
কেন নয়? (গাণিতিক কারণ)
যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য আপনার টাকা অন্তত রূপার নিসাব (৫৯৫ গ্রাম
রূপার দাম) পরিমাণ হতে হবে।
২০২৬ সালের রূপার বর্তমান দর: ১৮৫ টাকা (প্রতি গ্রাম)।
নিসাব: ৫৯৫ গ্রাম×১৮৫ টাকা=১,১০,০৭৫ টাকা।
যেহেতু আপনার কাছে আছে ১,০০,০০০ টাকা, যা নিসাব
সীমার (১,১০,০৭৫ টাকা) চেয়ে প্রায় ১০ হাজার টাকা কম, তাই এই টাকার ওপর যাকাত আসবে না।
তবে একটি বিশেষ শর্ত আছে:
যদি আপনার কাছে এই ১ লাখ টাকার পাশাপাশি অন্য কোনো সম্পদ থাকে,
তবে হিসাব বদলে যাবে।
যেমন: ১. আপনার
কাছে ১ লাখ টাকা আছে এবং সামান্য কিছু সোনা (ধরা যাক ১ আনা বা ২ আনা) আছে।
২. অথবা ১ লাখ টাকা আছে এবং কিছু রূপার
অলঙ্কার আছে।
৩. অথবা ১ লাখ টাকা আছে এবং ব্যবসার কিছু
মালপত্র (Stock)
আছে।
এই ক্ষেত্রে ১ লাখ টাকার সাথে ওই সম্পদের বাজারমূল্য যোগ হবে। যদি যোগফল ১,১০,০৭৫ টাকা পার হয়ে যায়, তবে পুরো টাকার ওপর ২.৫% (অর্থাৎ ২,৫০০ টাকা) যাকাত দিতে হবে।
সারসংক্ষেপ:
আপনার কাছে শুধুমাত্র ১ লাখ টাকা থাকলে এবং
অন্য কোনো সোনা/রূপা/ব্যবসায়িক পণ্য না থাকলে— যাকাত দিতে হবে না।
যদি ১ লাখ টাকার সাথে অন্য সম্পদ মিলিয়ে ১.১০ লাখ পার হয়—
তবে
যাকাত দিতে হবে।
ব্যবসার ক্ষেত্রে
ব্যবসায়িক পণ্যের যাকাত (যাকে ফিকহের পরিভাষায় 'যাকাত উরুদ আত-তিজারা' বলা হয়) হিসাব করার নিয়মটি সাধারণ নগদ টাকার মতোই, তবে এখানে কিছু সূক্ষ্ম বিষয় আছে।
২০২৬ সালের বাজার দর ও শরীয়তের বিধান অনুযায়ী ব্যবসার
যাকাত বের করার পদ্ধতি নিচে দেওয়া হলো:
১. ব্যবসার যাকাত কখন ফরয হয়?
আপনার ব্যবসার মালামালের মোট মূল্য যদি রূপার নিসাব (অর্থাৎ ১,১০,০৭৫ টাকা) স্পর্শ করে
এবং ব্যবসার বয়স
এক পূর্ণ হিজরি বছর হয়,
তবে আপনাকে মোট মূল্যের ওপর ২.৫% (৪০ ভাগের ১ ভাগ) যাকাত দিতে হবে।
২. ব্যবসার যাকাত হিসাব করার সূত্র
|
সম্পদের ধরণ |
হিসাব করার নিয়ম |
|
বিক্রয়যোগ্য পণ্য (Stock) |
দোকানের তাকে থাকা পণ্যের বর্তমান বাজার দর (পাইকারি দাম)। |
|
নগদ টাকা (Cash) |
ক্যাশ বাক্সে বা ব্যবসার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে থাকা টাকা। |
|
পাওনা টাকা (Receivables) |
কাস্টমারের কাছে পাওনা টাকা (যা ফেরত পাওয়ার আশা আছে)। |
|
মোট সম্পদ (ক) |
উপরে সবগুলোর যোগফল। |
|
প্রদেয় ঋণ (Liability) |
সাপ্লায়ারকে দিতে হবে এমন দেনা বা ব্যবসার তাৎক্ষণিক ঋণ। |
|
নিট সম্পদ (ক - খ) |
মোট সম্পদ থেকে ঋণ বিয়োগ করলে যা থাকে। |
যাকাত হিসাব করার দিন আপনার দোকানের বা ব্যবসার অবস্থা
নিচের ছকে ফেলুন:
যাকাতের পরিমাণ = নিট সম্পদ × ২.৫% (বা ৪০ দিয়ে ভাগ)
৩. গুরুত্বপূর্ণ কিছু নিয়ম (২০২৬ আপডেট)
পণ্যের দাম কোনটা ধরবেন? আপনি পণ্যটি যে দামে কিনেছিলেন (Cost Price) সেটি নয়, বরং যাকাত দেওয়ার দিন ওই পণ্যটি পাইকারি বাজার থেকে কিনতে যে দাম লাগত, সেই বর্তমান দামটি ধরবেন।
দোকানের আসবাবপত্র: আপনার দোকানের ডেকোরেশন, আলমারি, এসি,
কম্পিউটার, দোকানের জায়গা বা যে
ভ্যান/ট্রাক দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়া করেন—এগুলোর ওপর কোনো যাকাত নেই। যাকাত হবে শুধু সেই জিনিসের ওপর যা আপনি বিক্রির উদ্দেশ্যে রেখেছেন।
অবিক্রিত বা নষ্ট পণ্য: যে পণ্য নষ্ট হয়ে গেছে বা যা আর বিক্রি হবে না, তার ওপর যাকাত নেই।
কাঁচামাল (Raw Materials): আপনার যদি উৎপাদনমুখী ব্যবসা (যেমন ফ্যাক্টরি) হয়, তবে তৈরি পণ্য এবং কাঁচামাল (Raw Materials)—উভয়টির ওপরই যাকাত আসবে।
৪. একটি গাণিতিক উদাহরণ
ধরা যাক, আপনার একটি কাপড়ের
দোকান আছে। যাকাত হিসাবের দিন আপনার দোকানে: ১. কাপড় আছে (পাইকারি মূল্যে): ৫,০০,০০০ টাকার।
২. ক্যাশে ও ব্যাংকে আছে: ৫০,০০০ টাকা।
৩. কাস্টমারের কাছে পাওনা: ২০,০০০ টাকা।
৪. সাপ্লায়ারের কাছে দেনা (ঋণ): ৭০,০০০ টাকা।
মোট সম্পদ: ৫,০০,০০০ + ৫০,০০০ + ২০,০০০ = ৫,৭০,০০০ টাকা।
ঋণ বাদ দিয়ে নিট সম্পদ: ৫,৭০,০০০ - ৭০,০০০ = ৫,০০,০০০ টাকা।
যাকাত: ৫,০০,০০০÷৪০=১২,৫০০ টাকা।
জরুরি টিপস:
ব্যবসার যাকাত বের করার জন্য দোকানের মালামাল একদম
নিখুঁতভাবে গণনা করা কঠিন হলে, আপনি একটি সতর্কতামূলক আনুমানিক হিসাব (Safe Estimation) করবেন যাতে যাকাত কম না হয়। সামান্য বেশি হয়ে গেলে তা নফল
সদকা হিসেবে গণ্য হবে এবং আপনার সম্পদকে রক্ষা করবে।
মুদি দোকান, কাপড়ের দোকান বা ওষুধের দোকানের মতো ব্যবসার ক্ষেত্রে যাকাত হিসাব করার পদ্ধতি প্রায় একই, তবে প্রতিটি খাতের কিছু নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্য আছে। নিচে ২০২৬ সালের বাজার দর ও শরীয়তের মাসআলাঃ
যাকাত হিসাব করার মূল ফর্মুলা:
দোকানে বিক্রির উদ্দেশ্যে রাখা মালামালের বর্তমান পাইকারি মূল্য + নগদ টাকা
+ পাওনা টাকা। এই যোগফল থেকে দোকানের ঋণ বাদ দিলে যা থাকে, তার ওপর ২.৫% (৪০ ভাগের ১ ভাগ) যাকাত দিতে
হবে।
১. মুদি দোকান (Grocery Store):
যাকাত হবে: চাল, ডাল,
তেল,
চিনি, সাবান বা বিস্কুটের
প্যাকেট—অর্থাৎ যা আপনি বিক্রি করেন তার ওপর।
যাকাত হবে না: দোকানের ফ্রিজ,
পাল্লা (ওজন মাপার যন্ত্র), তাকে লাগানো ডেকোরেশন এবং খালি কার্টন বা বোতলের ওপর।
টিপস: মুদি দোকানে
অনেক আইটেম থাকে। নিখুঁত হিসাব সম্ভব না হলে একটি মোটামুটি ধারণা (Estimation) করে হিসাব করবেন যাতে যাকাত কম না হয়।
২. কাপড়ের দোকান (Clothing Store):
যাকাত হবে: থান কাপড়, তৈরি পোশাক বা লুঙ্গি-শাড়ির স্টকের ওপর।
যাকাত হবে না: দোকানের মান mannequin
(পুতুল), হ্যাঙ্গার, আয়না, এসি এবং ট্রায়াল
রুমের আসবাবপত্রের ওপর।
দাম: কাপড় যে দামে
কিনেছেন তা নয়,
বরং বর্তমানে ওই কাপড়টি পাইকারি বাজার থেকে কিনতে যে দাম
লাগত (Current
Wholesale Price), সেই দাম ধরবেন।
৩. ওষুধের দোকান (Pharmacy):
যাকাত হবে: সব ধরণের
ওষুধ এবং বিক্রির জন্য রাখা সার্জিক্যাল আইটেমের ওপর।
যাকাত হবে না: ওষুধের ফ্রিজ,
এসি এবং আলমারির ওপর।
সতর্কতা: যে ওষুধগুলোর
মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে (Expired),
সেগুলোর ওপর যাকাত আসবে না।
৪. হার্ডওয়্যার ও ইলেকট্রনিক্স (Hardware &
Electronics):
যাকাত হবে: রড, সিমেন্ট, তার, বাল্ব, ফ্যান, লোহা বা যন্ত্রপাতির স্টকের ওপর।
যাকাত হবে না: পণ্য আনা-নেওয়ার ট্রাক বা ভ্যান এবং দোকানের বড় র্যাকের ওপর।
৫. জুতার দোকান (Shoe Store):
যাকাত হবে: শো-কেসে এবং
গুদামে রাখা সব ধরণের জুতা,
মোজা বা পলিশের ওপর।
যাকাত হবে না: জুতা ট্রায়াল দেওয়ার সোফা, আয়না বা কার্পেটের
ওপর।
হিসাব করার একটি কাল্পনিক উদাহরণ (২০২৬ সালের দর অনুযায়ী):
ধরা যাক, আপনার একটি ওষুধের দোকান আছে। বছর শেষে আপনার অবস্থা নিম্নরূপ:
১. ওষুধের মোট মূল্য (পাইকারি দরে): ৪,০০,০০০ টাকা ।
২. ক্যাশ বাক্সে ও ব্যাংকে আছে: ২০,০০০ টাকা।
৩. কাস্টমারের কাছে পাওনা: ১০,০০০ টাকা।
৪. কোম্পানির কাছে আপনার দেনা (ঋণ): ৩০,০০০ টাকা।
মোট সম্পদ: ৪,০০,০০০ + ২০,০০০ + ১০,০০০ = ৪,৩০,০০০ টাকা।
নিট সম্পদ (ঋণ বাদ দিয়ে): ৪,৩০,০০০ - ৩০,০০০ = ৪,০০,০০০ টাকা।
যাকাত: ৪,০০,০০০÷৪০=১০,০০০ টাকা।
জরুরি কিছু পয়েন্ট:
নিসাব: আপনার
দোকানের নিট সম্পদ (মালামাল + ক্যাশ) যদি ১,১০,০৭৫ টাকা (২০২৬-এর রূপার নিসাব) পার করে, তবেই যাকাত দিতে হবে।
সময়: প্রতি বছর
একটি নির্দিষ্ট দিন (যেমন ১লা রমজান) দোকানের হিসাব করবেন।
ভ্যাট ও লাভ: হিসাব করার সময় খুচরা বিক্রয় মূল্য (MRP) ধরবেন না,
বরং আপনার কেনা দাম বা পাইকারি দাম ধরবেন। ভ্যাট বা ট্যাক্স
যাকাতযোগ্য মূল্যে অন্তর্ভুক্ত হবে না।
যাকাত কখন শুরু হয় এবং কত টাকার ওপর দিতে হয়, তা নিয়ে অনেকেরই এই সংশয় থাকে। ২০২৬ সালের বর্তমান বাজার দর (রূপার নিসাব) অনুযায়ী আপনার প্রশ্নের উত্তর নিচে বুঝিয়ে দিচ্ছি:
১. আপনার কাছে যদি ঠিক ১,১০,০৭৫ টাকা থাকে:
যেহেতু ২০২৬ সালের মার্চ মাসে রূপার নিসাব বা সর্বনিম্ন সীমা হলো ১,১০,০৭৫ টাকা, তাই আপনার কাছে যদি ঠিক এই টাকাটি (বা এর বেশি, যেমন ১ লাখ ২০ হাজার টাকা) এক বছর ধরে জমা থাকে, তবে আপনার ওপর যাকাত ফরয।
২. ১ লাখ ২০ হাজার টাকা থাকলে কত যাকাত হবে?
আপনার উদাহরণ অনুযায়ী ১ লাখ ২০ হাজার টাকার যাকাত হবে:
১,২০,০০০÷৪০=৩,০০০ টাকা
(অর্থাৎ প্রতি ১ লাখে ২,৫০০ টাকা এবং বাকি ২০ হাজারে ৫০০ টাকা, মোট ৩,০০০ টাকা)
৩. ১ লাখ ২০ হাজার টাকার 'কম' হলে কি হবে?
এখানেই শরীয়তের আসল সীমা (Borderline):
যদি ১,১০,০৭৬ টাকা থাকে: যাকাত দিতে হবে (কারণ নিসাব পার হয়েছে)।
যদি ১,০৯,০০০ টাকা থাকে: যাকাত দিতে হবে না (যদি আপনার কাছে অন্য কোনো সোনা বা রূপা না থাকে), কারণ এটি নিসাব সীমার নিচে।
৪. একটি বিশেষ সতর্কতা (ভুল এড়াতে):
আপনি যদি মনে করেন আপনার কাছে শুধু ১ লাখ ২০ টাকা (একশ বিশ টাকা) আছে, তবে তাতে যাকাত আসবে না। কিন্তু আপনি যদি ১ লাখ ২০ হাজার টাকা (১,২০,০০০) বুঝিয়ে থাকেন, তবে নিচের শর্তটি মনে রাখবেন:
শর্ত: এই টাকাটি
আপনার হাতে বা ব্যাংকে এক বছর (চাঁদের
হিসাবে ৩৫৪ দিন) স্থায়ী থাকতে হবে।
যদি আজ আপনার কাছে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা আসে এবং কালকে বা এক মাস পর তা খরচ হয়ে যায়, তবে তার ওপর যাকাত আসবে না। বছর শেষে হিসাবের দিনে আপনার
কাছে কত টাকা অবশিষ্ট আছে,
সেটিই আসল।



0 Comments