সোনা বা রূপার ক্ষেত্রে 'কম বা বেশি' হওয়ার বিষয়টি শরীয়তের নিসাব (ন্যূনতম সীমা)
অনুযায়ী বুঝতে হবে।
নিচে ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী সোনা ও রূপার সেই সীমানাগুলো
পরিষ্কার করে দিচ্ছি:
১. সোনার ক্ষেত্রে (যদি শুধু সোনাই থাকে)
হাদিস অনুযায়ী সোনার নিসাব হলো ৭.৫ ভরি (বা ৮৫ গ্রাম)।
এক রতি কম হলে: আপনার কাছে যদি ৭.৪ ভরি সোনা থাকে (এবং অন্য কোনো সম্পদ না থাকে), তবে আপনার ওপর যাকাত ফরয নয়।
এক রতি বেশি হলে: যদি ৭.৫ ভরি বা তার বেশি (যেমন ৮ ভরি) সোনা থাকে, তবে পুরো সোনার ওপর ২.৫%
যাকাত দিতে হবে।
সহজ হিসাব: ৭.৫ ভরি ২২
ক্যারেট সোনার বর্তমান দাম প্রায় ১০,৩০,৫০০ টাকা। এই টাকার নিচে সোনা থাকলে যাকাত নেই।
২. রূপার ক্ষেত্রে (যদি শুধু রূপাই থাকে)
রূপার নিসাব হলো ৫২.৫ ভরি (বা ৫৯৫ গ্রাম)।
এক রতি কম হলে: আপনার কাছে যদি ৫২ ভরি রূপা থাকে, তবে যাকাত ফরয নয়।
এক রতি বেশি হলে: ৫২.৫ ভরি বা তার বেশি থাকলে পুরোটার ওপর ২.৫% যাকাত দিতে
হবে।
সহজ হিসাব: ৫২.৫ ভরি
রূপার বর্তমান দাম প্রায় ১,১০,০৭৫ টাকা। এর নিচে থাকলে যাকাত নেই।
৩. সবচেয়ে জরুরি মাসআলা: যখন সোনা ও রূপা 'উভয়টি' অল্প অল্প থাকেঃ
এখানেই অধিকাংশ মানুষ ভুল করেন। আপনার কাছে যদি নিসাব
পরিমাণ সোনা (৭.৫ ভরি) না থাকে, কিন্তু কিছু সোনা এবং কিছু রূপা (বা নগদ টাকা) মিলিয়ে থাকে, তবে হিসাব
বদলে যাবে।
ধরা যাক: আপনার কাছে
মাত্র
১ ভরি সোনা আছে (যা
নিসাব ৭.৫ ভরির চেয়ে অনেক কম)।
কিন্তু: আপনার কাছে
পাশাপাশি
১,০০,০০০ (এক লাখ) টাকা বা কিছু রূপার গয়না আছে।
ফলাফল: এখন ১ ভরি
সোনার দাম (প্রায় ১,৩৭,৪০০ টাকা) + নগদ ১,০০,০০০ টাকা = ২,৩৭,৪০০ টাকা।
যেহেতু এই যোগফল রূপার নিসাব (১,১০,০৭৫ টাকা) পার করে ফেলেছে, তাই এখন আপনার ওপর যাকাত ফরয হয়ে যাবে।
সারকথা: আপনার কাছে যদি সোনা ও রূপা আলাদাভাবে নিসাব পরিমাণ নাও থাকে, কিন্তু দুইটার মোট দাম যদি ১,১০,০৭৫ টাকার বেশি হয়, তবে আপনাকে
পুরোটার ওপর ২.৫% যাকাত দিতে হবে।
১. সোনার বদলে রূপার নিসাব ধরা কেন উত্তম?
ইসলামী শরিয়তে যাকাত ফরজ হওয়ার দুটি মানদণ্ড বা নিসাব আছে:
সোনার নিসাব: ৮৫ গ্রাম (৭.৫ ভরি),
যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০,৯২,২৫০ টাকা।
রুপার নিসাব: ৫৯৫ গ্রাম (৫২.৫ ভরি),
যার বর্তমান বাজারমূল্য মাত্র ১,১০,০৭৫ টাকা।
এখন দেখুন, যদি কোনো ব্যক্তির কাছে ৩ ভরি সোনা থাকে (যার দাম প্রায় ৪ লাখ টাকা), সে যদি শুধু সোনার নিসাব হিসাব করে, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে না (কারণ ৭.৫ ভরি নেই)। কিন্তু সে যদি রুপার নিসাব হিসাব করে, তবে তার ওপর যাকাত ফরজ হবে (কারণ ৪ লাখ টাকা ১.১০ লাখের চেয়ে অনেক বেশি)।
ফকীহদের অভিমত: জমহুর বা অধিকাংশ আলেমদের মতে, যখন কারো
কাছে সোনা ও রূপা (বা নগদ টাকা) মিলিয়ে থাকে, তখন রুপার নিসাব অনুযায়ী হিসাব করাই উত্তম। কারণ এতে দরিদ্রদের বেশি উপকার হয় এবং এটিই অধিকতর
নিরাপদ।
২. আপনার কাছে যদি শুধু রূপা থাকে:
যদি আপনার কাছে সোনা একেবারেই না থাকে, শুধু রূপা থাকে, তবে নিয়মটি
খুবই সহজ:
আপনার রূপার পরিমাণ যদি ৫২.৫ ভরি (৫৯৫ গ্রাম) বা তার বেশি হয়, তবে তার ওপর
যাকাত ফরজ।
২০২৬ সালের বাজার দর অনুযায়ী ৫২.৫ ভরি রূপার দাম ১,১০,০৭৫ টাকা।
আপনার কাছে যদি এর বেশি রূপা থাকে, তবে মোট রূপার ২.৫%
বা বর্তমান বাজার মূল্যের ৪০ ভাগের ১ ভাগ টাকা যাকাত হিসেবে
দিয়ে দেবেন।
৩. সোনার পরিবর্তে রূপার মূল্য হিসাবে হিসাব করার পদ্ধতি:
আপনার কাছে যদি ১ ভরি সোনা থাকে (যাকাতের নিসাব ৮৫ গ্রামের
চেয়ে অনেক কম),
কিন্তু আপনি চাচ্ছেন সেই ১ ভরির যাকাত দিতে, তবে নিয়মটি হবে এমন:
১ ভরি সোনার বর্তমান বাজার মূল্য বের করুন (ধরি ১,৩৭,৪০০ টাকা)।
দেখুন এই টাকাটি রূপার নিসাবের (১,১০,০৭৫ টাকা) চেয়ে বেশি কি না।
যেহেতু এটি বেশি, তাই আপনি এই
১ ভরি সোনার মূল্যের ওপর ২.৫% যাকাত দেবেন।
হিসাব: ১,৩৭,৪০০÷৪০=৩,৪৩৫ টাকা।
সারকথা:
আপনার কাছে সোনা নিসাব পরিমাণ (৭.৫ ভরি) না থাকলেও, যদি আপনার সোনা বা রূপার মোট মূল্য ১,১০,০৭৫ টাকার বেশি হয়, তবে আপনি
অবশ্যই রূপার নিসাবকে মানদণ্ড ধরে যাকাত আদায় করবেন। এতে আপনার সম্পদ পবিত্র হবে
এবং ইনশাআল্লাহ আল্লাহ কবুল করবেন।
নির্ভরযোগ্য কিতাব ও হাদিস থেকে রেফারেন্স
নম্বরসহ নিচে দেওয়া হলো
১. সোনা ও রূপার নিসাব (হাদিসের রেফারেন্স)
সোনার নিসাব (২০ মিছকাল/৮৫ গ্রাম):
"যখন তোমার কাছে ২০ দিনার (মিছকাল) সোনা থাকবে এবং তার ওপর
এক বছর অতিবাহিত হবে,
তখন তাতে অর্ধেক দিনার যাকাত ওয়াজিব হবে।"
রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৫৭৩; সুনানে দারা কুতনী, হাদিস নং: ১৯০৯। (ইমাম নববী একে 'হাসান' বলেছেন)।
রুপার নিসাব (৫ উকিয়া/৫৯৫ গ্রাম):
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "পাঁচ উকিয়ার কম (রুপার)
ক্ষেত্রে কোনো যাকাত নেই।"
রেফারেন্স: সহিহ বুখারী,
হাদিস নং: ১৪৪৭; সহিহ মুসলিম,
হাদিস নং: ৯৭৯; সুনানে নাসায়ী,
হাদিস নং: ২৪৪৪।
২. ব্যবসার পণ্যের যাকাত (রেফারেন্স)
ব্যবসায়িক পণ্যের ওপর যাকাত যে ফরজ, তার মূল দলীল হলো:
সামুরা বিন জুনদুব (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "রাসূলুল্লাহ (সা.) আমাদের নির্দেশ দিতেন
যেন আমরা সেই সম্পদ থেকে যাকাত আদায় করি যা আমরা বিক্রির জন্য প্রস্তুত করি।"
রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৫৬২; আল-মুজামুল কাবীর (তাবারানি), হাদিস নং: ৬৮৩৮।
৩. সোনা ও রূপার মূল্য মিলিয়ে নিসাব হিসাব করা (রেফারেন্স)
যখন কারো কাছে সোনা ও রূপা বা নগদ টাকা পৃথকভাবে নিসাব
পরিমাণ থাকে না,
তখন সব মিলিয়ে রূপার নিসাব (৫৯৫ গ্রাম) ধরা হয়। এটি
জমহুর বা অধিকাংশ ফকীহদের অভিমত।
রেফারেন্স: আল-মাজমু’ (ইমাম নববী), খণ্ড: ৫,
পৃষ্ঠা: ৫০৫; আল-মুগনী (ইবনে কুদামাহ), খণ্ড: ৩,
পৃষ্ঠা: ১৪; বাদায়েউস সানায়ে (কাসানী), খণ্ড: ২,
পৃষ্ঠা: ১৯।
৪. আধুনিক মুদ্রার (টাকা/রিয়াল) যাকাত (রেফারেন্স)
নগদ টাকা বা কারেন্সি নোটকে শরীয়তের পরিভাষায় 'আশ-শামান' (মূল্যমান) বলা হয়।
এর যাকাত সোনা-রুপার বিধানেরই অন্তর্ভুক্ত।
"বর্তমান যুগের নোট বা কাগজের মুদ্রা সোনা ও রূপার
স্থলাভিষিক্ত। এর ওপর যাকাত ওয়াজিব হবে যখন তা রূপার নিসাব (৫৯৫ গ্রাম) পরিমাণ
মূল্য স্পর্শ করবে।"
রেফারেন্স: মাজমাউল ফিকহ আল-ইসলামী (OIC), রেজোলিউশন নং: ২১ (৯/৩); ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (সৌদি আরব), খণ্ড: ৯,
পৃষ্ঠা: ২৫৭।
৫. ৪০ ভাগের ১ ভাগ (২.৫%) যাকাতের হার (রেফারেন্স)
যাকাত যে আড়াই শতাংশ বা ৪০ ভাগের ১ ভাগ হবে, তার প্রমাণ:
"রূপার ক্ষেত্রে প্রতি ৪০ দিরহামে ১ দিরহাম যাকাত (অর্থাৎ
২.৫%)।"
রেফারেন্স: সহিহ বুখারী,
হাদিস নং: ১৪৫৪ (যাকাত অধ্যায়); সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১৭৯১।
সারসংক্ষেপ (আপনার প্রশ্নের উত্তরে):
"সোনার পরিবর্তে রূপার মূল্য হিসাবে যাকাত দেওয়া যাবে
কি না"—তার শক্তিশালী রেফারেন্স হলো 'আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ' (খণ্ড: ২৩, পৃষ্ঠা: ২৬৯)।
সেখানে স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, ফকির-মিসকিনদের
স্বার্থ বিবেচনা করে যে নিসাবটি ধরলে তাদের বেশি উপকার হয়, সেটি ধরাই উত্তম।
প্রশ্নের উত্তর হলো:
হ্যাঁ, বর্তমান যুগে
অধিকাংশ ফকীহ ও শরীয়াহ বোর্ডের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এটিই সঠিক পদ্ধতি এবং এতেই
দরিদ্রদের বেশি উপকার হয়।
নিচে এর শরয়ী প্রমাণ (Evidence) এবং যৌক্তিক রেফারেন্সসমূহ তুলে ধরা
হলো:
১. সোনা ও রূপার মূল্য মিলিয়ে নিসাব ধরার শরয়ী ভিত্তি:
যখন কারো কাছে সোনা নিসাব পরিমাণ (৭.৫ ভরি) থাকে না, কিন্তু কিছু সোনা এবং কিছু নগদ টাকা বা রূপা থাকে, তখন সবগুলোকে যোগ করে রূপার নিসাব (৫৯৫ গ্রাম বা ৫২.৫ ভরি) ধরা হয়।
দলিল ও রেফারেন্স:
ইমাম কাসানী (রহ.)-এর বক্তব্য: "সোনা ও রূপা যখন পৃথকভাবে নিসাব পরিমাণ না থাকে, তখন সেগুলোকে একে অপরের সাথে মিলিয়ে (মূল্য হিসেবে) নিসাব
পূর্ণ করা হবে।"
রেফারেন্স: বাদায়েউস সানায়ে (২/১৯), কিতাবুজ যাকাত।
ফাতাওয়ায়ে শামী (ইবনে আবেদীন): "যদি কারো কাছে সোনা ও রূপা উভয়টি থাকে এবং কোনোটিই এককভাবে
নিসাব পরিমাণ না হয়,
তবে সেগুলোকে 'মূল্য' (Value) হিসেবে একত্রিত করে নিসাব পূর্ণ করতে হবে।"রেফারেন্স: রাদ্দুল মুহতার (২/৩০০), যাকাত অধ্যায়।
আল-মাজমু’ (ইমাম নববী): ইমাম নববী (রহ.) উল্লেখ করেছেন যে, জমহুর বা অধিকাংশ ফকীহদের মতে সোনা ও রূপাকে একে অপরের সাথে
মিলিয়ে নিসাব হিসাব করা ওয়াজিব।
রেফারেন্স: আল-মাজমু’ (৫/৫০৫)।
২. কেন রূপার নিসাবকে (৫২.৫ ভরি) মানদণ্ড ধরা
হয়?
বর্তমানে সোনা ও রূপার দামের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য।
সোনার নিসাব (১০.৯২ লাখ টাকা) ধরলে খুব কম মানুষ যাকাত দেবে, ফলে দরিদ্ররা বঞ্চিত হবে। কিন্তু রূপার নিসাব (১.১০ লাখ
টাকা) ধরলে অনেক মানুষ যাকাতের আওতায় আসবে।
শরয়ী নীতি (Legal Maxim): "মা কানা আনফাউ লিল-ফুক্বারা"— অর্থাৎ, "যে পদ্ধতিতে দরিদ্রদের বেশি উপকার হয়, সেটিই গ্রহণ করা হবে।"
রেফারেন্স: আল-মাওসূআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়েতিয়্যাহ (খণ্ড: ২৩, পৃষ্ঠা: ২৬৯)। এখানে বলা হয়েছে,
সোনা ও রূপার মিশ্রিত সম্পদের ক্ষেত্রে রূপার নিসাব ধরা
উত্তম কারণ এতে ফকির-মিসকিনদের হক বেশি আদায় হয়।
৩. আধুনিক ফতোয়া ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড
বর্তমানে কাগজের মুদ্রা (টাকা, রিয়াল, ডলার) যেহেতু সোনা ও
রূপার স্থলাভিষিক্ত,
তাই এর নিসাব নির্ধারণে রূপাকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়।
ইসলামী ফিকহ একাডেমি (OIC): জেদ্দায় অনুষ্ঠিত সভায় সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে যে, কাগজের মুদ্রার যাকাত নির্ধারণের ক্ষেত্রে সোনা বা
রূপা—যেকোনো একটির নিসাব স্পর্শ করলেই যাকাত দিতে হবে। তবে বর্তমান যুগে রূপার
নিসাব ধরায় দরিদ্রদের স্বার্থ সংরক্ষিত হয়।
রেফারেন্স: মাজমাউল ফিকহ আল-ইসলামী, রেজোলিউশন নং: ২১ (৯/৩)।
ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (সৌদি আরব): > "নগদ টাকার যাকাত ওয়াজিব হবে যখন তা সোনা বা রূপার মধ্যে
যেটি কম মূল্যের (বর্তমানে রূপা), তার নিসাব পরিমাণ
হবে।"
রেফারেন্স: ফাতাওয়া আল-লাজনাহ আদ-দাইমাহ (৯/২৫৭)।



0 Comments