সোনা বা রূপার ক্ষেত্রে 'কম বা বেশি' হওয়া, আধুনিক মুদ্রার (টাকা/রিয়াল) যাকাত , পার্ট-০২
যাকাত কাদের দেওয়া যাবে?
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী যাকাত কাদের দেওয়া যাবে, তা মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে সুনির্দিষ্টভাবে আটটি খাতের কথা উল্লেখ করে দিয়েছেন। এই নির্দিষ্ট আটটি খাত ছাড়া অন্য কোথাও যাকাত দিলে তা আদায় হবে না।
নিচে কুরআন ও হাদিসের রেফারেন্স নম্বরসহ বিস্তারিত তালিকা
দেওয়া হলো:
যাকাতের আটটি খাত (পবিত্র কুরআনের আলোক)
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন:
"নিশ্চয়ই সদকা (যাকাত) হচ্ছে—
১. ফকীর, ২. মিসকীন, ৩. যাকাত আদায়কারী কর্মচারী, ৪. যাদের অন্তর জয় করা প্রয়োজন (নওমুসলিম), ৫. দাসমুক্তি, ৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি, ৭. আল্লাহর পথে (জিহাদ/দ্বীনের কাজে) এবং ৮. মুসাফিরদের জন্য। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।"রেফারেন্স: সূরা আত-তাওবাহ, আয়াত নং: ৬০।
খাতগুলোর বিস্তারিত ব্যাখ্যা ও রেফারেন্স:
১. ফকীর(Poor): যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ নেই অর্থাৎ, তার ঘর আছে
বা সামান্য আয় আছে,
কিন্তু সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছে।
২. মিসকীন(Needy): যার কাছে কিছুই নেই/ যার একদমই
কোনো সম্পদ নেই ,
অত্যন্ত অভাবী কিন্তু আত্মসম্মানের ভয়ে মানুষের কাছে হাত
পাতে না।
রেফারেন্স: সহিহ বুখারী,
হাদিস নং: ১৪৭৯; সহিহ মুসলিম,
হাদিস নং: ১০৩৯ (মিসকীনের সংজ্ঞা সম্পর্কে)।
৩. যাকাত কর্মচারী: ইসলামী রাষ্ট্র কর্তৃক যাকাত সংগ্রহ ও বণ্টনের কাজে নিয়োজিত
ব্যক্তি। তাদের বেতন যাকাতের তহবিল থেকে দেওয়া যায়।
৪. অন্তর জয় করার জন্য: মূলত যারা নতুন ইসলাম গ্রহণ করেছেন বা যাদের ইসলামের প্রতি
আকৃষ্ট করা প্রয়োজন। এবং আর্থিকভাবে
সংকটে আছেন
এই অর্থ ব্যয় করা যায়।
রেফারেন্স: আল-মাজমু’ (ইমাম নববী), খণ্ড: ৬,
পৃষ্ঠা: ১৮৩; ফাতাওয়া শামি,
খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৩৯।
৫. দাসমুক্তি: বর্তমানে গোলাম বা দাস প্রথা নেই, তবে অন্যায়ভাবে বন্দি বা মুক্তিপণের জন্য বন্দি মুসলিমদের মুক্ত করতে এই অর্থ ব্যয় করা যায়।
৬. ঋণগ্রস্ত ব্যক্তি: যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজনে ঋণ করে, করে এখন তা পরিশোধ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম। অথবা-
যে ব্যক্তি বৈধ প্রয়োজনে ঋণ করে তা পরিশোধ করতে অক্ষম। (তবে
বিলাসিতা,
কোনো হারাম কাজে ঋণ করলে তাকে যাকাত দেওয়া যাবে না)।
রেফারেন্স: সহিহ মুসলিম,
হাদিস নং: ১৫৫৬; আল-মুগনী (ইবনে কুদামাহ), খণ্ড: ৪,
পৃষ্ঠা: ৯৪।
৭. আল্লাহর পথে(Fi-Sabilillah): ইসলামের
দাওয়াত,
প্রচার-প্রসার এবং ইসলামী ভূখণ্ড রক্ষার কাজে (জিহাদে)
নিয়োজিত ব্যক্তিদের জন্য। অধিকাংশ ফকীহদের মতে, ইলমে দ্বীন
বা শরয়ী জ্ঞান অর্জনকারী গরীব ছাত্রদেরও এই খাতে যাকাত দেওয়া যায়।
রেফারেন্স: তাফসীরে ইবনে কাসীর, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ১৬৬; বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৪।
৮. মুসাফির: কোনো ব্যক্তি সফরে গিয়ে অর্থাভাবে পড়লে, যদিও তার নিজ
দেশে সম্পদ থাকে,
তবুও তাকে পথখরচের জন্য যাকাত দেওয়া যাবে।
যাকাত কাদের দেওয়া 'হারাম' বা নিষেধ?
(রেফারেন্সসহ)
১. নিজস্ব পরিবার: বাবা-মা, দাদা-দাদি, নানা-নানি
(উর্ধ্বতন) এবং ছেলে-মেয়ে,
নাতি-নাতনি (অধস্তন) এবং স্ত্রীকে যাকাত দেওয়া যাবে না।
কারণ তাদের ভরণ-পোষণ আপনার ওপর ওয়াজিব।
রেফারেন্স: আল-ইজমা (ইবনে
মুনযির),
পৃষ্ঠা: ৪০; ফাতাওয়া
আলমগিরি,
খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৮৯।
২. ধনী ব্যক্তি: নিসাব পরিমাণ
সম্পদের মালিক এমন ধনী ব্যক্তিকে যাকাত দেওয়া বৈধ নয়।
রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৬৩৩; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ৬৫৭।
৩. রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বংশধর (বনু হাশিম): নবী পরিবারের জন্য যাকাত নেওয়া হারাম।
রেফারেন্স: সহিহ মুসলিম,
হাদিস নং: ১০৭২।
৪. অমুসলিম:
যাকাত শুধুমাত্র মুসলিমদের প্রাপ্য। অমুসলিমদের জন্য নফল
সদকা করা যায়।
রেফারেন্স: সহিহ বুখারী,
হাদিস নং: ১৩৯৫ (হাদিস: 'তাদের ধনীদের থেকে গ্রহণ করো এবং তাদের দরিদ্রদের ফিরিয়ে
দাও')।
জরুরি পরামর্শ: যাকাত দেওয়ার ক্ষেত্রে নিজের দরিদ্র ভাই-বোন, চাচা-ফুপু বা খালা-মামাদের অগ্রাধিকার দেওয়া উত্তম (যদি তারা যাকাত খাওয়ার
যোগ্য হয়)। এতে যাকাতও আদায় হবে এবং আত্মীয়তার হকও রক্ষা হবে।
রেফারেন্স: সুনানে তিরমিজি,
হাদিস নং: ৬৫৭ (আত্মীয়কে সদকা করলে দ্বিগুণ সওয়াব)।
৩. ২০২৬ সালের সামাজিক কাঠামোয় অগ্রাধিকার তালিকা
যাকাত দেওয়ার সময় শরীয়াহসম্মতভাবে নিচের ক্রমানুসারে দেওয়া
অধিক সওয়াবের:
অভাবী নিকটাত্মীয়: ভাই-বোন, চাচা-ফুপু, খালা-মামাদের মধ্যে যারা যাকাতযোগ্য। (বাবা-মা ও সন্তানদের দেওয়া
যাবে না)।
(আত্মীয়কে যাকাত দিলে দ্বিগুণ সওয়াব; একটি যাকাতের, অন্যটি
আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষার)। রেফারেন্স: সুনানে
তিরমিজি,
হাদিস নং: ৬৫৭।
প্রতিবেশী: আপনার পাশের
বাড়ির কোনো পরিবার যারা অভাব গোপন করে চলছে।
দ্বীনি প্রতিষ্ঠান: মাদরাসার লিল্লা ফান্ড বা যেখানে এতিম-মিসকীন ছাত্ররা থাকে।
অসহায় বিধবা ও এতিম শিশু।
ইসলামী শরীয়ত এবং আরবী ভাষার পরিভাষায় ফকীর, মিসকীন এবং ভিখারি (সায়েল)—এই তিনটি শব্দের অর্থের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু
অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালের বর্তমান সামাজিক প্রেক্ষাপটে এদের চেনার উপায় নিচে বিস্তারিত
দেওয়া হলো:
১. ফকীর (The Poor)
ফকীর শব্দটি 'ফাক্বর' থেকে এসেছে, যার অর্থ
মেরুদণ্ড ভেঙে যাওয়া। শরীয়তের পরিভাষায় ফকীর হলো সেই ব্যক্তি:
অবস্থা: যার কাছে
সামান্য কিছু সম্পদ বা সামান্য আয় আছে, কিন্তু তা
তার মৌলিক প্রয়োজন (খাবার,
পোশাক, বাসস্থান) মেটানোর
জন্য যথেষ্ট নয়।
নিসাব: যার কাছে
নিসাব পরিমাণ সম্পদ (১,১০,০৭৫ টাকা) নেই।
উদাহরণ: ধরুন একজনের মাসে খরচ ২০ হাজার টাকা, কিন্তু সে কামাই করে ৮ হাজার টাকা। এই ব্যক্তিটি 'ফকীর'। সে মানুষের কাছে হাত পাতে না, কিন্তু সে অভাবী।
২. মিসকীন (The Needy):
মিসকীন শব্দটি 'সুকুন' থেকে এসেছে, যার অর্থ
স্থির হয়ে যাওয়া। অর্থাৎ অভাবের তাড়নায় যার নড়াচড়ার শক্তিও নেই।
অবস্থা: যার কাছে
কিছুই নেই। যে আজ খেলে কাল কী খাবে তা জানে না। ফকীরের চেয়ে মিসকীনের অবস্থা বেশি
খারাপ।
চেনার উপায়: এরা সাধারণত আত্মসম্মানের কারণে মানুষের কাছে হাত পাতে না। সাদা পোশাকে ঘুরে
বেড়ায়,
ফলে মানুষ তাদের ধনী মনে করে সদকা দেয় না।
রেফারেন্স: রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "মিসকীন সেই ব্যক্তি নয় যে মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘোরে এবং এক লোকমা বা দুই লোকমা খাবারের জন্য হাত পাতে। বরং মিসকীন সেই ব্যক্তি যার সামর্থ্য নেই অথচ সে মানুষের কাছে কিছু চায় না যে তাকে সদকা দেওয়া হবে এবং মানুষ তার অভাব বুঝতেও পারে না।" (সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ১৪৭৯; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০৩৯)
৩. ভিখারি বা যাঞ্চাকারী (The Beggar):
কুরআনের ভাষায় এদের বলা হয় 'সায়েল'। এটি কোনো শরীয়তি স্তর নয়, বরং এটি একটি কাজ বা স্বভাব।
অবস্থা: যে ব্যক্তি
মানুষের কাছে হাত পাতে বা সাহায্য চায়, সে-ই সায়েল
বা ভিখারি।
পার্থক্য: একজন ভিখারি
ফকীর হতে পারে,
আবার সে পেশাদার ভিখারি (ধনী) ও হতে পারে। ইসলামে সামর্থ্য
থাকা সত্ত্বেও ভিক্ষা করাকে অত্যন্ত গর্হিত কাজ বলা হয়েছে।
রেফারেন্স: আল্লাহ তাআলা
বলেছেন:
"আর সাহায্যপ্রার্থী (সায়েল) ও বঞ্চিতদের (মাহরুম) জন্য
তাদের (ধনীদের) সম্পদে হক রয়েছে।" (সূরা আজ-যারিয়াত, আয়াত: ১৯)
২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে আপনার করণীয়:
যাকাত দেওয়ার সময় আমাদের সমাজে 'মিসকীন' খুঁজে বের
করা সবচেয়ে কঠিন কিন্তু সবচেয়ে সওয়াবের কাজ। কারণ তারা লাইনে দাঁড়িয়ে যাকাত
নেয় না।
আপনার এমন কোনো আত্মীয় বা প্রতিবেশী কি আছে যারা খুব কষ্টে
চলে কিন্তু কাউকে বলে না?
তারা হলো মিসকীন।
আপনার পরিচিত কোনো নিম্ন আয়ের মানুষ (যেমন ক্লিনার বা ছোট
চাকরিজীবী) যার আয় দিয়ে সংসার চলে না, সে হলো ফকীর।
রাস্তায় যারা হাত পাতে তারা সায়েল বা ভিখারি। এদের মধ্যে যারা প্রকৃত অন্ধ, পঙ্গু বা বৃদ্ধ তাদের অবশ্যই দেবেন। তবে যারা সুস্থ-সবল এবং ভিক্ষাকে পেশা
বানিয়েছে,
তাদের চেয়ে আপনার অভাবী আত্মীয়কে দেওয়া বেশি উত্তম।
রেফারেন্স নং: * সূরা আত-তাওবাহ,
আয়াত ৬০ (আটটি খাতের
মধ্যে ফকীর ও মিসকীন প্রথম দুটি)।
তাফসীরে ইবনে কাসীর (খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ১৬৫): এখানে ফকীর ও মিসকীনের পার্থক্য বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে।
একজন 'পেশাদার ভিখারি'কে যাকাত দিলে তা আদায় হবে কি না?
উঃভপেশাদার ভিখারি বা সুস্থ-সবল ভিক্ষুককে যাকাত দেওয়া যাবে কি না, এই বিষয়ে শরীয়তের সিদ্ধান্ত অত্যন্ত কঠোর এবং পরিষ্কার। নিচে নির্ভরযোগ্য হাদিস ও ফিকহ শাস্ত্রের রেফারেন্সসহ বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. সুস্থ ও উপার্জনক্ষম ব্যক্তির জন্য যাকাত নেওয়া কি জায়েজ ?
ইসলামী শরীয়ত অনুযায়ী, যে ব্যক্তি
সুস্থ,
সবল এবং উপার্জনের সামর্থ্য রাখে, তার জন্য যাকাত গ্রহণ করা হারাম বা অবৈধ।
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "যাকাতের মালের মধ্যে কোনো অংশ নেই ওই ব্যক্তির জন্য যে ধনী, আর না ওই ব্যক্তির জন্য যে শক্তিশালী এবং
উপার্জনক্ষম।"
(রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৬৩৩; সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং: ৬৫৭; সুনানে নাসায়ী, হাদিস নং: ২৫৯৭)
২. পেশাদার ভিখারিকে যাকাত দিলে কি যাকাত
আদায় হবে?
এখানে দুটি অবস্থা হতে পারে:
অবস্থা ক (যদি সে সত্যিই অভাবী হয়): যদি কোনো ভিখারি হাত পাতে এবং আপনি নিশ্চিত না হন যে সে ধনী
কি না,
তবে তাকে যাকাত দিলে আপনার যাকাত আদায় হয়ে যাবে। কারণ আপনি
তাকে অভাবী মনে করেই দিয়েছেন।
অবস্থা খ (যদি জানা থাকে সে ধনী বা পেশাদার): যদি আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে ওই ভিখারি আসলে ধনী (যেমন: তার
অনেক জমি বা ব্যাংক ব্যালেন্স আছে কিন্তু সে পেশা হিসেবে ভিক্ষা করে), তবে তাকে যাকাত দিলে আপনার যাকাত আদায় হবে না। আপনাকে পুনরায় অন্য কোনো অভাবী ব্যক্তিকে যাকাত দিতে হবে।
রেফারেন্স: ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৮৯; বাদায়েউস সানায়ে, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৪৭।
৩. যারা ভিক্ষাকে পেশা বানিয়েছে তাদের
সম্পর্কে কঠোর হুঁশিয়ারি
পেশাদার ভিক্ষাবৃত্তি ইসলামে অত্যন্ত নিন্দনীয়। নবীজি (সা.)
এরশাদ করেছেন:
"যে ব্যক্তি নিজের সম্পদ বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে মানুষের কাছে হাত
পাতে,
সে আসলে আগুনের ফুলকি প্রার্থনা করে। এখন তার ইচ্ছা সে কম
নেবে নাকি বেশি।"
(রেফারেন্স: সহিহ মুসলিম, হাদিস নং: ১০৪১; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ১৮৩৮)
অন্য একটি হাদিসে এসেছে:
"যে ব্যক্তি সর্বদা মানুষের কাছে চেয়ে বেড়ায়, কিয়ামতের দিন সে আল্লাহর সামনে এমন অবস্থায় উপস্থিত হবে যে, তার চেহারায় কোনো গোশত থাকবে না (শুধু হাড় থাকবে)।"
(রেফারেন্স: সহিহ বুখারী, হাদিস নং: ১৪৭৪; সহিহ মুসলিম,
হাদিস নং: ১০৪০)
৪. ২০২৬ সালের প্রেক্ষাপটে আপনার জন্য সঠিক
পদ্ধতি
বর্তমান যুগে সিন্ডিকেট বা পেশাদার ভিক্ষুকদের ভিড়ে প্রকৃত
অভাবী মানুষ খুঁজে পাওয়া কঠিন। তাই যাকাত বণ্টনে নিচের পদ্ধতি অনুসরণ করা সবচেয়ে
নিরাপদ:
যাচাই করুন: রাস্তার সুস্থ-সবল ভিক্ষুককে যাকাত না দিয়ে এমন কাউকে দিন যার অভাব আপনি জানেন
(যেমন: আপনার বাসার দারোয়ান, বুয়া, কোনো গরীব রিকশাচালক বা অভাবী আত্মীয়)।
কর্মসংস্থান: কোনো সুস্থ ভিক্ষুককে যাকাত না দিয়ে সেই টাকা দিয়ে তাকে একটি সেলাই মেশিন, রিকশা বা ছোট দোকান করে দিন যাতে সে আর ভিক্ষা না করে। এটিই
ইসলামের মূল শিক্ষা।
সতর্কতা: যদি আপনি
কাউকে যাকাতযোগ্য মনে করে দিয়ে দেন এবং পরে জানতে পারেন সে ধনী ছিল, তবে ইমাম আবু হানিফা (র.)-এর মতে আপনার যাকাত আদায় হয়ে যাবে
(যদি আপনি যাচাইয়ের চেষ্টা করে থাকেন)।
সারসংক্ষেপ: পেশাদার বা সামর্থ্যবান ভিক্ষুককে যাকাত দেওয়া থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। আপনার যাকাতের টাকা অত্যন্ত মূল্যবান, এটি এমন জায়গায় দিন যেখানে দিলে একজন অভাবী মানুষের প্রকৃত উপকার হয়।
একজন ব্যক্তিকে কতটুকু যাকাত দেওয়া যাবে এবং
দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি কী, তা নিয়ে ফিকহ শাস্ত্রের নির্ভরযোগ্য রেফারেন্সসহ নিচে বিস্তারিত আলোচনা
করা হলো:
১. একজন ব্যক্তিকে সর্বোচ্চ কত টাকা যাকাত দেওয়া যাবে?
যাকাত দেওয়ার মূল উদ্দেশ্য হলো দারিদ্র্য বিমোচন করা। এ
ক্ষেত্রে ফকীহদের (আইনজ্ঞ) দুটি মত রয়েছে:
মাকরূহ বা অপছন্দনীয় সীমা: একজন অভাবী ব্যক্তিকে একবারে এত বেশি যাকাত দেওয়া মাকরূহ, যা তাকে সরাসরি 'নিসাব' এর মালিক বানিয়ে দেয় (অর্থাৎ ২০২৬ সালের হিসাব অনুযায়ী তাকে
একবারে ১,১০,০৭৫ টাকা বা তার বেশি দেওয়া)। তবে এটি হারাম নয়, দিলে যাকাত আদায় হয়ে যাবে।
রেফারেন্স: ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৮৮; ফাতাওয়া শামি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৫৩।
উত্তম পদ্ধতি (সঠিক সমাধান): একজন ব্যক্তিকে এমন পরিমাণ যাকাত দেওয়া সবচেয়ে উত্তম, যা দিয়ে তার অন্তত এক দিনের বা এক মাসের অভাব দূর হয় অথবা
সে স্বাবলম্বী হওয়ার পথ খুঁজে পায়। যদি তাকে নিসাব পরিমাণের চেয়েও বেশি দিতে হয়
(যেমন: তার চিকিৎসার জন্য ৫ লাখ টাকা প্রয়োজন বা তাকে একটি রিকশা কিনে দিতে ১.৫০
লাখ টাকা লাগে),
তবে তাকে একবারে বড় অংক দেওয়া সম্পূর্ণ জায়েজ এবং সওয়াবের কাজ।
রেফারেন্স: বাদায়েউস সানায়ে (কাসানী), খণ্ড: ২,
পৃষ্ঠা: ৪৯; আল-মাজমু’ (ইমাম নববী), খণ্ড: ৬,
পৃষ্ঠা: ১৯৩।
২. যাকাত দেওয়ার সঠিক পদ্ধতি (২০২৬-এর
প্রেক্ষাপট)
যাকাত দেওয়ার সময় আমাদের সমাজে কিছু ভুল প্রচলিত আছে। সঠিক
পদ্ধতিগুলো হলো:
ক. যাকাত কথাটি বলা কি জরুরি?
যাকাত দেওয়ার সময় গ্রহীতাকে "এটি যাকাতের টাকা"
বলা জরুরি নয়। বরং এটি উপহার বা সাহায্য হিসেবেও দেওয়া যায়। শর্ত হলো, আপনার মনে 'নিয়াত'
(সংকল্প) থাকতে হবে যে
এটি আপনার যাকাতের টাকা।
রেফারেন্স: ফাতাওয়া শামি, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২৬৮; আল-বাহরুর রায়েক, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ২০৭।
খ. লিল্লা বোর্ডিং বা এতিমখানায় যাকাত:
মাদরাসার এতিমখানায় যাকাত দেওয়া অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। তবে
খেয়াল রাখতে হবে,
যাকাতের টাকা যেন সরাসরি ছাত্রদের খাবারের বা পোশাকের
(লিল্লা ফান্ড) কাজে লাগে। মাদরাসার ভবন নির্মাণ বা শিক্ষকদের বেতনে যাকাতের টাকা
সরাসরি ব্যবহার করা জায়েজ নয়।
রেফারেন্স: ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ১৮৯; রদ্দুল মুহতার, খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা: ৩৪৪।
গ. যাকাত কি শাড়ি-লুঙ্গি হিসেবে দেওয়া যাবে?
বর্তমানে দেখা যায় মানুষ নিম্নমানের শাড়ি বা লুঙ্গি কিনে
যাকাত দেয়। এতে অধিকাংশ সময় গরীবের প্রকৃত উপকার হয় না। শরীয়তের দৃষ্টিতে পণ্যের
চেয়ে
নগদ টাকা দেওয়া বেশি
উত্তম,
যাতে অভাবী ব্যক্তি তার প্রয়োজনমতো খরচ করতে পারে (যেমন:
ওষুধ কেনা বা চাল কেনা)।
রেফারেন্স: আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু, খণ্ড: ২,
পৃষ্ঠা: ৮০৭।
৩. আপনার জন্য একটি বিশেষ নসিহত (যাকাত দিয়ে স্বাবলম্বী
করা)
নবীজি (সা.) এর যুগে জনৈক আনসারী সাহাবীকে তিনি ভিক্ষা না
দিয়ে তার কম্বল বিক্রি করে একটি কুঠার কিনে দিয়েছিলেন যেন সে কাঠ কেটে জীবিকা
নির্বাহ করতে পারে।
রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং: ১৬৪১; ইবনে মাজাহ, হাদিস নং: ২১৯৮।
২০২৬ সালের আধুনিক বুদ্ধি: ১০ জনকে ১০০০ টাকা করে যাকাত না দিয়ে, ১ জনকে ১০,০০০ টাকা দিয়ে যদি
একটি সেলাই মেশিন বা ছোট দোকান করে দেওয়া যায়, তবে ওই
ব্যক্তি আগামী বছর হয়তো যাকাত গ্রহীতার বদলে যাকাত দাতা হিসেবে
দাঁড়িয়ে যাবে। এটিই ইসলামের প্রকৃত লক্ষ্য।



0 Comments