প্রথম
পরিচ্ছেদ: জাকাতুল ফিতরের সংজ্ঞা
১. অভিধানিক অর্থে জাকাত:
আরবি ভাষায় 'জাকাত' শব্দের মূল অর্থ হলো: পবিত্রতা (Purity), বৃদ্ধি এবং বরকত বা প্রাচুর্য।
সূত্র: ইবনুল আসীর রচিত 'আন-নিহায়াহ' (২/৩০৭); ইবনে মানজুর রচিত 'লিসানুল আরব' (১৪/৩৫৮)।
২. অভিধানিক অর্থে ফিতর:
'ফিতর' শব্দটি(ফা, ত’ এবং র—ف، ط، ر) এই তিনটি মূল অক্ষর থেকে গঠিত একটি সহিহ আরবি শব্দ। এমন একটি মূল ধাতু থেকে আগত যা কোনো কিছু উন্মুক্ত করা এবং তা প্রকাশ করাকে বোঝায়। সূত্র: ইবনে ফারিস রচিত 'মাকায়িসুল লুগাহ' (৪/৫১০)।
৩.শরিয়তের
পরিভাষায় জাকাতুল ফিতরের সংজ্ঞা:
ইসলামি শরিয়তের পরিভাষায় একে 'জাকাতুল ফিতর' জাকাতুল 'সাদাকাতুল
ফিতর'—উভয়ই বলা হয়।
নামকরণের কারণ: এখানে 'জাকাত' শব্দটিকে 'ফিতর' (রোজা ভঙ্গ বা ইফতার)-এর সাথে সম্বন্ধযুক্ত করা হয়েছে; কারণ ফিতর বা রোজা সম্পন্ন করাই হলো এই জাকাত ওয়াজিব হওয়ার মূল কারণ। এটি মূলত কোনো বিষয়কে তার 'কারণ'-এর দিকে সম্বন্ধযুক্ত করার একটি উদাহরণ।
ফিতরাহ: যে সম্পদ বা খাদ্যশস্য
ফিতরা হিসেবে বের করা হয়, তাকে 'ফিতরাহ'
বলা হয়। (ফ-এর
নিচে কেবল 'জের' দিয়ে পড়তে হয়)। এটি ফকিহ বা আইনবিদদের একটি পারিভাষিক শব্দ, যা মূল
আরবি বা অন্য ভাষা থেকে সরাসরি আসেনি বরং এটি একটি পারিভাষিক উদ্ভাবন। মনে করা হয়
এটি 'ফিতরাত' শব্দ থেকে এসেছে যার অর্থ
'সৃষ্টি' বা 'প্রকৃতি'। অর্থাৎ এটি 'সৃষ্টির
জাকাত'। এর মাধ্যমে মানুষের শরীর
ও আত্মার পক্ষ থেকে দান করাকে বোঝানো হয়।
সূত্র: ইমাম নববী রচিত 'আল-মাজমু' (৬/১০৩); আল-বাহুতি রচিত 'কাশশাফুল কিনা' (২/২৪৫)।
মূল
সংজ্ঞা: জাকাতুল
ফিতর হলো:
ঈদুল ফিতরের নামাজের আগে প্রত্যেক মুসলিমের পক্ষ থেকে
নির্দিষ্ট খাতে প্রদানকৃত একটি সুনির্দিষ্ট পরিমাণ দান।
সূত্র: মুহাম্মদ রাওয়াস কালআজি ও
হামিদ সাদিক কনিবি রচিত 'মু'জামু লুগাতিল ফুকাহা' (পৃষ্ঠা: ২৩৩); 'মাজাল্লাতুল
বুহুস আল-ইসলামিয়্যাহ' (৬২/৩১৭); আরও দেখুন: 'আল-বিনায়াহ
শারহুল হিদায়াহ' (৩/৪৮১)।
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ: জাকাতুল ফিতরের বিধানঃ
জাকাতুল ফিতর (ফিতরা) আদায় করা ওয়াজিব। এটি চারটি ফিকহী মাযহাবের (হানাফী, মালিকী, শাফেয়ী ও হাম্বলী) সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত।
১.হানাফী মাযহাব: হানাফীগণ এটিকে 'ওয়াজিব' শব্দ দ্বারা প্রকাশ করেন। এটি জমহুর (অধিকাংশ) উলামাদের পরিভাষার বিপরীত, কারণ অন্যরা একে 'ফরজ' বলে থাকেন।
আল-কামাল ইবনুল হুমাম বলেন:
"যে বিষয়টি দলিল-ই-জন্নী (ধারণাপ্রসূত দলিল) দ্বারা প্রমাণিত,
তা কেবল 'ওয়াজিব' সাব্যস্ত
হয়। তাই মূল অর্থে এখানে কোনো বিরোধ নেই। কারণ অন্যরা যে 'ফরজিয়াত'
(ফরজ হওয়া) সাব্যস্ত করেন, তা এমন পর্যায়ের নয়
যে এটি অস্বীকারকারী কাফের হয়ে যাবে।
সুতরাং এটি মূলত সেই 'ওয়াজিব'
অর্থই প্রদান করে যা আমরা বলে থাকি। বড়জোর এতটুকু বলা যায় যে,
তাদের পরিভাষায় 'ফরজ' শব্দটি
আমাদের পরিভাষার 'ওয়াজিব' এর চেয়ে
ব্যাপক (সাধারণ), তাই তারা এর একটি অংশের ওপর শব্দটিকে
প্রয়োগ করেছেন...। যদি আপনি বলেন: ঐকমত্যের কারণে এখানে 'ফরজ'
বলতে আমাদের পরিভাষার (অকাট্য) ফরজ বোঝানোই উচিত ছিল।
তবে উত্তর হলো: এটি তখনই সম্ভব হতো যদি
এই ইজমা বা ঐকমত্য 'তাওয়াতুর' (অকাট্য
ধারাবাহিকতা) এর মাধ্যমে বর্ণিত হতো যেন তা 'ইজমায়ে কাতঈ'
বা অকাট্য ঐকমত্য হতো, অথবা এটি দ্বীনের
আবশ্যকীয় বিষয়গুলোর (যেমন পাঁচ ওয়াক্ত সালাত) অন্তর্ভুক্ত হতো। কিন্তু যখন এই ইজমা
কেবল ধারণাপ্রসূত (জন্নী), তখন আর তা থাকে না। এজন্যই ফকীহগণ
স্পষ্ট করেছেন যে, ফিতরার ওয়াজিব হওয়া অস্বীকারকারী কাফের
হবে না। সুতরাং আমাদের নিকট এটি প্রচলিত অর্থেই ওয়াজিব।"
— রেফারেন্স: ফাতহুল কাদির, কামাল
ইবনুল হুমাম (২/২৮১); আরও দেখুন: তাবয়ীনুল হাকায়িক শারহু
কানযিদ দাকায়িক, যাইলায়ী এবং হাশিয়াতুশ শিলবি (১/৩০৬)।
৩.মালিকী মাযহাব (প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী): মালিকি মাযহাবের প্রসিদ্ধ মতানুসারে এটি ওয়াজিব।
রেফারেন্স: আল-কাফী
ফী ফিকহি আহলিল মদীনা, ইবনে আব্দুল বার (১/৩২০); হাশিয়াতুল আদুয়ী আলা কিফায়াতিত ত্বালিবির রাব্বানী (১/৫১১)।
৪. শাফেয়ী মাযহাব: শাফেয়ি
মাযহাব অনুযায়ী এটি ফরজ।
রেফারেন্স: রওজাতুত
ত্বালিবীন, নববী (২/২৯১); তুহফাতুল মুহতাজ, হাইতামী এবং হাওয়াশিশ শিরওয়ানী ওয়াল ইবাদী (৩/৩০৫)।
৫. হাম্বলী মাযহাব: হাম্বলি মাযহাবের মতে এটি ওয়াজিব।
রেফারেন্স: কাশশাফুল
কিনা', বুহুতী (২/২৪৬); আরও দেখুন: আল-মুগনী, ইবনে কুদামা (৩/৭৯)।
২. ইমাম ইরাকী (রহ.)-এর বক্তব্য: ইবনে উমর (রাযি.) বর্ণিত হাদিস সম্পর্কে আল-ইরাকী বলেন: "এতে প্রমাণিত হয় যে জাকাতুল ফিতর 'ফরজ'। এটি জমহুর উলামাদের মূলনীতির অনুসারী যেখানে 'ফরজ' এবং 'ওয়াজিব' শব্দ দুটিকে সমার্থক মনে করা হয়। হানাফীগণ তাদের কিতাবসমূহে কেবল 'ওয়াজিব' বলার ওপর সীমাবদ্ধ থেকেছেন, যা তাদের মূলনীতির প্রতিফলন—
অর্থাৎ যা দলিল-ই-জন্নী দ্বারা প্রমাণিত তা ওয়াজিব। হাম্বলীগণের মাঝে এ বিষয়ে মতভেদ রয়েছে। ইবনে কুদামা বলেন: আমাদের কতিপয় সাথী বলেছেন, ওয়াজিব বলার পাশাপাশি কি একে 'ফরজ' বলা যাবে? এ বিষয়ে দুটি বর্ণনা রয়েছে। তিনি বলেন: সঠিক কথা হলো এটি 'ফরজ'; কারণ ইবনে উমর (রাযি.) বলেছেন, 'রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন'। এছাড়া উলামাগণ এটি ফরজ হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন।
কারণ 'ফরজ' যদি 'ওয়াজিব' এর সমার্থক হয় তবে এটি ওয়াজিব, আর যদি 'ফরজ' বলতে সুনিশ্চিত ওয়াজিব বোঝায়, তবে এটি ইজমা দ্বারা সুনিশ্চিত সাব্যস্ত।"— রেফারেন্স: ত্বরাহুত তাসরীব ফী শারহিত তাকরীব (৪/৪৭)।
৬. জাহেরী মাযহাব:
ইবনে হাজম বলেন: "রমজানের
জাকাতুল ফিতর প্রত্যেক মুসলিমের ওপর—চাই সে বড় হোক বা ছোট, পুরুষ
বা নারী, স্বাধীন বা দাস—একটি ফরজ ও ওয়াজিব কাজ। এমনকি
আমাদের উল্লেখ করা এই ব্যক্তি যদি মায়ের গর্ভে থাকা ভ্রূণও হয় (তার পক্ষ থেকেও
দেওয়া ওয়াজিব)।"
— রেফারেন্স: আল-মুহাল্লা (৬/১১৮, নম্বর ৭০৪)।
৭. সাধারণ উলামাদের অভিমত: সাধারণ সকল আলিমই এই মত পোষণ করেছেন। — রেফারেন্স: শারহুস সুন্নাহ, বাগভী (৬/৭১)।
৩.ইজমা (ঐকমত্য) সংক্রান্ত আলোচনা: এ বিষয়ে ইজমা বা ঐকমত্য বর্ণিত হয়েছে।
ইবনুল মুনযির (রহ.) বলেন: "উলামাগণ এ বিষয়ে একমত হয়েছেন যে, জাকাতুল ফিতর প্রত্যেক ব্যক্তির ওপর ওয়াজিব, যদি তা আদায় করার সামর্থ্য তার থাকে।" তিনি আরও বলেন: "সকলে একমত হয়েছেন যে, জাকাতুল ফিতর একটি ফরজ।" — রেফারেন্স: আল-ইজমা (পৃষ্ঠা: ৪৭)।
ইবনে রুশদ (রহ.) বলেন: "উলামাগণ একমত হয়েছেন যে, এটি মানুষের নিজের ওপর ওয়াজিব এবং এটি শরীরের জাকাত (যাকাতুল বদন)।" — রেফারেন্স: বিদায়াতুল মুজতাহিদ (১/২৭৯)।
ইবনে কুদামা (রহ.) বলেন: "ইবনুল মুনযির বলেছেন: আমরা যাদের কাছ থেকে ইলম হাসিল করেছি, সেই সকল আহলে ইলম (বিদ্বান) এ বিষয়ে একমত যে, সদকাতুল ফিতর ফরজ। ইসহাক (রহ.) বলেছেন: এটি আহলে ইলমদের নিকট ইজমার মতোই।" — রেফারেন্স: আল-মুগনী (৩/৭৯)।
তিনি আরও বলেন: "আহলে ইলমদের সাধারণ বক্তব্য অনুযায়ী, জাকাতুল ফিতর প্রত্যেক মুসলমানের ওপর ওয়াজিব; ছোট-বড় এবং নারী-পুরুষ নির্বিশেষে।"— রেফারেন্স: আল-মুগনী (৩/৭৯)।
ইমাম নববী (রহ.) বলেন: "ইমাম বায়হাকী বলেছেন: উলামাগণ জাকাতুল ফিতর ওয়াজিব হওয়ার ব্যাপারে একমত হয়েছেন। অনুরূপভাবে ইবনুল মুনযিরও তাঁর 'আল-ইশরাফ' কিতাবে ইজমা বর্ণনা করেছেন।" — রেফারেন্স: আল-মাজমু' (৬/১০৪)।
ইজমা বর্ণনার ওপর আপত্তি: তবে এই ইজমা বর্ণনার ক্ষেত্রে কিছুটা ভিন্নমত বা পর্যালোচনার অবকাশ রয়েছে— যেমনটি ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) বলেছেন: "এই ইজমা বর্ণনার বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে;
কারণ ইব্রাহিম ইবনে উলাইয়্যাহ এবং আবু বকর ইবনে কায়সান আল-আসাম্ম বলেছেন: এর ওয়াজিব হওয়ার বিধানটি রহিত (মানসুখ) হয়ে গেছে।" তারা নাসায়ী ও অন্যান্যদের বর্ণিত কায়স ইবনে সাদ ইবনে উবাদাহ (রাযি.)-এর হাদিস দ্বারা দলিল পেশ করেন, যেখানে তিনি বলেন: "জাকাত (সম্পদের জাকাত) অবতীর্ণ হওয়ার আগে রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) আমাদের সদকাতুল ফিতরের নির্দেশ দিয়েছিলেন।
অতঃপর যখন জাকাতের বিধান নাজিল হলো, তখন তিনি আমাদের (নতুন করে) নির্দেশও দেননি আবার নিষেধও করেননি, তবে আমরা তা আদায় করতাম।"
এর উত্তরে বলা হয়েছে যে, এই হাদিসের সনদে একজন 'মাজহুল' বা অজ্ঞাত রাবী আছে। আর যদি হাদিসটি সহীহ ধরেও নেওয়া হয়, তবুও তা 'নাসখ' বা রহিত হওয়ার দলিল হতে পারে না। কারণ সম্ভাবনা রয়েছে যে, প্রথম নির্দেশটিই যথেষ্ট ছিল। কেননা একটি নতুন ফরজ (জাকাত) বিধান নাজিল হওয়া মানেই অন্য একটি ফরজ (ফিতরা) বাতিল হয়ে যাওয়া নয়।
মালিকী মাযহাবের আশহাব (রহ.) থেকে বর্ণিত যে, এটি 'সুন্নতে মুয়াক্কাদাহ'। জাহেরী মাযহাবের কেউ কেউ এবং শাফেয়ী মাযহাবের ইবনুল লাব্বানও এই মত পোষণ করেছেন। — রেফারেন্স: ফাতহুল বারী (৩/৩৬৮); আরও দেখুন: ত্বরাহুত তাসরীব (৪/৪৬), আল-বিনায়াহ শারহুল হিদায়াহ (৩/৪৮১)।
৪. সুন্নাহ থেকে দলিল:
ইবনে উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: "রাসূলুল্লাহ (সা.) জাকাতুল ফিতর হিসেবে এক সা' খেজুর
অথবা এক সা' যব— মুসলিমদের মধ্য থেকে ক্রীতদাস ও স্বাধীন,
পুরুষ ও নারী এবং ছোট ও বড় প্রত্যেকের ওপর ফরজ করেছেন। আর তিনি
নির্দেশ দিয়েছেন যেন মানুষ ঈদের নামাজে বের হওয়ার আগেই তা আদায় করা হয়।" (সহিহ বুখারি: ১৫০৩,
সহিহ মুসলিম: ৯৮৪, ৯৮৬)।
হাদিসে ব্যবহৃত 'ফরজ' শব্দের ব্যাখ্যা:
ইবনে দাকীকুল ঈদ (রহ.) বলেন: "কেউ কেউ এটি ওয়াজিব না হওয়ার মত পোষণ করেছেন এবং হাদিসে ব্যবহৃত 'ফারাযা' শব্দটিকে 'নির্ধারণ করা' অর্থে গ্রহণ করেছেন—যা মূলত এর শাব্দিক অর্থ। কিন্তু ফিকহী পরিভাষায় এটি 'ওয়াজিব' অর্থেই ব্যবহৃত হয়, তাই এই অর্থ গ্রহণ করাই শ্রেয়। কারণ যা ব্যবহারে প্রসিদ্ধ, সেটিই উদ্দেশ্য হওয়া প্রবল।" — রেফারেন্স: ইহকামুল আহকাম (পৃষ্ঠা: ২৬৪)।
ইবনুল হুমাম (রহ.)-এর উক্তির অবশিষ্টাংশ: "শারীয়াতের প্রবর্তক (আল্লাহ ও তাঁর রাসূল)-এর বাণীতে কোনো শব্দকে তার প্রকৃত শরয়ী অর্থে গ্রহণ করা আবশ্যক, যতক্ষণ না তা থেকে সরিয়ে নেওয়ার মতো অন্য কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়। আর শরয়ী পরিভাষায় 'ফরজ' অর্থ কেবল 'নির্ধারণ করা' নয় (বরং তা পালনীয় বিধান)। বিশেষ করে বুখারী ও মুসলিমের শব্দে এই হাদিসটিতে এসেছে: 'রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) এক সা' খেজুর অথবা এক সা' যব ফিতরা হিসেবে প্রদানের নির্দেশ দিয়েছেন।' ইবনে উমর (রাযি.) বলেন: 'পরবর্তীতে মানুষ এর সমপরিমাণ হিসেবে দুই মুদ গম নির্ধারণ করে নেয়।' আর এখানে 'ফরজ' শব্দের অর্থ হলো 'নির্দেশ দেওয়া', যা মূলত ওয়াজিব বা আবশ্যক হওয়ারই নির্দেশ।" — রেফারেন্স: ফাতহুল কাদির (২/২৮২)।
মূল হাদিস (বুখারী ও
মুসলিম): ইবনে উমর (রাযি.) থেকে
বর্ণিত, তিনি
বলেন: "রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম)
প্রত্যেক মুসলিম দাস ও স্বাধীন, পুরুষ ও নারী, ছোট ও বড়র ওপর এক সা' খেজুর অথবা এক সা' যব জাকাতুল ফিতর হিসেবে ফরজ করেছেন এবং তিনি নির্দেশ দিয়েছেন যে, তা যেন মানুষের সালাতে বের হওয়ার আগেই আদায় করা হয়।"
অন্য শব্দে এসেছে: "রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ছোট-বড়, স্বাধীন ও
ক্রীতদাসের ওপর এক সা' যব অথবা এক সা' খেজুর
সদকাতুল ফিতর হিসেবে ফরজ করেছেন।"
— রেফারেন্স: সহীহ বুখারী (হাদিস নং ১৫০৩, ১৫১২) ও সহীহ মুসলিম
(হাদিস নং ৯৮৪, ৯৮৬)।
তৃতীয়
পরিচ্ছেদ: জাকাতুল ফিতর বিধিবদ্ধ করার হিকমত বা তাৎপর্য:
জাকাতুল ফিতর (ফিতরা) বিধিবদ্ধ করার পেছনে অনেক মহান হিকমত ও উদ্দেশ্য রয়েছে; তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. রোজাদারের
ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে পবিত্রতা অর্জন:
রোজা পালন অবস্থায়
মানুষের অজান্তে যেসব অনর্থক কথা (লাঘব) বা অশালীন আচরণ (রাফাস) হয়ে থাকে, ফিতরা প্রদানের
মাধ্যমে সেই রোজা যাবতীয় ত্রুটি থেকে পরিচ্ছন্ন ও পবিত্র হয়ে যায়।
২. অভাবী ও মিসকিনদের
খাদ্যের সংস্থান:
ঈদের আনন্দের দিনে দরিদ্র ও অভাবী মানুষ যাতে কারো কাছে হাত না পেতে খাদ্যের সংস্থান করতে পারে এবং ধনীদের সাথে ঈদের খুশিতে সমানভাবে শরিক হতে পারে, এটি ফিতরার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য।
এই দুটি হিকমতের কথা
স্পষ্টভাবে ইবনে আব্বাস (রাযি.) বর্ণিত হাদিসে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন: >
"রাসূলুল্লাহ
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) জাকাতুল ফিতর ফরজ করেছেন রোজাদারের অনর্থক ও
অশ্লীল আচরণ থেকে পবিত্র করার জন্য এবং মিসকিনদের খাবারের ব্যবস্থার জন্য। যে
ব্যক্তি ঈদের সালাতের আগে তা আদায় করবে, তা 'মাকবুল জাকাত' (গৃহীত জাকাত) হিসেবে গণ্য হবে। আর যে
ব্যক্তি সালাতের পর আদায় করবে, তা সাধারণ দান-সদকার মতোই
একটি সদকা হিসেবে গণ্য হবে।"
— রেফারেন্স: সুনানে আবু দাউদ (১৬০৯), ইবনে মাজাহ (১৮২৭), দারাকুতনী (২/১৩৮), হাকেম (১/৫৬৮)। দারাকুতনী এই হাদিসের বর্ণনাকারীদের সম্পর্কে বলেছেন: "তাদের মধ্যে কেউ বিতর্কিত বা জখমপ্রাপ্ত (মাজরুহ) নন।" ইমাম নববী 'আল-মাজমু' (৬/১২৬) কিতাবে এর সনদকে হাসান বলেছেন। ইবনুল মুলাক্কিন 'শারহু বুখারী' (১০/৬৩৬) কিতাবে, শায়খ ইবনে বায 'ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব' (১৫/২৭১) কিতাবে এবং আলবানী 'সহীহুল জামি' (৩৫৭০) কিতাবে একে সহীহ বলেছেন।
৩. দেহের জাকাত: আল্লাহ তাআলা মানুষকে
আরও একটি বছর জীবিত রেখেছেন এবং বেঁচে থাকার নেয়ামত দান করেছেন—তাই এটি শরীরের
একটি জাকাত বা শুকরিয়া। এ কারণেই এই জাকাত ছোট শিশু (যার ওপর রোজা ফরজ নয়), পাগল এবং যার ওপর
কাজা রোজা বাকি আছে তার ওপরও (কাজা আদায়ের আগেই) ওয়াজিব হয়।
— রেফারেন্স: ইরশাদু উলিল বাসাইর ওয়াল আলবাব, ইবনে সাদী (পৃষ্ঠা: ১৩৪)।
৪. রোজা রাখার তৌফিক
পাওয়ার শুকরিয়া: আল্লাহ তাআলা রোজাদারকে রোজা রাখার যে নেয়ামত দিয়েছেন, তার শুকরিয়া স্বরূপ
এই জাকাত। যেমন হজ সম্পন্ন করার তৌফিক পাওয়ার শুকরিয়া হিসেবে 'হাদি' বা কুরবানি দেওয়া হয়, সদকাতুল
ফিতরও ঠিক তেমন। এজন্যই একে 'ফিতর' বা
রোজা ভঙ্গের সাথে সম্পর্কিত করা হয়েছে (কারণ এটি রোজা শেষ হওয়ার কারণে ওয়াজিব হয়)।
— রেফারেন্স: ইরশাদু উলিল বাসাইর ওয়াল আলবাব, ইবনে সাদী (পৃষ্ঠা: ১৩৫)।
৫. নির্ধারিত সময়ে আদায়ের
মাধ্যমে মহান প্রতিদান লাভ: নির্দিষ্ট সময়ে হকদারদের নিকট এটি পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে
মহান সওয়াব অর্জিত হয়। যেমন ইবনে আব্বাস (রাযি.)-এর হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি সালাতের
আগে তা আদায় করবে, তা 'মাকবুল জাকাত'
হিসেবে গণ্য হবে..."।
— রেফারেন্স: আবু দাউদ (১৬০৯), ইবনে মাজাহ (১৪৯২), দারাকুতনী (২/১৩৮), হাকেম (১/৫৬৮)। ইবনে কুদামা 'আল-মুগনী' (৪/২৮৪) কিতাবে একে হাসান বলেছেন এবং
আলবানী 'সহীহ সুনানে আবু দাউদ' (১৬০৯)
কিতাবে একে হাসান বলেছেন।
৬. ঈদের আনন্দ পূর্ণতা
পাওয়া: এর মাধ্যমে ঈদের দিনে
সকল মুসলিমের আনন্দ পূর্ণতা পায় এবং রোজা পালনের ক্ষেত্রে কোনো ত্রুটি বিচ্যুতি
থাকলে তা পূরণ হয়।



0 Comments