১. মহিষের কুরবানি কি
জায়েজ?
হ্যাঁ, মহিষের কুরবানি জায়েজ এবং এটি বিশুদ্ধ মত। চার মাযহাবের
(হানাফী,
শাফেঈ, মালেকী ও হাম্বলী)
অধিকাংশ ফকিহ ও ওলামায়ে কেরামের মতে, মহিষ 'গরু'(البقر) জাতীয় প্রাণীর অন্তর্ভুক্ত। তাই গরুর ক্ষেত্রে যে বিধান
প্রযোজ্য,
মহিষের ক্ষেত্রেও সেই একই বিধান প্রযোজ্য হবে।
২. হাদিসে বা দলিলে এর
ভিত্তি কী?
সরাসরি 'মহিষ' (আরবিতে: الجاموس -আল-জামুস) শব্দটা কুরআন বা হাদিসে ওভাবে আসেনি। এর কারণ হলো—নবী করীম ﷺ-এর সময়ে আরব উপদ্বীপে মহিষ ছিল না। তবে ইসলামের মূলনীতি ও
ফকিহগণের ইজমা (ঐক্যমত্য) এর স্বপক্ষে বড় দলিল:
জায়েজ হওয়ার দলিল
ইজমা (ঐক্যমত্য): ইসলামের প্রথম যুগ থেকেই আলেমগণ মহিষকে গরুর একটি প্রজাতি
হিসেবে গণ্য করেছেন।
পশুর শ্রেণিবিভাগ 'আন'আম'(أنعام): কুরআনে কুরবানির
পশুর ক্ষেত্রে 'বাহিমাতুল আনআম' (চতুষ্পদ জন্তু) শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। আরবরা উট, গরু এবং ছাগল-ভেড়াকে এর অন্তর্ভুক্ত মনে করত। ফকিহগণের মতে, মহিষ হলো গরুর একটি প্রজাতি (نوع
من أنواع
البقر)।
ইমাম ইবনুল মুনযির (রহ.) বলেছেন: "সকল ওলামায়ে কেরাম একমত যে, উট, গরু (মহিষসহ) এবং
ছাগল-ভেড়ার ওপর যাকাত ও কুরবানি ওয়াজিব এবং এগুলো দিয়েই কুরবানি হবে।" (আল-ইজমা)। [১]
ইবনে কুদামা (রহ.)-এর বক্তব্য: ইমাম ইবনে কুদামা 'আল-মুগনী' কিতাবে লিখেছেন: "মহিষের হুকুম গরুর হুকুমের মতোই।
কারণ এটি এক প্রকার গরু।" [২] আল-মুগনী
(ইবনে কুদামা): খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৪৪০।
ইমাম নববী (রহ.)-এর বক্তব্য: তিনি তাঁর 'আল-মাজমু' কিতাবে উল্লেখ করেছেন: "মহিষ কুরবানি করা জায়েজ হওয়ার
ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম একমত (ইজমা)। কারণ এটিও এক ধরণের বাক্বার বা গরু।" [৩]
আল-মাজমু' (ইমাম
নববী): খণ্ড
৮, পৃষ্ঠা
৩৯৪।
ইমাম কাসানী (রহ.)-এর বক্তব্য: হানাফী মাযহাবের দলিল-বিখ্যাত
ফিকহ গ্রন্থ 'বাদায়িউস সানায়ি'-তে বলা হয়েছে: "মহিষ আসলে গরুরই একটি প্রকার। কারণ এতে গরুর সকল বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।" [৪] বাদায়িউস
সানায়ি (কাসানী): খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৭০।
৩. সাহাবীদের আমল ও আসার:
হাদিসে সরাসরি 'জামুস' শব্দটি কুরবানির
আলোচনায় না আসলেও,
তৎকালীন ফকিহ সাহাবী ও তাবিঈগণ মহিষের যাকাত ও কুরবানিকে
গরুর সমতুল্য মনে করতেন। ইমাম ইবনু মুনযির (রহ.) বলেন, সকল আলেম এই বিষয়ে একমত যে, মহিষের ওপর যাকাত ওয়াজিব, যেভাবে গরুর ওপর হয়।
যেহেতু যাকাতের ক্ষেত্রে এটি গরু হিসেবে গণ্য, তাই কুরবানির ক্ষেত্রেও এটি গরুর বিধানই পাবে। [৫]
আরবি অভিধানের আলোকে: আরবি ভাষায় 'বাক্বর' (البقر) বলতে গরু ও মহিষ উভয়কেই বোঝানো হয়। যেমনটি আধুনিক
ফতোয়াগুলোতেও স্পষ্ট করা হয়েছে। তাই একটি মহিষেও গরুর মতোই সর্বোচ্চ সাত জন শরিক হতে পারবে।
৩. যারা মনে করেন 'দেওয়া যাবে না'—তাঁদের যুক্তি কী?
যারা মহিষের কুরবানি নিয়ে আপত্তি তোলেন, তাঁদের যুক্তি হলো—যেহেতু হাদিসে সরাসরি ' জামুস (الجاموس বা মহিষ) শব্দটি আসেনি
এবং রাসূলুল্লাহ ﷺ নিজে মহিষ
কুরবানি করেননি,
তাই এটি দেওয়া যাবে না।
তবে এটি কোনো শক্তিশালী দলিল নয়। কারণ অনেক হালাল জিনিস সেই
সময় আরবে ছিল না বলে নবীজী ﷺ খাননি বা ব্যবহার করেননি, কিন্তু সেগুলো হারামের অন্তর্ভুক্ত নয়।
এর জবাব: রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর সময় আরবে
মহিষ ছিল না,
তাই তিনি তা করেননি। শরীয়তের নিয়ম হলো, ইসলামের বিধান অনুযায়ী, কোনো প্রাণী যদি নির্দিষ্ট শ্রেণীর (যেমন গরু) অন্তর্ভুক্ত
হয়,
তবে সেই শ্রেণীর বিধান তার ওপর প্রযোজ্য হয়। এটি ইসলামের
একটি সাধারণ মূলনীতি।
সারসংক্ষেপ:
অংশীদারিত্ব: গরুর মতোই মহিষের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ ৭ জন
শরিক হয়ে কুরবানি দিতে পারেন।
শর্তাবলী: গরুর
ক্ষেত্রে যে বয়স (২ বছর) এবং সুস্থতার শর্ত থাকে, মহিষের ক্ষেত্রেও তা একই।
তথ্যসূত্র:
১. আল-ইজমা
(ইবনুল মুনযির):
পৃষ্ঠা নং ৪৭।
২.
আল-মুগনী (ইবনে
কুদামা): খণ্ড
৯, পৃষ্ঠা ৪৪০।
৩.
আল-মাজমু' (ইমাম নববী): খণ্ড
৮, পৃষ্ঠা ৩৯৪।
৪.
বাদায়িউস
সানায়ি (কাসানী): খণ্ড
৫, পৃষ্ঠা ৭০। খণ্ড ৫,
পৃষ্ঠা ৬৯।
৫.
আল-মুফাসসাল ফি
আহকামিল উদহিয়্যাহ: পৃষ্ঠা
৮৯-৯০।
মাননীয় শায়খকে (আল্লাহ তাঁর ওপর রহমত বর্ষণ করুন) জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল:
মহিষ অনেক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে গরু থেকে আলাদা, যেমনটা ছাগল ভেড়া থেকে আলাদা। আল্লাহ তাআলা সূরা আল-আন'য়ামে ভেড়া ও ছাগলের কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করেছেন, কিন্তু মহিষ ও গরুর মধ্যে কোনো পার্থক্য করেননি।
এমতাবস্থায়,
মহিষ কি সেই 'আট জোড়া' (আশ-শামানিয়াতু আজওয়াজ) পশুর অন্তর্ভুক্ত হবে যা দিয়ে
কোরবানি করা জায়েজ,
নাকি জায়েজ নয়?
উত্তর: মহিষ এক
প্রকার গরুরই অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কুরআনে ওইসব পশুর কথা উল্লেখ
করেছেন যা তৎকালীন আরবদের কাছে পরিচিত ছিল, যারা নিজেদের
ইচ্ছামতো কোনোটিকে হারাম আর কোনোটিকে হালাল করত। আর মহিষ আরবদের কাছে পরিচিত (তথা
আরবে বিদ্যমান) ছিল না।
সূত্র: মাজমুউ
ফাতাওয়াশ শায়খ ইবনে উসাইমিন (২৫/৩৪)।
আট জোড়া পশুর অন্তর্ভুক্ত হওয়া (الأزواج الثمانية):
অনুবাদ:
"মহিষ কি আট জোড়া
পশুর অন্তর্ভুক্ত হবে?"
রেফারেন্স:
সূরা আল-আন'য়ামের ১৪৩-১৪৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ যে আটটি জোড়ার কথা বলেছেন, মহিষ বৈশিষ্ট্যের কারণে 'গরু' (البقر) শ্রেণির অধীনে
পড়ে। তাই এটি দিয়ে কোরবানি করা সম্পূর্ণ
জায়েজ।



0 Comments