Subscribe Us

হে পথিক ভবিষ্যৎ বলে কিছু নাই ,আসোল ভবিষ্যৎ হলো পরোকাল।।

আরাফাহ দিবসের সিয়ামের বৈধতা ও ফজিলত:নির্বোধ ও হঠকারীদের (বিনা ভাবনায় সংশয় সৃষ্টিকারী) জবাব।




আরাফাহ দিবসের সিয়ামের বৈধতা ও ফজিলত: নির্বোধ ও হঠকারীদের জবাব

 

১. প্রবন্ধের শিরোনাম ও পরিচিতি

(১) মৌলিক শিরোনাম: আরাফাহর দিনের রোযার বৈধতা ও এটি মুস্তাহাব (উত্তম) হওয়া,

(২) উপ-শিরোনাম: এবং নির্বোধ ও হঠকারীদের (বিনা ভাবনায় সংশয় সৃষ্টিকারী) জবাব।

(৩) লেখক: আলভী বিন আব্দুল কাদির আস-সাক্কাফ এর কলমে

(৪) পদবী: জেনারেল সুপারভাইজার, আদ-দুরার আস-সানিয়াহ ফাউন্ডেশন।

 

২. ভূমিকা ও আল্লাহর প্রশংসা:

  • সব প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্য, যিনি প্রতিটি যুগে এমন রব্বানী (তত্ত্বজ্ঞানী) আলেমদের সৃষ্টি করেছেন যারা দ্বীনের সঠিক জ্ঞান বহন করেন। তারা এই জ্ঞান থেকে সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, মূর্খদের অপব্যাখ্যা এবং বাতিলপন্থীদের মিথ্যাচার দূর করেন।
  • সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক সর্বশেষ নবী ও রাসূলের ওপর, যিনি আমাদের এক উজ্জ্বল ও সুস্পষ্ট রাজপথের ওপর ছেড়ে গেছেন—যার রাতও দিনের মতোই প্রদীপ্ত। ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যক্তি ছাড়া অন্য কেউ এই পথ থেকে বিচ্যুত হয় না।

৩. বর্তমান ফেতনার স্বরূপ}/ [সমসাময়িক প্রেক্ষাপট ও সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি]

  • উম্মাহর ঐকমত্যে আঘাত: ইদানীং আমরা এমন কিছু মানুষের বক্তব্য শুনছি ও পড়ছি, যারা উম্মাহর সর্বসম্মত (ইজমা প্রতিষ্ঠিত) বিষয়গুলো নিয়ে অযথা বিতর্ক সৃষ্টি করছে।
  • সাধারণ মানুষের বিভ্রান্তি: এর মাধ্যমে তারা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করছে এবং নবী করীম (সা.)-এর সুন্নাহ নিয়ে সংশয় তৈরি করে ওলামায়ে কেরামের প্রতি আস্থা নাড়িয়ে দিচ্ছে। পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে, সাধারণ মানুষ এখন আলেমদের ওপর ভরসা হারিয়ে ফেলছে।

৪. এই সংশয় সৃষ্টির ৪টি বড় ক্ষতি

  • ক) মনগড়া চিন্তাভাবনা: এরা পূর্ববর্তী আলেমদের মতামত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে সম্পূর্ণ মনগড়া হুকুম আহকাম আহরণ করার চেষ্টা করছে। নিজেদের খেয়ালখুশি মতো দলীলের খণ্ডিত অংশ ব্যবহার করে অর্থ বিকৃত করছে, যা মূলত 'দ্বীনের আধুনিকায়ন'-এর নামে ইসলামকে ধ্বংস করার একটি সুড়ঙ্গ পথ।
  • খ) বুখারী-মুসলিম ধ্বংসের অপচেষ্টা: কোনো নির্দিষ্ট বিধানে উম্মাহর 'ইজমা' বা ঐকমত্যের ধারণাকে অস্বীকার করা এবং বুখারী ও মুসলিম শরীফের হাদীসের গ্রহণযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা এদের অন্যতম লক্ষ্য।
  • গ) সাধারণ মানুষের সাথে প্রতারণা: যুগ যুগ ধরে মুসলিম উম্মাহ যে আমলগুলো গ্রহণ করে আসছে, তার পরিপন্থী কথা বলে এরা মানুষের বিশ্বাসের দৃঢ়তা নাড়িয়ে দিচ্ছে। একই বিষয়ে বর্ণিত একাধিক হাদীসের মধ্যে তারা কোনো তাত্ত্বিক সমন্বয় সাধন করে না।
  • ঘ) ওলামাদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করা: পরোক্ষ ইঙ্গিতে তারা বোঝাতে চায় যে, সালাফ ও খালাফ আলেম সমাজ দ্বীনের সঠিক বিধান পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিশ্বস্ত ছিলেন না! এটি অত্যন্ত লাগামহীন ও বিপজ্জনক একটি দাবি।

. আরাফার রোজার গুরুত্ব ও তাত্ত্বিক ভিত্তি

  • প্রতি বছর জিলহজের এই ফজিলতপূর্ণ দশ দিনে কিছু সংশয়বাদী দাবি করে যে, হাজী বা অ-হাজী কারো জন্যই আরাফার রোজা শরীয়তসম্মত নয় এবং এর ফজিলতের হাদীসগুলো নাকি দুর্বল! তারা দাবি করে নবীজি ও সাহাবাগণ নাকি এই রোজা কখনোই রাখেননি।
  • এই অসার কথাবার্তা খণ্ডন করার জন্য সহীহ সুন্নাহ, সাহাবিদের আমল এবং ফকীহদের মতামতের আলোকে এই মাসআলাটির একটি শক্তিশালী ইলমী ভিত্তি নিচে তুলে ধরা হলো।

৬. সুন্নাহর আলোতে আরাফার রোজা (প্রথমত)

  • সহীহ মুসলিম শরীফে হযরত আবু কাতাদা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদীসে প্রমাণিত যে, নবী করীম (সা.) বলেছেন: "আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি যে, আরাফার দিনের রোজা তার পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহের কাফফারা (ক্ষমা) হিসেবে গণ্য হবে।" ([1])
  • এটি একটি সম্পূর্ণ সহীহ হাদীস। ওলামায়ে কেরামের এক বিশাল জামাত একে সহীহ বলেছেন এবং ইমাম মুসলিমের 'সহীহ' গ্রন্থে থাকাই এর বিশুদ্ধতার জন্য সবচেয়ে বড় প্রমাণ

৭. সাহাবায়ে কেরামের আমল (দ্বিতীয়ত)

  • ইমাম ইবনে জারীর আত-তবারী (র.) বলেন: "সাহাবী এবং তাবেয়ীদের একটি বড় দল আরাফার দিনে রোজা রাখাকেই উত্তম মনে করেছেন, এমনকি তাদের একটি দল আরাফার ময়দানে অবস্থানকালেও রোজা রেখেছেন।" ([2])
  • ইমাম ইবনে আব্দুল বার্র (র.) বলেন: "হযরত ইবনুয জুবায়ের এবং আয়েশা (রা.) আরাফার দিনে রোজা রাখতেন। হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব এবং উসমান বিন আবিল আস (রা.) থেকেও অনুরূপ আমল বর্ণিত রয়েছে।" ([3])
  • ইমাম ইবনে হাজম (র.) উল্লেখ করেছেন: একাধিক সাহাবী এই রোজা রেখেছেন। তাদের মধ্যে উসমান বিন আফফান (রা.) প্রচণ্ড গরমের দিনেও মাথার ওপর ছায়া দিয়ে রোজা রাখতেন এবং উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) হজের সফরেও আরাফার দিনে রোজা রাখতেন। ([4]).
  • এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে সাহাবিদের মাঝে যে আরাফার রোযা অত্যন্ত সুপরিচিত ও প্রচলিত ছিল, তার অন্যতম দলিল হলো:
  • উম্মুল ফজল (রা.)-এর প্রসিদ্ধ ঘটনা: উম্মুল ফজল বিনতুল হারিস রা. থেকে বর্ণিত: "আরাফাহর দিন কিছু মানুষ তাঁর সামনে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোযা রাখা নিয়ে দ্বিমত বা বিতর্ক করছিল। কেউ বলছিল: তিনি রোযাদার, আবার কেউ বলছিল: তিনি রোযাদার নন। তখন উম্মুল ফজল আল্লাহর রাসূলের কাছে এক পেয়ালা দুধ পাঠালেন যখন তিনি উটের পিঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তিনি তা পান করলেন।" ([5])

·        হাফেজ ইবনে হাজার বলেন: "এ থেকে বোঝা যায় যে, আরাফার দিনের রোজা সাহাবিদের নিকট সুপরিচিত ছিল এবং তারা নিজ এলাকায় থাকা অবস্থায় নিয়মিত এই রোজা রাখতেন" ([6])

·        =আর যিনি নিশ্চিত হয়ে বলেছিলেন যে তিনি রোযাদার, তিনি রাসূলের নিয়মিত ইবাদতের অভ্যাসের ওপর ভিত্তি করে বলেছিলেন। আর যিনি বলেছিলেন তিনি রোযাদার নন, তিনি রাসূলের মুসাফির বা সফরে থাকার অবস্থার ওপর ভিত্তি করে তা বলেছিলেন,

·        = কারণ সফরে যেখানে ফরয রোযাই ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি বা নিষেধ রয়েছে, সেখানে নফল রোযা তো আরও পরের কথা।"

·        ইমাম শাওকানী আবু কাতাদার হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: "এই হাদিসটি আরাফাহর দিনের রোযা মুস্তাহাব হওয়ার স্পষ্ট দলিল, এবং এই অর্থে বর্ণিত অন্যান্য হাদিসগুলোও একই নির্দেশ করে যা আমরা পূর্বে ইশারা করেছি,

= আর এই মতটিই গ্রহণ করেছেন উমর, আয়েশা, ইবনুয যুবাইর, উসামা বিন যায়েদ, উসমান ইবনে আবিল আস এবং আহলে বাইতের সদস্যগণ; এবং ইমাম হাসান বসরী রহ. এটি পছন্দ করতেন এবং উসমান রা. থেকে তা বর্ণনা করতেন।" ([7])

৮. ফকীহগণের মতামত ও ইজমা [৩য় অধ্যায়:

  • মক্কার বাইরে রোজার ইজমা: ইমাম ইবনে আব্দুল বার্র বলেন, "উলামাগণ এবং তাদের শীর্ষে আল্লাহর রাসূলের সাহাবিদের—একমত (ইজমা) হয়েছেন যে, মক্কার বাইরে (অন্যান্য দেশের মানুষের জন্য) এই রোজা রাখা সম্পূর্ণ জায়েজ ও শরীয়তসম্মত।" ([8])

·        = আর যারা আরাফাতের ময়দানে থাকা অবস্থায় এই রোযা রাখাকে মাকরুহ বা অপছন্দ করেছেন, তারা কেবল এই কারণে করেছেন যাতে রোযার কারণে হাজী ব্যক্তি দুআ, ইবাদত এবং আল্লাহর দরবারে কান্নাকাটি করার ক্ষেত্রে দুর্বল বা ক্লান্ত হয়ে না পড়ে।" ([৮])

  • চার মাযহাবের ঐকমত্য: ইসলামের প্রধান চার ফিকহী মাযহাব—হানাফী ([9]), মালেকী ([10]), শাফেয়ী ([11]) এবং হাম্বলী ([12]) সর্বসম্মতভাবে আরাফার দিনের রোজা মুস্তাহাব হওয়ার ব্যাপারে একমত।
  • ইমাম ইবনু হুবাইরাহ এই ঐকমত্য বর্ণনা করে বলেন: "ফকীহগণ একমত হয়েছেন যে, যে ব্যক্তি আরাফায় নেই (অ-হাজী) তার জন্য আরাফার দিনের রোজা রাখা মুস্তাহাব।" ([13])
  • অন্যান্য মুহাদ্দিসীনদের মত: এটি এটি ইমাম তাবারী, ইবনে আব্দুল বার, ইবনুল আরাবী, ইবনে কুদামা, ইমাম নববী, শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়াহ, হাফেয ইবনে হাজার, ইমাম শাওকানীসহ ইসলামের অন্যান্য বড় বড় ইমামদেরও সর্বসম্মত অভিমত। (14)
  • ইমাম নববী (র.) বলেন: ইমাম নববী তাঁর সহীহ মুসলিমের ব্যাখ্যাগ্রন্থে বলেন: "জিলহজ্জ মাসের প্রথম নয়টি রোযা রাখার মধ্যে কোনো মাকরুহ বা অপছন্দনীয় বিষয় নেই, বরং এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে মুস্তাহাব; বিশেষ করে নবম দিনটি, যা আরাফার দিন।" ([15])
  • ইমাম শাওকানী (র.) বলেন: "এই দিনের রোযা রাখা—অর্থাৎ আরাফাহর দিনের রোযা—প্রত্যেক সাধারণ মানুষের জন্য মুস্তাহাব বা উত্তম, তবে যিনি আরাফাতের ময়দানে হাজী হিসেবে অবস্থান করছেন তার জন্য এটি মাকরুহ।" ([16])

সমকালীন আলেমদের ফতোয়া:

  • বর্তমান যুগের শীর্ষস্থানীয় আলেম যেমন—শেখ মুহাম্মদ বিন ইব্রাহিম ([17]), ইবনে বায ([18]), আলবানী ([19]), ইবনে উসাইমীন ([20]), সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি ([21]) এবং মিশরের দারুল ইফতা ([22]) সবাই অ-হাজীদের জন্য এই রোজা মুস্তাহাব হওয়ার ফতোয়া দিয়েছেন।

·        (৭১) 7- وكذلك أفْتَى باستِحبابِ صَومِ يومِ عَرفةَ لغيرِ الحُجاجِ عامَّةُ عُلماءِ هذا العَصرِ وفُقهائِه، منهم: =

·        একইভাবে বর্তমান যুগের সাধারণ ও সমস্ত শীর্ষস্থানীয় উলামা এবং ফকীহগণ হজে না যাওয়া ব্যক্তিদের জন্য আরাফাহর রোযা মুস্তাহাব হওয়ার ফতোয়া দিয়েছেন, তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলেন:

·        (৭২) محمَّد بنُ إبراهيمَ([17])، وابنُ بازٍ([18])، والألبانيُّ([19])، وابنُ عُثَيمين([20])، واللَّجنةُ الدائمة للإفتاء بالسُّعودية([21])، ودارُ الإفتاءِ المِصرية ([22]).

·        = শায়খ মুহাম্মদ বিন ইবরাহীম ([১৭]), শায়খ বিন বায ([১৮]), ইমাম আলবানী ([১৯]), শায়খ ইবনে উসাইমীন ([২০]), সৌদি আরবের স্থায়ী ফতোয়া কমিটি (লাজনাহ দায়িমাহ) ([২১]), এবং মিশরের দারুল ইফতা ([২২])।

·        (৭৩) ولم يقُلْ أحدٌ مِن العُلماءِ المتقدِّمينَ والمتأخِّرينَ ولا المحقِّقينَ مِن المعاصِرينَ بعَدمِ مَشروعيَّةِ صِيامِ يومِ عَرَفةَ لغيرِ الحاجِّ،

·        = সালাফদের যুগের বা পরবর্তী যুগের কোনো একজন আলেম কিংবা বর্তমান যুগের কোনো নির্ভরযোগ্য গবেষক আলেম কখনো বলেননি যে অ-হাজীদের জন্য আরাফার রোযা রাখা অবৈধ বা শরীয়তসম্মত নয়,

·        (৭৪) إنَّما هذا قولُ بعضِ النَّوكَى والمتهوِّكِينَ مِن المعاصِرينَ، وفيما يلي الردُّ على شُبهاتِ هؤلاءِ ودَحْضُها.

·        = বরং এটি বর্তমান যুগের কিছু অতি-উৎসাহী নির্বোধ ও হঠকারী মানুষের মনগড়া কথা। নিচে তাদের এই সমস্ত সংশয়ের দাঁতভাঙা জবাব ও খণ্ডন দেওয়া হলো।

৯. সংশয়বাদীদের ৬টি কুযুক্তির দাঁতভাঙা জবাবঃ

·      (৭৫) شُبهاتُ القائِلينَ بعَدمِ مَشروعيَّةِ صَومِ يَومِ عَرفةَ والردُّ عليها =

·      আরাফাহর দিনের রোযা অবৈধ দাবিদারদের উত্থাপিত সংশয়সমূহ এবং তার খণ্ডন বা জবাব:

·      (৭৬) إنَّ ممَّا يُؤسَفُ له أنْ يَقضيَ المرءُ وقتًا في الردِّ على مِثلِ هذا القولِ الحادِثِ، أو أنْ يَشغَلَ نفْسَه بقِراءتِه،

·      = এটি অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে একজন মানুষকে এই ধরণের নতুন গজিয়ে ওঠা মনগড়া মতবাদের জবাব দিতে সময় নষ্ট করতে হচ্ছে, কিংবা সাধারণ মানুষকে এটি পড়ে নিজের সময় ব্যয় করতে হচ্ছে,

·      (৭৭) لكنْ ما العملُ إذا كان هؤلاء يَنشُرونَ تُرَّهاتِهم هذه في وَسائلِ الإعلامِ المسموعةِ والمرئيَّةِ والمقروءةِ عبْر وسائِلِ التواصُلِ الاجتماعيِّ وغيرها،

·      = কিন্তু এছাড়া আর উপায়ই বা কী, যখন এই সমস্ত লোকেরা সোশ্যাল মিডিয়াসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক, প্রিন্ট ও অডিও-ভিজ্যুয়াল মিডিয়ায় তাদের এই প্রলাপ ও মিথ্যাচার ছড়াচ্ছে,

·      (৭৮) وَيَبثُّونَ سُمومَهم وشُبهاتِهم بيْن العامَّةِ، ويَصْرِفونهم عن عِبادةِ ربِّهم في مِثلِ هذه الأيَّامِ العَشرِ المُبارَكةِ،

·      = এবং সাধারণ মানুষের মাঝে তাদের এই বিষাক্ত সংশয়গুলো ছড়িয়ে দিয়ে তাদেরকে জিলহজ্জের এই বরকতময় দশদিনের মহান ইবাদত থেকে বিমুখ বা দূরে সরিয়ে রাখছে,

·      (৭৯) التي قال عنها النبيُّ صلَّى الله عليه وسلم: (ما من أيامٍ العملُ الصالحُ فيهنّ أحبُّ إلى اللهِ من هذهِ الأيامِ العشرِ)([23])

·      ، = অথচ এই দিনগুলো সম্পর্কে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: "আল্লাহর কাছে জিলহজ্জের এই দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে প্রিয় আর কোনো দিনের আমল নেই।" ([২৩])

·      (৮০) بلْ يُزهِّدونَهم في صوْمِ يومٍ هو من أعْظَمِ أيامِ السَّنة، ألَا وهو يومُ عرَفةَ؛ فإلَى اللهِ المشتكَى!

·      = উল্টো তারা মানুষকে বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন অর্থাৎ আরাফাহর দিনের রোযা রাখার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করছে; অতএব আল্লাহর দরবারেই এই ফরিয়াদ!

·      (৮১) وَبَعْضُ الدَّاءِ مُلْتَمَسٌ شِفاهُ ... ودَاءُ النُّوكِ ليسَ لَهُ شِفاءُ([24])!

·      = (আরবি কবিতা): "দুনিয়াতে কিছু কিছু রোগের নিরাময় বা ঔষধ খুঁজে পাওয়া যায়... কিন্তু নির্বুদ্ধিতা বা বোকামির কোনো নিরাময় বা ঔষধ নেই!" ([২৪])

সংশয় ১: নবীজি আরাফায় রোজা রাখেননি

·        জবাব: নবীজি জিলহজের ৯ তারিখে রোজা রাখেননি—এ কথাটি সত্য, কিন্তু তা ছিল তিনি যখন আরাফায় হজের অবস্থায় ছিলেন তখনকার ঘটনা। ([25]) ([26]) আমাদের আলোচনার বিষয় হলো অ-হাজীদের রোজা। সাহাবিদের মাঝে যদি এই রোজার প্রচলন না-ই থাকত, তবে তারা নবীজির রোজা রাখা নিয়ে সেদিন সংশয় প্রকাশ করতেন না।

[১ম সংশয় ও তার জবাব]

(৮২) فمِن شُبهاتِهم: 1- زعْمُهم أنَّ النبيَّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ لم يَصُمْه واستشهادُهم بحديثِ أُمِّ الفَضلِ بِنتِ الحارثِ:

= তাদের উত্থাপিত সংশয়গুলোর মধ্যে ১ম সংশয়: তাদের দাবি হলো নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এই রোযা রাখেননি এবং এর সপক্ষে তারা উম্মুল ফজল বিনতুল হারিসের হাদিসটি দলিল হিসেবে পেশ করে:

(৮৩) ((أنَّ ناسًا تمارَوْا عِندَها يومَ عَرفةَ في صَومِ النبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم... فأرسَلَتْ إليه بقَدَحِ لَبنٍ وهو واقفٌ على بَعيرِه، فشَرِبَه))([25]).

= "কিছু মানুষ তাঁর সামনে নবীজির রোযা নিয়ে বিতর্ক করছিল... তখন উম্মুল ফজল রাসূলের কাছে এক পেয়ালা দুধ পাঠালেন যখন তিনি উটের পিঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন, আর তিনি তা পান করলেন।" ([২৫])

(৮৪) وبحَديثِ مَيمونةَ رَضيَ اللهُ عنهما: ((أنَّ الناسَ شَكُّوا في صِيامِ النبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ يومَ عَرفةَ، فأرسَلَتْ إليه بحِلابٍ وهو واقفٌ في الموقفِ، فشرِبَ منه، والناسُ ينظُرون))([26]).

=এবং উম্মুল মুমিনীন মায়মুনা রা. থেকে বর্ণিত হাদিস দিয়ে: "মানুষজন আরাফার দিন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রোযা নিয়ে সন্দেহ পোষণ করছিল, তখন মায়মুনা রা. রাসূলের কাছে দুধের পাত্র পাঠালেন যখন তিনি আরাফাতের মাঠে অবস্থান করছিলেন, আর তিনি মানুষের সামনেই তা পান করলেন।" ([২৬])

(৮৫) قالوا: هذا دليلٌ على أنَّ النبيَّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ لم يَصُمْه، وهذا صحيحٌ، لكنْ هذا عِندَما كان بعرَفةَ وهو حاجٌّ،  

=তারা বলে: এটিই প্রমাণ করে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই রোযা রাখেননি। তাদের এই কথাটি আংশিক সঠিক, কিন্তু এটি ছিল তখনকার ঘটনা যখন তিনি নিজে আরাফাতের ময়দানে হাজী হিসেবে অবস্থান করছিলেন,

(৮৬) وموضُوعنا عن صِيام يومِ عَرفةَ لغير الحاج، وليس في الحديثين أيُّ إشارةٍ إلى عدَمِ مشروعيَّةِ صِيامِ مَن ليس واقفًا بعَرَفةَ،

= অথচ আমাদের মূল আলোচনার বিষয় হলো অ-হাজীদের (যারা হজে যাননি) জন্য আরাফাহর রোযা রাখা। আর এই দুটি হাদিসের কোথাও কোনো দূরতম ইঙ্গিতও নেই যে যিনি আরাফায় নেই তিনিও রোযা রাখতে পারবেন না।

(৮৭) بل هذانِ الحديثانِ عند التأمُّلِ يَصلُحانِ أنْ يكونَا من الأدلَّةِ لِمَن يقولُ بمشروعيَّةِ واستحبابِ صَومِ يومِ عَرفةَ؛ =

বরং গভীরভাবে চিন্তা করলে এই দুটি হাদিস উল্টো আরাফাহর রোযা বৈধ ও মুস্তাহাব হওয়ার সপক্ষেই অন্যতম বড় দলিল হিসেবে প্রমাণিত হয়;

(৮৮) فإنَّه لولا أنَّ الصحابةَ يَعرِفون صومَ هذا اليومِ، أو أنَّ صومَه مشهورٌ عندهم، لَمَا شكُّوا في صَومِه ذلك اليومَ.

= কারণ সাহাবায়ে কেরাম যদি আগে থেকে আরাফাহর দিনের রোযার বিধান না জানতেন বা এটি যদি তাদের মাঝে অত্যন্ত সুপরিচিত ও প্রসিদ্ধ না হতো, তবে তারা সেদিন আল্লাহর রাসূল রোযা রেখেছেন কি না—তা নিয়ে কখনোই সন্দেহে ভুগতেন না বা বিতর্ক করতেন না।

সংশয় ২: ইবনে আব্বাস (রা.)-এর হাদীসের অপব্যাখ্যা

·       (৮৯) 2- ومنها: استشهادُهم بحَديثِ ابنِ عبَّاسٍ رَضيَ اللهُ عنهما، قال:

·      = ২য় সংশয়: তারা ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমার এই হাদিসটি দলিল হিসেবে পেশ করে, যেখানে তিনি বলেছেন:

·      (৯০) (ما رأيتُ النبيَّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم يَتحرَّى صِيامَ يومٍ فضَّلَه على غيرِه إلَّا هذا اليومَ؛ يومَ عاشوراءَ، وهذا الشَّهرَ، يعني: شَهرَ رمضانَ)([27]).

·      = "আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রমজান মাস এবং আশুরার দিন (মহররমের ১০ তারিখ) ছাড়া অন্য কোনো দিনকে অন্য দিনের ওপর প্রধান্য দিয়ে রোযা রাখার জন্য এতটা উদগ্রীব বা সচেষ্ট হতে দেখিনি।" ([২৭])

·      (৯১) وقالوا: هذا يدُلُّ على أنَّ صِيامَ يومِ عاشوراءَ كان مَعروفًا عندَ الصحابةِ رَضيَ اللهُ عنهم، وأمَّا صَومُ يومِ عَرفةَ فلم يكُنْ مَعروفًا عِندَهم، وإلَّا لَذكَره ابنُ عبَّاسٍ رَضيَ اللهُ عنهما.

·      = তারা বলে: এটি প্রমাণ করে যে আশুরার রোযা সাহাবিদের মাঝে পরিচিত ছিল, কিন্তু আরাফাহর রোযা পরিচিত ছিল না, যদি থাকত তবে ইবনে আব্বাস রা. অবশ্যই তা উল্লেখ করতেন।

·      (৯২) وقالوا أيضًا: وفيه دليلٌ على أنَّ النبيَّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ لم يَتحرَّ صِيامِ يومِ عَرفةَ، بلْ كان يتحرَّى يومَ عاشوراءَ على غَيرِه مِن الأيامِ.

·      = তারা আরও বলে: এটি এর প্রমাণ যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফার রোযা গুরুত্ব দিয়ে খুঁজতেন না, বরং তিনি আশুরার রোযাকেই অন্যান্য দিনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতেন।

·      (৯৩) وهذا خلَلٌ عَظيمٌ في الفَهمِ؛ جرَّاءَ عدَمِ الجَمعِ بيْن النُّصوصِ، وعدَمِ سُلوكِ طَريقِ الرَّاسِخينَ في العِلمِ في فَهْمِ نُصوصِ الشريعةِ الغرَّاءِ، =

·      আর এটি তাদের বুঝ ও অনুধাবনের এক বিরাট বড় ত্রুটি; যা মূলত বিভিন্ন দলিলের মধ্যে সমন্বয় না করা এবং শরীয়তের পবিত্র নসসমূহ বোঝার ক্ষেত্রে গভীর জ্ঞানের অধিকারী উলামাদের পথ অনুসরণ না করার কারণে তৈরি হয়েছে।

·      (৯৪) وإذا تأمَّلْنا كلامَ العُلماءِ المحقِّقينَ تبيَّنَ لنا الخللُ في كلام هؤلاء الجاهِلينَ المُتهوِّكينَ، وكيفيَّةُ الفَهْمِ الصَّحيحِ للنصوصِ الشرعيَّةِ، =

·      আমরা যদি সুগভীর গবেষক ও মুহাক্কিক উলামাদের কথা নিয়ে চিন্তা করি, তবে এই সমস্ত অজ্ঞ ও হঠকারী লোকদের কথার অসারতা বা ভুল আমাদের সামনে স্পষ্ট হয়ে যাবে এবং শরীয়তের দলিল সঠিক নিয়মে বোঝার পদ্ধতিও আমরা জানতে পারব;

·      (৯৫) قال الحافظُ ابنُ حَجرٍ عن هذا الحَديثِ: (هذا يَقتَضي أنَّ يومَ عاشوراءَ أفضلُ الأيامِ للصائمِ بعدَ رَمضانَ، لكنَّ ابنَ عبَّاسٍ أسنَدَ ذلك إلى عِلْمِه؛ فليس فيه ما يَرُدُّ عِلمَ غيرِه، =

·      হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন: "বাহ্যিকভাবে এই হাদিসটি দাবি করে যে রমযানের পর আশুরার দিনই রোযাদারের জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ দিন, কিন্তু ইবনে আব্বাস রা. এটিকে তাঁর ব্যক্তিগত জ্ঞানের ওপর ভিত্তি করে বলেছেন; সুতরাং তাঁর এই জানা অন্য কারও জানা বা দলিলকে নাকচ করে দেয় না।

·      (৯৬) وقد روَى مُسلِمٌ مِن حَديثِ أبي قتادةَ مَرفوعًا: «إنَّ صومَ عاشوراءَ يُكفِّرُ سَنةً، وإنَّ صِيامُ يومِ عَرَفةَ يُكفِّرُ سَنتينِ»،

·      = যেখানে স্বয়ং ইমাম মুসলিম আবু কাতাদা রা. থেকে মারফূ সূত্রে বর্ণনা করেছেন যে: 'আশুরার রোযা এক বছরের গুনাহ মাফ করে, আর আরাফাহর রোযা দুই বছরের গুনাহ মাফ করে।'

·      (৯৭) وظاهرُه: أنَّ صِيامَ يومِ عَرَفةَ أفضلُ مِن صِيامِ يومِ عاشوراءَ،

·      = আর এর স্পষ্ট অর্থ হলো: আরাফাহর দিনের রোযা আশুরার দিনের রোযার চেয়ে অনেক বেশি উত্তম ও ফযিলতপূর্ণ।

·      (৯৮) وقد قِيل في الحِكمةِ في ذلك: إنَّ يومَ عاشوراءَ مَنسوبٌ إلى مُوسَى عليه السَّلامُ، ويومَ عرَفةَ مَنسوبٌ إلى النبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم; فلذلك كان أفضلَ)([28]).

·      = আর এর পেছনের হিকমত বা রহস্য সম্পর্কে বলা হয়েছে: আশুরার দিনটি মুসা আলাইহিস সালাম-এর (বিজয়) সাথে সম্পর্কিত, আর আরাফাহর দিনটি আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর (উম্মতের ইবাদত ও দ্বীন পূর্ণতার) সাথে সম্পর্কিত; তাই এটিই সবচেয়ে উত্তম।" ([২৮])

·      (৯৯) وقال الألبانيُّ: (التعارُضُ بيْن نفْيِ ابنِ عباسٍ فضْلَ يومٍ غيرَ عاشوراءَ، وإثباتِ غيرِه -كأبي قَتادةَ- الأمْرُ فيه هيِّنٌ؛ =

·      ইমাম আলবানী বলেন: "ইবনে আব্বাসের পক্ষ থেকে আশুরার বাইরে অন্য দিনের ফযিলত না জানা এবং আবু কাতাদার মতো অন্যান্য সাহাবিদের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হওয়া—এই দুইয়ের মধ্যকার দ্বন্দ্ব নিরসন করা খুবই সহজ;

·      (১০০) لِمَا تقرَّرَ في الأصولِ أنَّ المُثبِتَ مُقدَّمٌ على النافي)([29]). =

·      কারণ উসূলে ফিকহের প্রতিষ্ঠিত নিয়ম হলো: 'যে ব্যক্তি কোনো প্রমাণ বা তথ্য সাব্যস্ত (পজিটিভ) করে, তার কথা বা দলিল কোনো কিছু অস্বীকারকারী (নেগেটিভ) ব্যক্তির কথার চেয়ে সবসময় অগ্রগণ্য বা প্রাধান্য পাবে'" ([২৯])

·      (১০১) فاقتِصارُ ابنِ عبَّاسٍ رَضيَ اللهُ عنهما على ذِكْرِ يَومِ عاشوراءَ لا يَستلزِمُ ضعْفَ الأحاديثِ التي ذَكَرتْ غيرَه. =

·      সুতরাং ইবনে আব্বাস রা. কর্তৃক কেবল আশুরার দিনের কথা উল্লেখ করার মানে এই নয় যে, আরাফাহর রোযার ফযিলত সম্পর্কে বর্ণিত অন্য সব সহীহ হাদিস যয়ীফ বা দুর্বল হয়ে যাবে।

সংশয় ৩: হযরত আয়েশা (রা.)-এর উক্তি

·      (১০২) 3-ومنها: استشهادُهم بقولِ عائِشةَ رَضيَ اللهُ عنها: (ما رأيتُ رسولَ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم صائِمًا في العَشرِ قطُّ)([30]).

·      = ৩য় সংশয়: তারা উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা.-এর এই উক্তিটি দলিল হিসেবে পেশ করে, যেখানে তিনি বলেছেন: "আমি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিলহজ্জের প্রথম দশদিনের মধ্যে কখনো রোযা রাখতে দেখিনি।" ([৩০])

·      (১০৩) وقالوا: هذا الحديثُ صريحٌ في أنَّ النبيَّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ لم يَصُمِ العشرَ الأُولى مِن ذي الحِجَّةِ، واليومُ التاسعُ منها، وهو يومُ عَرفةَ، ]

·      = তারা বলে: এই হাদিসটি একদম পরিষ্কারভাবে প্রমাণ করে যে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিলহজ্জের প্রথম দশদিন বা তার নবম দিন অর্থাৎ আরাফাহর দিন রোযা রাখেননি।

·      (১০৪) وهذا الزعمُ مخالِفٌ لفَهمِ العُلماءِ الراسخينَ؛ يُوضِّح ذلك قولُ الإمامِ النَّوويِّ تعليقًا على هذا الحديثِ:

·      = অথচ তাদের এই দাবিটি গভীর জ্ঞানের অধিকারী নির্ভরযোগ্য উলামাদের বুঝের সম্পূর্ণ বিপরীত; ইমাম নববী এই হাদিসের ব্যাখ্যায় তা স্পষ্ট করে বলেছেন:

·      (১০৫) (ثبَت في صَحيحِ البُخاريِّ: أنَّ رسولَ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم قال: «ما مِن أيامٍ العمَلُ الصالحُ فيها أفضَلُ منه في هذه»، يعني العَشرَ الأوائلَ مِن ذي الحِجَّةِ; ]

·      = "সহীহ বুখারীতে এটি প্রমাণিত যে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: 'জিলহজ্জের প্রথম দশদিনের নেক আমলের চেয়ে উত্তম আর কোনো আমল নেই'

·      (১০৬) فُيُتأوَّلُ قولُها: (لم يَصُمِ العشرَ) أنَّه لم يَصُمْه لعارضِ مرَضٍ، أو سفَرٍ، أو غيرِهما، أو أنَّها لم تَرَه صائمًا فيه، ولا يَلزَمُ مِن ذلك عَدمُ صِيامِه في نفْسِ الأمرِ)([31]).

·      = অতএব আয়েশা রা.-এর 'তিনি রোযা রাখেননি'—এই কথার অর্থ বা ব্যাখ্যা এভাবে করা হবে যে, রাসূল হয়তো কোনো অসুস্থতা, সফর বা অন্য কোনো জরুরি কারণে রোযা রাখতে পারেননি, অথবা আয়েশা রা. হয়তো ব্যক্তিগতভাবে সেদিন তাকে রোযা রাখা অবস্থায় দেখেননি (যেহেতু রাসূলের নয়জন স্ত্রী ছিলেন এবং তিনি পালাক্রমে সবার ঘরে থাকতেন)। আর এর মানে এই নয় যে রাসূল বাস্তবে কখনোই রোযা রাখেননি।" ([৩১])

·      (১০৭) وقال الحافظ ابنِ حَجرٍ -تَعليقًا على حَديثِ عائشةَ رَضيَ اللهُ عنها، ومُوضِّحًا فيه أنَّ حديثَها لا يُعارِضُ ما ذُكِر مِن الأدلَّةِ على فَضْلِ صِيامِ عَشرِ ذِي الحِجَّةِ-:

·      = হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী আয়েশা রা.-এর এই হাদিসের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে এবং এটি যে জিলহজ্জের দশদিনের রোযার অন্যান্য দলিলের সাথে সাংঘর্ষিক নয় তা স্পষ্ট করে বলেন:

·      (১০৮) (... لاحتمالِ أنْ يكونَ ذلك لكونِه كان يَترُك العَملَ وهو يُحِبُّ أنْ يَعمَلَه؛ خَشيةَ أنْ يُفرَضَ على أُمَّتِه، كما رواهُ الصَّحيحانِ مِن حَديثِ عائشةَ أيضًا)([32]).

·      = "... এর একটি জোরালো কারণ বা সম্ভাবনা হতে পারে যে, আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোনো একটি নেক আমল করতে ভালোবাসলেও উম্মতের ওপর তা ফরয বা বাধ্যতামূলক হয়ে যাওয়ার ভয়ে মাঝেমধ্যে তা ছেড়ে দিতেন, যেমনটি স্বয়ং বুখারী ও মুসলিমের অন্য একটি হাদিসে আয়েশা রা. নিজেই বর্ণনা করেছেন।" ([৩২])

·      (১০৯) وأيضًا فإنَّ عائشةَ رَضيَ اللهُ عنها لو علِمَتْ أنَّ النبيَّ نهَى عن صِيامِه ما صامَتْه في الحجِّ، وفي غيرِ الحجِّ، كما ورَدَ عن القاسمِ بنِ محمَّدٍ، قال:

·      = এছাড়াও, আয়েশা রা. যদি জানতেন যে নবীজি এই রোযা রাখতে নিষেধ করেছেন, তবে তিনি নিজে কখনো হজের সফরে বা সাধারণ অবস্থায় এই রোযা রাখতেন না, যেমনটি কাসিম বিন মুহাম্মদ বর্ণনা করেছেন:

·      (১১০) (كانتْ عائِشةُ رَضيَ اللهُ عنها تصومُ يومَ عَرفةَولقد رأيتُها عَشيَّةَ عرَفةَ يَدفَعُ الإمامُ، ثم تقِفُ حتى يَبْيَضَّ ما بيْنها وبيْن الناسِ مِن الأرضِ، ثم تَدْعو بالشرابِ فتُفطِرُ)([33]).

·      = "আয়েশা রা. আরাফাহর দিন রোযা রাখতেন। আমি আরাফার দিন বিকেলে দেখেছি, যখন ইমাম (আরাফাত থেকে মুযদালিফার দিকে) রওনা হতেন, তখন তিনি অপেক্ষা করতেন যতক্ষণ না মানুষ চলে যাওয়ার পর মাঠ কিছুটা ফাঁকা বা সাদা দেখাত, তারপর তিনি পানি আনিয়ে ইফতার করতেন।" ([৩৩])

·      (১১১) وقال ابنُ حزْمٍ: (أمَّا أنَّ رسولَ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم لم يَصُمْه فلا حُجَّةَ لكم في ذلك؛ لأنَّه عليه السلامُ قد حَضَّ على صِيامِه أعظَمَ حضٍّ، وأخبَر أنَّه يُكفِّرُ ذُنوبَ سَنتَينِ، =

·      ইমাম ইবনে হাজম বলেন: "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এই রোযা রাখেননি—এই কথাটি তোমাদের জন্য কোনো দলিল হতে পারে না; কারণ তিনি নিজে এই রোযা রাখার জন্য উম্মতকে সর্বোচ্চ তাগিদ দিয়েছেন এবং সংবাদ দিয়েছেন যে এটি দুই বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেয়,

·      (১১২) وما علينا أنْ نَنتظِرَ بعدَ هذا أيصومُه عليه السلامُ أم لا؟)([34]);

·      = আর রাসূলের স্পষ্ট নির্দেশের পর তিনি নিজে এটি করেছেন কি না—তা দেখার বা অপেক্ষা করার কোনো প্রয়োজন আমাদের নেই।" ([৩৪])

·      (১১৩) لأن رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم كان يترُكُ العملَ أحيانًا وهو يُحِبُّ أنْ يَعمَلَ به؛ خَشيةَ أنْ يَعملَ به الناسُ، فيُفرَضَ عليهم كما قال ابنُ حَجَر.

·      = কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাঝেমধ্যে আমলটি পছন্দ করা সত্ত্বেও উম্মতের ওপর ফরয হয়ে যাওয়ার ভয়ে তা ছেড়ে দিতেন, যেমনটি হাফেয ইবনে হাজার উল্লেখ করেছেন।

সংশয় ৪: আবু বকর ও উমর (রা.) রোজা রাখেননি বলে দাবি

[৪র্থ সংশয় ও তার জবাব]

·      - وممَّا شُبهاتِهم: الزَّعْمُ بأنَّ الصحابةَ رضي الله عنهم -وعلى رأسِهم أبو بكرٍ وعمرُ رَضيَ اللهُ عنهما- لم يَصوموا يومَ عَرفةَ، ولم يَكونوا يَعرِفونه، =

·      ৪র্থ সংশয়: তাদের আরও একটি দাবি হলো সাহাবায়ে কেরাম—বিশেষ করে আবু বকর ও উমর রা.—কখনো আরাফার দিন রোযা রাখেননি এবং তারা নাকি এই রোযা সম্পর্কে জানতেনই না!

·      () مُستشهِدينَ بقولِ ابنِ عُمَرَ رَضيَ الله عنهما الذي رواه الطحاويُّ: (لم يَصُمْ رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم، ولا أبو بكرٍ، ولا عُمَرُ، ولا عثمانُ، ولا علِيٌّ يومَ عَرفةَ)([35]).

·      = এর সপক্ষে তারা ইমাম ত্বহাবী বর্ণিত ইবনে উমর রা.-এর এই উক্তিটি পেশ করে যে: "আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবু বকর, উমর, উসমান বা আলী রা.—কেউই আরাফাহর দিন রোযা রাখেননি।" ([৩৫])

·      () وَيَرُدُّ على هذه الشُّبهةِ الطحاويُّ نفسُه، حيثُ قال: (هذا أيضًا -عِندَنا- على الصِّيامِ يومَ عَرفةَ بالموقِفِ، وقدْ بيَّن ذلك ابنُ عمَرَ رَضيَ اللهُ عنهما في غيرِ هذا الحَديثِ... ]

·      = অথচ এই সংশয়ের জবাব স্বয়ং ইমাম ত্বহাবী নিজেই তাঁর কিতাবে দিয়েছেন, তিনি বলেন: "আমাদের মতে এই হাদিসটি কেবল আরাফাতের ময়দানে হাজী হিসেবে অবস্থানকালীন রোযা না রাখার সাথে সম্পর্কিত, এবং ইবনে উমর রা. নিজেই অন্য হাদিসে তা পরিষ্কার করে দিয়েছেন...

·      () أنَّ رجلًا سأَلَ ابنَ عُمَرَ عن صومِ يومِ عَرفةَ بالموقِفِ، فقال: خرَجْنا مع رَسولِ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم فلم يَصُمْه، ومع أبي بَكرٍ رَضيَ اللهُ عنه فلمْ يَصُمْه، ]

·      = এক ব্যক্তি ইবনে উমর রা.-কে আরাফাতের ময়দানে থাকা অবস্থায় রোযা রাখার ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন: আমরা রাসূলের সাথে হজে গিয়েছিলাম তিনি সেদিন রোযা রাখেননি, আবু বকরের সাথে গিয়েছিলাম তিনিও রাখেননি,

·      () ومع عُمَرَ رَضيَ اللهُ عنه فلمْ يَصُمْه، ومع عُمانَ رَضيَ اللهُ عنه فلم يَصُمْه، وأنا لا أَصومُه، ولا آمُرُك ولا أنهاك، فإنْ شِئتَ فلا تَصُمْه)([36]).

·      = উমরের সাথে গিয়েছিলাম তিনিও রাখেননি, উসমানের সাথে গিয়েছিলাম তিনিও রাখেননি; আর আমিও তা রাখি না, তবে তোমাকে রাখতেও বলছি না আবার নিষেধও করছি না, তোমার ইচ্ছা হলে তুমি তা ছেড়ে দিতে পারো।" ([৩৬])

·      () فبيَّن الطحاويُّ أنَّ ما رَوَى نافعٌ عن ابنِ عُمَرَ رَضيَ اللهُ عنهما إنَّما هو على الصَّومِ في الموقِفِ.]

·      = সুতরাং ইমাম ত্বহাবী স্পষ্ট করে দিলেন যে, নাফে রহ. ইবনে উমর রা. থেকে যা বর্ণনা করেছেন তা কেবল আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকারী হাজীদের রোযা না রাখার সাথে খাস (নির্দিষ্ট)।

·      (১২০) وأيضًا قدْ ثبَت عن عَددٍ مِن الصحابةِ رَضيَ اللهُ عنهم والتابعينَ صِيامُ عرَفةَ بعرَفةَ، فضْلًا عن صِيامِه في غيرِ عرَفةَ؛  ]

·      =এছাড়াও, একাধিক সাহাবী এবং তাবেয়ী থেকে হজের সফরে আরাফাতের মাঠে থাকা সত্ত্বেও রোযা রাখার আমল প্রমাণিত রয়েছে, তাহলে সাধারণ অবস্থায় মক্কার বাইরে রোযা রাখা তো আরও বেশি প্রমাণিত;

·      () قال الإمامُ الطَّبريُّ: (وقد اختارَ صومَه على إفطارِه جَماعةٌ مِن الصحابةِ والتابعينَ، حتى لقدْ صامَه جَماعةٌ منهم بعرَفةَ)([37]). ]

·      = ইমাম তাবারী বলেন: "সাহাবা এবং তাবেয়ীদের এক বড় দল রোযা রাখাকেই উত্তম মনে করেছেন, এমনকি তাদের একদল আরাফাতের ময়দানেও রোযা রেখেছেন।" ([৩৭])

·      () والدليل على ذلك ما أخرَجه الترمذيُّ -وبوَّب له بقولِه: «بابُ كراهيةِ صَومِ يَومِ عَرفةَ بعرَفةَ»- عن أبي نَجِيحٍ قال: ]

·      = এর প্রমাণ ইমাম তিরমিযী কর্তৃক 'আরাফাতের ময়দানে আরাফার দিনের রোযা মাকরুহ হওয়া' অনুচ্ছেদে আবু নাজীহ থেকে বর্ণিত হাদিস, তিনি বলেন:

·      () (سُئِلَ ابنُ عُمَرَ عن صَومِ يومِ عَرفةَ بعرَفةَ، فقال: حجَجْتُ مع النبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم فلم يَصُمْه... وأنا لا أصومُه، ولا آمُرُ به، ولا أنْهى عنه)([38]); ]

·      = "ইবনে উমরকে আরাফাতের ময়দানে আরাফার রোযা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন: আমি নবীজির সাথে হজ করেছি তিনি তা রাখেননি... আর আমিও তা রাখি না, তবে এর নির্দেশও দিই না আবার নিষেধও করি না।" ([৩৮])

·      () فهو ظاهرٌ في عدم النهي عن صَومِ يومِ عَرفةَ للحاجِّ. ]

·      = সুতরাং এটি স্পষ্ট যে হাজীদের জন্য এটি উত্তম না হলেও এটি কিন্তু কঠোরভাবে কোনো হারাম বা নিষিদ্ধ বিষয় নয়।

 

সংশয় ৫: হাদীস দুর্বল করার মনগড়া নিয়মঃ

 () 5- ومِن شُبهاتهم: استدلالُهم بقاعِدة: (أنَّ أيَّ حديثٍ فيه: أنَّ مَن فعَلَ كذا غُفِرَ له ما تقدَّمَ مِن ذنْبِه وما تأخَّرَ; فهو ضَعيفٌ).

= ৫র্থ সংশয়: হাদীস শাস্ত্রের একটি সাধারণ নিয়মের অপব্যাখ্যা করে তারা বলে: "যে হাদিসের শব্দে এমন থাকে যে 'যে ব্যক্তি এই আমল করবে তার পূর্বের ও পরের সমস্ত গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে'—সেই হাদিসটি যয়ীফ বা দুর্বল।"

() وقالوا: حديثُ أبي قَتادةَ رَضيَ اللهُ عنه لا يصحُّ حتَّى ولو كان في صَحيحِ مسلِمٍ! وطبَّقوا عليه هذه القاعدةَ.

= তারা বলে: আবু কাতাদা রা.-এর বর্ণিত হাদিসটি সহীহ মুসলিমে থাকলেও তা সহীহ নয়! কারণ তারা এই নিয়মের আওতাভুক্ত করে একে দুর্বল বলতে চায়।

() وهذه القاعدةُ صحيحةٌ؛ فلا يصحُّ حديثٌ فيه أنَّ مَن فعَلَ كذا غُفِرَ له ما تقدَّمَ مِن ذنْبِه وما تأخَّرَ، ولكن بهذا الإطلاقِ، ]

= মূলত এই উসূলে হাদীসের নিয়মটি আংশিক সঠিক; অর্থাৎ কোনো সাধারণ নফল আমলের ক্ষেত্রে ঢালাওভাবে বা অনির্দিষ্টভাবে 'আগের ও পরের সব গুনাহ মাফ' এমন শব্দ থাকলে তা দুর্বল ধরা হয়,

() أمَّا حديثُ أبي قَتادةَ فقد قيَّدَه النبيُّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ بعامٍ قبْلَه وعامٍ بعْدَه، ولم يقُلْ: ما تقدَّمَ وما تأخَّرَ;

= কিন্তু আবু কাতাদার হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এটিকে নির্দিষ্ট বা সীমাবদ্ধ করে দিয়েছেন যে—'পূর্ববর্তী এক বছর এবং পরবর্তী এক বছর'তিনি ঢালাওভাবে 'আগের ও পরের সব' বলেননি;

() فالحديثُ فيه تَحديدُ سَنتينِ فقطْ، وليس ما مضَى من العُمرَ بأكمَلِه، أو ما تأخَّرَ بأكمَلِه; فتأمَّلِ الفرقَ!

= সুতরাং এই হাদিসে মাত্র নির্দিষ্ট দুটি বছরের কথা বলা হয়েছে, পুরো জীবনের অতীত বা ভবিষ্যৎ বলা হয়নি; অতএব দুইয়ের মধ্যকার পার্থক্যটি গভীরভাবে লক্ষ্য করুন!

() وحديثُ أبي قَتادةَ رَضيَ اللهُ عنه له نَظائرُ في تَكفيرِ الذُّنوبِ المُستقبَلةِ أو الماضيةِ؛ منها: حَديثُ أبي هُريرةَ رَضيَ اللهُ عنه، قال: قال رسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم:

= আর নির্দিষ্ট করে পেছনের বা সামনের গুনাহ মাফ হওয়ার হাদীস এটি একলাই নয়, এর আরও অনেক সমার্থক সহীহ নযীর (উদাহরণ) রয়েছে; যেমন আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

() ((مَن اغتسَلَ، ثم أتَى الجُمُعةَ، فصلَّى ما قُدَِّ له، ثم أَنصَتَ حتى يَفرُغَ مِن خُطبتِه، ثم يُصلِّي معه; غُفِرَ له ما بيْنَه وبيْن الجُمعةِ الأُخرَى، وفضْلَ ثلاثةِ أيَّامٍ))([39])

= "যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে জুমাতে এল, নির্ধারিত সালাত আদায় করল, খুতবা শেষ হওয়া পর্যন্ত মনোযোগ দিয়ে চুপ থাকল এবং ইমামের সাথে সালাত আদায় করল; তার পরবর্তী জুমা পর্যন্ত এবং আরও অতিরিক্ত তিন দিনের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হয়।" ([৩৯])

(১৩২) فهلْ طبَّقَ أحدٌ مِن العُلماءِ قديمًا وحديثًا هذه القاعدةَ على هذا الحديثِ أو غيرِه، وحكَموا بضَعْفِها بِناءً على تلك القاعدةِ؟!

= এখন প্রশ্ন হলো, অতীত বা বর্তমানের কোনো একজন আলেমও কি কখনো এই সাধারণ নিয়মের অজুহাতে এই সমস্ত সহীহ হাদিসকে যয়ীফ বা দুর্বল বলে হুকুম দিয়েছেন?! কখনোই না।

 

সংশয় ৬ষ্ঠ: আরাফার দিন ঈদের দিন, তাই রোজা রাখা যাবে নাঃ

  • তাদের দাবি: হাদীসে আরাফার দিনকে মুসলমানদের ঈদের দিন বলা হয়েছে, তাই রোজা রাখা যাবে না। ([40])

·        সংশয়: উকবা বিন আমের রা. থেকে বর্ণিত এই হাদিসটির অপব্যাখ্যা করে তারা দলিল দেয়, যেখানে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন:

·        () ((يومُ عرَفةَ، ويومُ النَّحرِ، وأيَّامُ التشريقِ عِيدُنا أهلَ الإسلامِ، وهي أيَّامُ أكلٍ وشُربٍ))([40])،

·         ="আরাফাহর দিন, কুরবানির দিন (১০ই জিলহজ্জ) এবং তাশরীকের দিনগুলো (১১, ১২, ১৩ জিলহজ্জ) হলো আমাদের মুসলমানদের ঈদের দিন, আর এগুলো খাওয়া ও পান করার দিন।" ([৪০])

·        () حيثُ زعَموا أنَّ قولَه: ((عِيدُنا أهلَ الإسلامِ)); يدُلُّ على أنَّ هذه الأيامَ الخَمْسةَ -بما فيها يومُ عَرفةَ- أيَّامُ أكْلٍ وشُربٍ للحاجِّ وغيرِ الحاجِّ.

·        = তারা এই হাদিসের 'আমাদের মুসলমানদের ঈদ' অংশটি ধরে দাবি করে বসে যে, এই পাঁচটি দিনই (আরাফাসহ) হাজী বা অ-হাজী সবার জন্য খাওয়া-দাওয়ার দিন, তাই এই দিনগুলোতে রোযা রাখা যাবে না।

·        (১৩৬) وهذا مُخالِفٌ لفَهمِ الراسِخينَ من أهلِ العِلْم; قال ابنُ عبدِ البَرِّ: (ذِكرُ يومِ عَرفةَ في هذا الحَديثِ غيرُ محفوظٍ،

·        =অথচ এটি গভীর জ্ঞানের অধিকারী উলামাদের বুঝের সম্পূর্ণ পরিপন্থী; ইমাম ইবনে আব্দুল বার বলেন: "এই হাদিসের মধ্যে 'আরাফাহর দিন' শব্দের উল্লেখটি হাদীস শাস্ত্রের নিয়মে 'মাহফূয' (সুরক্ষিত বা বিশুদ্ধ) নয়,

·        (১৩৭) وإنما المحفوظُ عن النبيِّ صلَّى اللهُ عليه وسلَّمَ مِن وجوهٍ: يومُ الفِطرِ، ويومُ النَّحرِ، وأيَّامُ التشريقِ أيَّامُ أكْلٍ وشُربٍ)([41]).

·        = বরং অন্যান্য সহীহ সূত্রে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে যা বিশুদ্ধভাবে প্রমাণিত, তা হলো: ঈদুল ফিতর, ঈদুল আযহা এবং তাশরীকের দিনগুলোই কেবল খাওয়া ও পান করার দিন (রোযা রাখা নিষিদ্ধ)।" ([৪১])

  • জবাব: প্রথমত, মুহাদ্দিসগণের মতে এই হাদীসে 'আরাফার দিন' শব্দটির অন্তর্ভুক্তিটি শায (সূত্রগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ ও অগ্রহণযোগ্য)। ([42]) ([43]) ([44]) ([45]) দ্বিতীয়ত, এটি ঈদের দিন হওয়ার অর্থ হলো—তা শুধুমাত্র আরাফার ময়দানে অবস্থানরত হাজীদের জন্য ঈদের দিন।

তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন: ইমাম যারকাশী ([৪২]), সাখাভী ([৪৩]), যাকারিয়া আনসারী ([৪৪]), মোল্লা আলী কারী ([৪৫]) প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ।

  • ইমাম তবারী, ইবনে কাইয়্যেম, ইবনে তাইমিয়্যাহ ([47]), ইবনে হাজার ([48]) এবং ইমাম শাওকানী ([49]) সবাই একমত যে, এটি কেবল হাজীদের জন্যই উৎসবের দিন, অন্য শহর বা দেশের মানুষের জন্য নয়।

১০. মূল কথা ও উপসংহার

  • আরাফার দিনের রোজা এবং এর ফজিলত সম্পর্কে অসংখ্য সহীহ হাদীস রয়েছে। পক্ষান্তরে নবীজির হজের সময় রোজা না রাখার বর্ণনার মধ্যে কোনো বৈপরীত্য নেই, বরং সবগুলোর মধ্যে সুন্দর সমন্বয় সম্ভব।
  • নবী করীম (সা.) কোনো বিষয়ের প্রতি উৎসাহ প্রদান করার পর নিজে যদি কোনো বিশেষ কারণে তা না-ও করেন, তবুও তা শরীয়তসম্মত আমল হিসেবেই গণ্য হবে।
  • মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা—তিনি যেন আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে দেখার এবং তা অনুসরণের তাওফীক দেন, এবং বাতিলকে বাতিল হিসেবে চেনার ও তা বর্জন করার তাওফীক দান করেন। সমস্ত প্রশংসা জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য।

১১. শব্দার্থ ও টীকা

  • আরবী টেক্সটে ব্যবহৃত আন্-নাওকা বলতে এখানে 'মূর্খ ও নির্বোধ' সমাজকে বোঝানো হয়েছে ([50]) এবং আল-মুতাহাউইকূন বলতে 'সংশয়গ্রস্ত ও লক্ষ্যহীন' বিভ্রান্তদের বোঝানো হয়েছে। ([51]) আর আরবী অভিধানে এই দুটি শব্দের আরও ভিন্ন কিছু অর্থ রয়েছে যা এখানে উদ্দেশ্য নয় বা এই প্রসঙ্গের সাথে প্রযোজ্য নয়।  ([52])

১২. মূল আরবী কিতাবের রেফারেন্সসমূহ:

·        ([১]) সহীহ মুসলিম (২/৮১৮)।

·        ([২]) তবারী রচিত 'তাহযীবুল আছার - মুসনাদু ওমর' (১/৩৬master)

·        ([৩]) ইবনে আব্দুল বারর রচিত 'আত-তামহীদ' (২১/১৫৮)।

·        ([৪]) ইবনে হাজম রচিত 'আল-মুহাল্লা' (৭/১৯)।

·        ([৫]) সহীহ বুখারী (হাদীস নং ১৯৮৮), সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ১১২৩)।

·        ([৬]) ইবনে হাজার রচিত 'ফাতহুল বারী' (৪/২৩৭)।

·        ([৭]) ইমাম শাওকানী রচিত 'নাইলুল আওতার' (৪/২৮৪)। সাহাবীদের এই আমলগুলোর জন্য আরও দেখুন: 'মুসান্নাফ আব্দুর রাজ্জাক' (হাদীস ৭৮৩০), 'মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ' (৩/৯৬)।

·        ([]) 'আত-তামহীদ' (২১/১৬৪)।

·        ([৯]) কাসানী রচিত 'বাদায়িউস সানায়ি' (২/৭৯), ইবনুল হুমাম রচিত 'ফাতহুল কাদীর' (২/৩৫০)।

·        ([১০]) হাত্তাব রচিত 'মাওয়াহিবুল জলীল' (৩/৩১২), নাফরাবী রচিত 'আল-ফাওয়াকিহুদ দাওয়ানী' (১/৯১)।

·        ([১১]) ইমাম নববী রচিত 'আল-মাজমূ' (৬/৩৮০), শেরবীনী রচিত 'মুগনীল মুহতাজ' (১/৪৪৬)।

·        ([১২]) ইবনে কুদামা রচিত 'আল-মুগনী' (৩/১৭৭), ইবনে মুফলিহ রচিত 'আল-ফুরূ' (৫/৮৮)।

·        ([১৩]) ইবনে হুবাইরাহ রচিত 'আল-ইফসাহ' (৩/১৭০)।

·        ([১৪]) 'আল-মুহাল্লা' (৭/১৭)।

·        ([১৫]) 'শারহুন নববী আলা মুসলিম' (৮/৭১)।

·        ([১৬]) 'নাইলুল আওতার' (৪/২৮৪)।

·        ([১৭]) 'ফাতাওয়া ওয়া রাসায়িল শাইখ মুহাম্মদ বিন ইব্রাহীম' (৪/২০৪)।

·        ([১৮]) 'ফাতাওয়া নূরুন আলাদ দারব' (১৬/৪১১)।

·        ([১৯]) 'সিলসিলাতুল আহাদীস আদ-দায়ীফাহ' (১/৪৫)।

·        ([২০]) 'শারহু রিয়াদিস সালিহীন' (৫/৩০৪)।

·        ([২১]) 'ফাতাওয়াল লাজনাহ আদ-দাইমাহ' (১০/৩৯৫)।

·        ([২২]) 'ফাতাওয়া দারুল ইফতা আল-মিসরিয়্যাহ' (৯/২৫৫)।

·        ([২৩]) সুনানে তিরমিযী (হাদীস নং ৭৫৭)।

·        ([২৪]) কাইস বিন আল-খাতীমের কাব্যগ্রন্থ 'দিওয়ান' (পৃষ্ঠা: ৩৬)।

·        ([২৫]) সহীহ বুখারী (১৯৮৮), সহীহ মুসলিম (১১২৩)।

·        ([২৬]) সহীহ বুখারী (১৯৮৯), সহীহ মুসলিম (১১২৪)।

·        ([২৭]) সহীহ বুখারী (২০০৬), সহীহ মুসলিম (১১৩২)।

·        ([২৮]) 'ফাতহুল বারী' (৪/২৪৯)।

·        ([২৯]) 'সিলসিলাতুল আহাদীস আদ-দায়ীফাহ' (১/৪৫৪)।

·        ([৩০]) সহীহ মুসলিম (১১৭৬)।

·        ([৩১]) 'শারহুন নববী আলা মুসলিম' (৮/৭১)।

·        ([৩২]) 'ফাতহুল বারী' (২/৪৬০)।

·        ([৩৩]) ইমাম মালিক রচিত 'আল-মুয়াত্তা' (১/৩৭৫); ইবনে হাজার এর সনদকে সহীহ বলেছেন।

·        ([৩৪]) আল-মুহাল্লা (المحلى) (৭/১৮)।

·        ([৩৫]) ইমাম তহাবী রচিত 'শারহু মাআনিল আছার' (১/৭২)।

·        ([৩৬]) 'শারহু মাআনিল আছার', পূর্বোক্ত উৎস।

·        ([৩৭]) 'তাহযীবুল আছার' (১/৩৬৫)।

·        ([৩৮]) 'সুনানে তিরমিযী' (অধ্যায় নং ৭৫১)।

·        ([৩৯]) সহীহ মুসলিম (হাদীস নং ৮৫৭)।

·        ([৪০]) সুনানে তিরমিযী (হাদীস নং ৭৭৩)।

·        ([৪১]) 'আত-তামহীদ' (২১/১৬৩)।

·        ([৪২]) জারকাশী রচিত 'আন-নুকাত' (২/১৩৭)।

·        ([৪৩]) সাখাবী রচিত 'ফাতহুল মুগীস' (১/২৪৫)।

·        ([৪৪]) জাকারিয়া আনসারী রচিত 'ফাতহুল বাকী' (১/২৩৩)।

·        ([৪৫]) মোল্লা আলী কারী রচিত 'শারহুন্ নুখবাহ' (পৃষ্ঠা: ৩৩৪)।

·        ([৪৬]) তবারী রচিত 'তাহযীবুল আছার' (১/৩৫১)।

·        ([৪৭]) ইবনুল কাইয়্যিম রচিত 'যাদুল মা’আদ' (১/৬২)।

·        ([৪৮]) ফাতহুল বারী (৪/২৩৮)।

·        ([৪৯]) 'নাইলুল আওতার' (৪/২৮৪)।

·        ([৫০]) আল-আনবারী রচিত 'আয-যাহির' (১/১৩৬)।

·        ([]) ইবনুল আসীর রচিত 'আন-নিহায়াহ' (৫/২৮২)।

·        ([৫২]) বিস্তারিত অভিধানের জন্য দেখুন: খলীল রচিত 'আল-আইন' (৪/৬৪), আজহারী রচিত 'তাহযীবুল লুগাহ' (১০/২০৮), জওহারী রচিত 'আস-সিহাহ' (৪/১৬১৭)।


Post a Comment

0 Comments