কাতারের ডানে বা বামে ভিড় করা
মুসল্লিদের নির্দেশনা দেওয়ার বিধান
১. শিরোনাম ও অবস্থান:
আরবী:
مسار الصفحة الحالية:
فهرس الكتاب الأسئلة
حكم توجيه الإمام
للمأمومين الذين
يزدحمون في
يمين الصف أو
يساره
অনুবাদ:
প্রশ্নোত্তর —
কাতারের ডানে বা বামে ভিড় করা মুসল্লিদের প্রতি ইমামের নির্দেশনার বিধান।
২. মূল প্রশ্ন:
আরবী:
عندما يصطف
المأمومون للصلاة
تكون الجهة التي
على الشمال ترجح
على التي على
اليمين أو
العكس، هل
يشرع للإمام أن
يوجههم إلى
تعديل الكفتين؟
অনুবাদ:
যখন মুক্তাদিগণ
সালাতের জন্য কাতারবদ্ধ হন, তখন অনেক সময় বাম দিক ডান দিকের চেয়ে
বেশি লম্বা হয়ে যায় অথবা এর বিপরীত হয়। এমতাবস্থায় ইমামের জন্য কি উভয় দিক সমান
করার নির্দেশনা দেওয়া শরীয়তসম্মত?
৩. ইমামের উত্তর:
আরবী:
يسأل يقول: إذا
كان الصف عن
يمين الإمام أكثر
عن يساره أو
بالعكس، فهل
يشرع للإمام أن
يقول للزائد: تعالوا
إلى هذا الناقص؟
أقول: نعم।
অনুবাদ:
প্রশ্নকারী
জিজ্ঞাসা করছেন: যদি ইমামের ডান দিকের কাতার বাম দিকের চেয়ে বেশি হয়ে যায় অথবা এর
বিপরীত হয়, তবে অতিরিক্ত মুসল্লিদের কি ইমাম বলতে
পারেন যে— "আপনারা কমের দিকে (অর্থাৎ যেদিক ছোট সেদিকে) চলে আসুন"? আমি (উত্তরে) বলব: হ্যাঁ। এটি সুন্নাহসম্মত।
৪. প্রথম দলিল (ইমামের অবস্থান):
আরবী:
لأن المشروع أن
يكون الإمام متوسطاً،
والدليل على
هذا: أنه ثبت
في صحيح مسلم
وغيره أن
المأمومين إذا
كانوا ثلاثة
في أول الأمر
يكون وسطهم، ثم
نسخ وصار الثلاثة
يكون الإمام أمامهم।
অনুবাদ:
কারণ শরীয়তের
বিধান হলো—ইমাম কাতারের মাঝখানে দাঁড়াবেন। এর দলিল হলো: সহীহ মুসলিম ও অন্যান্য
কিতাবে সাব্যস্ত হয়েছে যে, ইসলামের শুরুর দিকে মুক্তাদিরা সংখ্যায়
দুইজন (ইমামসহ মোট তিনজন) হলে ইমাম তাদের মাঝখানে দাঁড়াতেন। পরবর্তীতে এই বিধান
রহিত (মানসুখ) হয়ে যায় এবং নিয়ম হয় যে,
তিনজন হলে ইমাম
তাদের সামনে দাঁড়াবেন।
৫. দলিলের যৌক্তিকতা:
আরবী:
ووجه الدلالة: أنهم
لا يكونون عن
يمينه -يعني:
الاثنين عن
يمينه ولا
عن يساره- بل
يكون هو بينهم।
ব্যাখ্যা: যদিও ইমাম এখন সামনে দাঁড়ান, কিন্তু তাঁর অবস্থান হতে হবে কাতারের ঠিক
মাঝ বরাবর। তাই কোনো এক দিক অস্বাভাবিক লম্বা হওয়া সুন্নাহর পরিপন্থী।
৬. দ্বিতীয় দলিল (ন্যায়বিচার):
আরবী:
وأيضاً: هو
إمام وهو مأمور
بالعدل، وليس
من العدل أن
يكون أحد الجانبين
بعيداً والآخر
قريباً।
অনুবাদ:
এছাড়া, তিনি যেহেতু ইমাম, তাই তিনি ন্যায়বিচারের নির্দেশপ্রাপ্ত।
আর কাতারের এক দিক অনেক দূরে লম্বা হয়ে যাওয়া এবং অন্য দিক ইমামের খুব কাছে (ছোট)
থাকা ন্যায়বিচারের অন্তর্ভুক্ত নয়।
৭. তৃতীয় দলিল (হাদিসের বিশ্লেষণ): (ভুল
ধারণা নিরসন)
আরবী:
وأيضاً: لم
يقل النبي صلى
الله عليه وعلى
آله وسلم: أكمل
الأيمن فالأيمن،
ولو كان الأيمن
أكثر مطلقاً لقال:
أكملوا الأيمن
فالأيمن كما
قال في الصف
الأول: أكملوا
الأول فالأول।
অনুবাদ:
তাছাড়া নবী করীম
(সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) কখনও বলেননি যে— "ডান দিক পূর্ণ করো, তারপর ডানের দিক"; যদি সব ক্ষেত্রে ডান দিক বেশি হওয়া শর্ত
হতো, তবে তিনি অবশ্যই বলতেন যে— "ডান দিক
পূর্ণ করো।" যেমনটি তিনি প্রথম কাতারের ক্ষেত্রে বলেছেন— "প্রথম কাতার
পূর্ণ করো, তারপর পরের কাতার।"
ব্যাখ্যা:
অনেকে মনে করেন
কাতার কেবল ডান দিক থেকেই লম্বা করতে হবে,
শাইখ এখানে সেই
ভুল ধারণা সংশোধন করেছেন। সুন্নাহ হলো ভারসাম্য রাখা।
৮. চতুর্থ দলিল (দৃষ্টিনন্দন সৌন্দর্য ও শৃঙ্খলার অভাব):
আরবী:
وأيضاً: نظرة
الناس مثلاً:
لو فرضنا أن
أحداً خلف
الإمام والباقين
كلهم على اليمين
وليس عن الشمال
أحد، هذا المنظر
ينافي أن
يكون هناك إمام
حقيقة؛ لأنه
متطرف। هذه
هي المسألة।
অনুবাদ:
আরও একটি বিষয়
হলো বাহ্যিক সৌন্দর্য। যেমন: যদি আমরা ধরে নেই যে একজনের অবস্থান ঠিক ইমামের পেছনে
এবং বাকি সবাই ডান দিকে, আর বাম দিকে কেউ নেই—তবে এই দৃশ্যটি
প্রকৃত ইমামতির শানের পরিপন্থী; কারণ এতে ইমামকে
এক প্রান্তে বা কোণঠাসা মনে হয়। মাসআলাটি এমনই।
তথ্যসূত্র ও রেফারেন্স:
১. কিতাব: লিক্বাউল বাবিল মাফতুহ (لقاء الباب المفتوح), শাইখ মুহাম্মাদ
বিন সালেহ আল-উসাইমীন (রহ.)।
২. হাদিস রেফারেন্স: সহীহ মুসলিম, হাদিস নম্বর: ৫৩৪ (ইমামের অবস্থানের বিষয়ে)।
৩. ফিকহ রেফারেন্স: আশ-শারহুল মুমতি' (الشرح
الممتع),
খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৩৭৩। মজলিস (لقاء) নম্বর: ২১১, প্রশ্ন নম্বর: ১৩, শেখ
ইবনে উসাইমীন,
লিকাউল বাবিল মাফতুহ, লিকা নম্বর
(২৩৩)
ফিকহী কিতাবের
রেফারেন্স
·
আল-মাওসুআতুল ফিকহিয়্যাহ (কুয়েতিয়্যাহ): এখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, কাতার বিন্যাসের সময় ইমামের দুই দিক সমান রাখা মুস্তাহাব। (খণ্ড:
২৭, পৃষ্ঠা:
৩৭)।
·
আশ-শারহুল মুমতি (ইবনে উসাইমীন): শাইখ এখানে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, নবীজি (সা.)
কখনো বলেননি যে শুধু ডান দিকই পূরণ করো, বরং তিনি
বলেছেন কাতার সমান ও সোজা করো। (খণ্ড: ৩,
পৃষ্ঠা: ২০)।
ফতোয়াটির সংক্ষিপ্ত
সারমর্ম:
শাইখ ইবনে উসাইমীন
(রহ.) এই ফতোয়ায় স্পষ্ট করেছেন যে:
১. ইমামের জন্য সুন্নাহ হলো কাতারের মাঝখানে থাকা।
২. যদি কাতারের কোনো এক দিকে (ডানে বা বামে) মুসল্লি সংখ্যা
অস্বাভাবিক বেশি হয়ে যায়, তবে ইমামের উচিত
তাদের নির্দেশ দিয়ে ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা।
৩. শুধুমাত্র ডানে কাতার দীর্ঘ করা সুন্নাহ নয়, বরং উভয় দিকে ভারসাম্য রাখাই ইনসাফ এবং প্রকৃত সুন্নাহ।
৪. নবীজি (সা.) প্রথম কাতার পূর্ণ করার নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু নিরঙ্কুশভাবে কেবল ডান দিক পূর্ণ করার নির্দেশ দেননি।
১.
কাতারের ডান দিকের ফজিলত সংক্রান্ত হাদীস
হাদীস: "নিশ্চয়ই আল্লাহ এবং তাঁর ফেরেশতারা কাতারের ডান দিকের
লোকদের ওপর রহমত বর্ষণ করেন।"
- রেফারেন্স: সুনানে
আবু দাউদ, হাদীস নং ৬৭৬; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ১০০৫।
- তাহকিক: এই
হাদীসটি জয়িফ (দুর্বল)।
- এর সনদে 'মুয়াবিয়া বিন হিশাম' নামক বর্ণনাকারী আছেন,
যিনি সুফিয়ান থেকে বর্ণনা করতে ভুল করতেন।
- শায়খ আলবানী (রাহ.) প্রথমে একে হাসান বললেও পরবর্তীতে তাঁর মত পরিবর্তন করেছেন।
- শায়খ আব্দুল আজিজ আল-তারিফি এবং ইমাম বাইহাকী তাঁর 'সুনানুল কুবরা' (৩/১০৩) গ্রন্থে একে 'অসংরক্ষিত' বলেছেন। শায়খ আলবানীও তাঁর শেষ বয়সের তাহকিকে একে দুর্বল বলেছেন (যইফ
আবু দাউদ দ্রষ্টব্য)।
- সঠিক পাঠ: সহীহ
ইবনে মাজাহ (৮১৮) ও আবু দাউদে একই সনদে সঠিক পাঠটি হলো: "নিশ্চয়ই আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতারা যারা কাতার
সংযুক্ত করে (وصل
الصفوف) তাদের ওপর
রহমত বর্ষণ করেন।" (এখানে 'ডান দিক' শব্দের
বদলে 'কাতার সংযুক্ত করা' শব্দ
এসেছে)।
২. সাহাবীদের ডান
দিকে দাঁড়ানোর আগ্রহ সংক্রান্ত হাদীস
হাদীস: বারা ইবনে আযিব (রা.) বলেন, "আমরা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর পেছনে সালাত পড়তাম, তখন
আমরা তাঁর ডান দিকে থাকাকে পছন্দ করতাম..."
- রেফারেন্স: সহীহ
মুসলিম (১/৪৯২) (৭০৯), সুনানে
আবু দাউদ(১/১৬৭), (৬১৫)। সুনানে
নাসাঈ (২/৯৪) - হাদীস নং ৮২২:
- তাহকিক: এটি সহীহ।
- তবে এর ব্যাখ্যায় ইমাম নববী (রাহ.) বলেছেন, এটি সালাত শেষে নবীজীর মুখমণ্ডল দেখার জন্য ছিল, কেবল ডান দিকের ফজিলতের জন্য নয়।
- তবে ওলামায়ে কেরাম বলেন, সাহাবীদের এই পছন্দ ছিল একটি বিশেষ কারণে। তা হলো—নবীজী
ﷺ সালাম
ফিরানোর পর মুক্তাদীদের দিকে যখন মুখ ফেরাতেন, তখন ডান দিকের লোকদের চেহারা আগে দেখা যেত। এটি ডান দিকের সাধারণ
ফজিলত নয়, বরং নবীজীর চেহারার দিকে মুখ করে বসার
আকাঙ্ক্ষা।
৩. ইমামকে মাঝখানে
রাখা সংক্রান্ত হাদীস
হাদীস: "তোমরা ইমামকে মাঝখানে রাখো এবং কাতারের ফাঁক বন্ধ
করো।"
- রেফারেন্স: সুনানে
আবু দাউদ (৬৮১)।
- তাহকিক: এটি জয়িফ
(দুর্বল)। হাফেজ ইবনে
হাজার আল-আসকালানী তাঁর 'তাকরীব' গ্রন্থে এর বর্ণনাকারীদের দুর্বল বলে ইঙ্গিত দিয়েছেন।
তবে আমলগতভাবে এটি প্রসিদ্ধ।
- এর সনদে 'উসমান বিন আবু সাইদ' এবং 'আবু খালিদ' নামক দুইজন বর্ণনাকারী আছেন যারা
অজ্ঞাত (মাজহুল)।
- উপসংহার: যদিও
হাদীসটি দুর্বল, কিন্তু জুমহুর বা অধিকাংশ ওলামাদের
মতে—নবীজী ﷺ-এর
সাধারণ আমল এবং সাহাবীদের কাতার বিন্যাসের পদ্ধতি অনুযায়ী ইমামকে মাঝখানে রাখাই
সুন্নাহর অধিক নিকটবর্তী।
৪. নবীজীর সাথে ইবনে
আব্বাসের (রা.) সালাত
হাদীস: ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তিনি নবীজীর বামে দাঁড়িয়েছিলেন, নবীজী তাঁর কান ধরে
ঘুরিয়ে ডান পাশে নিয়ে এলেন।
- রেফারেন্স: সহীহ
বুখারী (৬৯৭), সহীহ মুসলিম (৭৬৩)।
- তাহকিক: এটি সহীহ
(মুত্তাফাকুন আলাইহি)।
- শিক্ষা: যদি
মুক্তাদী মাত্র একজন হয়, তবে সে
ইমামের ডান পাশে দাঁড়াবে। কিন্তু দুইজন বা তার বেশি হলে তারা ইমামের পেছনে
মাঝ বরাবর দাঁড়াবে।





0 Comments